‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’— এমন স্লোগান দিয়েই ভারতবিরোধী অবস্থান স্পষ্ট করছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা তরুণদের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। রাজনীতির মাঠে দলটির বিভিন্ন কর্মসূচি, বক্তব্য ও স্লোগানে ভারতের ভূমিকা নিয়ে কঠোর সমালোচনা যেমন দেখা যাচ্ছে, তেমনি ভারতীয় প্রভাব থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিকে মুক্ত রাখার বার্তাও স্পষ্টভাবে তুলে ধরছেন নেতারা। ভারত থেকে দূরত্ব তৈরির পাশাপাশি পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা অন্য কোনো দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সম্ভাবনা নিয়েও চলছে নানান আলোচনা।
তবে, বাংলাদেশের স্বার্থে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও ভাবছেন দলটির নেতারা। আর এতেই প্রশ্ন উঠছে, ভারতের প্রতি এনসিপির এই কঠোর অবস্থান কি কেবলই আদর্শিক, নাকি এর পেছনে রয়েছে সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশল?
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিলেও এটিকে দলীয় কৌশল নয়, বরং জনগণের দাবির বহির্প্রকাশ হিসেবে দেখছে। সীমান্ত হত্যা, পানির ন্যায্য হিস্যা না পাওয়া এবং দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের অনুচিত হস্তক্ষেপের কারণেই ভারত প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নিতে বাধ্য হয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা এই নতুন রাজনৈতিক দলটি
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আন্তর্জাতিক সেলের ইনচার্জ আলাউদ্দীন মোহাম্মদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘ভারত প্রশ্নে এনসিপি কঠোর অবস্থান নিয়েছে— বিষয়টিকে এভাবে ফ্রেমিং করার কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশে অতীতে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতসহ যেকোনো দেশের হস্তক্ষেপ আমাদের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত ছিল। আমরা বিষয়টিকে খুব সংবেদনশীলভাবে দেখি। বাংলাদেশের বহু গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের পেছনে প্রত্যক্ষভাবে বিদেশি শক্তির ইন্ধন ছিল। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পূর্বাপর ঘটনা বিশ্লেষণ করলেও দেখা যাবে, সেখানে বাইরের শক্তির অনেক প্রভাব ছিল। গণঅভ্যুত্থানের পরও মিথ্যাচার ও অপতথ্য ছড়ানোর মাধ্যমে দেশের স্থিতিশীলতা ও মানুষের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে বারবার ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়েছে।’

‘ভারতের গণমাধ্যমের প্রতিবেদন, সিভিল সোসাইটির বক্তব্য, রাজনীতিবিদদের মন্তব্য ও সাধারণ মানুষের প্রচার-প্রচারণা বিশ্লেষণ করে আমরা দেখেছি— ভারত এখনও বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানকে মেনে নেয়নি। দেশটির অনেকে একে ষড়যন্ত্র বা ডানপন্থী ও জঙ্গিবাদের উত্থান হিসেবে দেখছেন। তবে, ভারতের সঙ্গে আমাদের কোনো শত্রুতা নেই। আমরা চাই ভারত আধিপত্যবাদী আচরণ না করুক এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বন্ধ করুক। এটি ভারতের জনগণের বিরুদ্ধে কোনো স্লোগান বা রাজনৈতিক কৌশল নয়; এটি আমাদের স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান। আমরা ভারতের বিরুদ্ধে নই, আমরা ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে।’
ভারতের সঙ্গে কোনো অন্ধ নির্ভরতা বা নতজানু গোলামির সম্পর্ক নয়, বরং সমমর্যাদা ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্কের পক্ষে এনসিপি। দলটির মতে, ভারতকে তার আধিপত্যবাদী নীতি পরিহার করতে হবে। বাংলাদেশ একক কোনো দেশের ওপর নির্ভর না করে আত্মমর্যাদা ও আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে সব রাষ্ট্রের সঙ্গেই ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখতে চায়
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। সেখানে বসেই তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ভারতে বসে দেশের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ বা প্রভাব বিস্তারকে ইতিবাচকভাবে দেখতে চান না এনসিপি নেতারা। সেই কারণেই রাজনীতির মাঠে তাদের কর্মসূচি ও বক্তব্যে ভারতের ভূমিকা নিয়ে কঠোর সমালোচনা থাকে। ভারতের আধিপত্যের বিরুদ্ধে বলতে গিয়ে দলটি অন্য পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করছে কি না— তা নিয়েও আলোচনা চলছে।

এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সদস্যসচিব ফরিদুল হক ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘ভারত প্রশ্নে এনসিপি কতটা কঠোর অবস্থান নিয়েছে, সেটি কেবল একটি দলের বিষয় নয়; বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের অবস্থান দেখলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে। ভারতের দীর্ঘদিনের আধিপত্যবাদ নীতির কারণে বাংলাদেশের জনগণই ভারত প্রশ্নে একটি কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এনসিপি যেহেতু জনগণের রাজনীতি করে, তাই আমরা জনগণের পক্ষে কথা বলছি। ভারত যদি তার আগ্রাসী নীতি থেকে সরে না আসে, তাহলে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের স্বার্থে এনসিপিকে এই অবস্থান ধরে রাখতেই হবে।’
কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি আরও বলেন, ‘গত ৫০ বছরে ভারত বাংলাদেশে যেভাবে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য তৈরি করেছে, সেটিই এর মূল কারণ। ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা ভারত আটকে রেখেছে। খরার সময় পানি দেয় না, আবার বর্ষার সময় অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দিয়ে কৃত্রিম বন্যা পরিস্থিতি তৈরি করে। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে প্রতিনিয়ত বাংলাদেশের নাগরিকদের হত্যা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ভারত আমাদের রাজনীতি ও অর্থনীতিকে এমনভাবে প্রভাবিত করেছে, যাতে কেবল তাদের সুবিধা হয় আর বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন প্রজন্মের উত্থান ঘটেছে। এই প্রজন্মের বড় একটি অংশ মনে করে, দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের দীর্ঘদিনের অনুচিত প্রভাব রয়েছে। বিশেষ করে সদ্য সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে নয়াদিল্লির একপাক্ষিক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে তারা রাজনৈতিক ভারসাম্যের জন্য ক্ষতিকর হিসেবে দেখেছে। নতুন দল হিসেবে এনসিপি জনমতের সেই তীব্র ক্ষোভকেই নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানের প্রধান ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছে।
ভারতের বিরোধিতা করতে গিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানো হচ্ছে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে আন্তর্জাতিক সেলের ইনচার্জ আলাউদ্দীন মোহাম্মদ বলেন, ‘না, এটি ভারতের সঙ্গে বিরোধিতার বিষয় নয়। ভারত যদি পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের চিরবৈরী সম্পর্ক বা যুদ্ধাবস্থাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশকে প্রক্সি (পুতুল) হিসেবে ব্যবহার করতে চায়, বাংলাদেশের জনগণ তা মেনে নেবে না। চাপিয়ে দেওয়া সম্পর্কের দিন শেষ। এখন দুই দেশের জনগণ ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি অর্গানিক ও স্বাভাবিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত।’
অন্যদিকে ফরিদুল হক বলেন, “আওয়ামী লীগের এমপি-মন্ত্রীরা প্রকাশ্যে বলতেন ‘দিল্লি থেকে টিকিট এনেছি’ কিংবা ‘ভারতের সঙ্গে আমাদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক’। এসব বক্তব্যের মাধ্যমেই তারা প্রমাণ করেছেন যে, দেশের মানবাধিকার ও ভোটাধিকার হরণ এবং অন্যায়-অপশাসনকে ভারত সরাসরি সমর্থন দিয়ে টিকিয়ে রেখেছিল। তাই এটি কোনো রাজনৈতিক কৌশল নয়, ভারতের আধিপত্যবাদী নীতি পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত জনগণের এই অবস্থান বহাল থাকবে।’

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হলে বিকল্প কোনো দেশের (চীন, পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র বা অন্যকোনো দেশ) ওপর নির্ভরতা বাড়বে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে ফরিদুল হক বলেন, ‘বাংলাদেশকে পরোক্ষভাবে একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল করে ফেলা হয়েছিল। কোনো একটি দেশের ওপর নির্ভর করে বাংলাদেশ তার স্বাধীন-সার্বভৌম সত্তা নিয়ে টিকে থাকতে পারে না। তাই কারোর ওপর অন্ধ নির্ভরতার প্রশ্নই ওঠে না; বাংলাদেশকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। সমমর্যাদা ও সমতার ভিত্তিতে সবার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলাই হওয়া উচিত আগামীর পররাষ্ট্রনীতি।’
এদিকে, এনসিপির নেতাদের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডে ভারতের আধিপত্যবাদ নীতির বিরোধিতা স্পষ্ট হলেও, দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার পক্ষে দলটি। বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক অনুষ্ঠানে এনসিপি নেতাদের উপস্থিতি দেখা গেলেও অনেক সময় ভারতের কূটনীতিকদের সঙ্গে তারা আনুষ্ঠানিক ছবি তোলা থেকে বিরত থাকেন। দলটির নেতারা বলছেন, ভারতের রাষ্ট্রীয় নীতির সমালোচনা করা আর কূটনৈতিক বা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা দুটি ভিন্ন বিষয়। এনসিপি ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরোধিতা করলেও পারস্পরিক স্বার্থ, সমমর্যাদা ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে একটি ভালো ও স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী।
ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখা প্রয়োজন কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে ফরিদুল হক বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। তবে সমস্যা হলো, এ দেশে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যে তাদের স্বার্থ ও আধিপত্য মেনে নিয়ে নতজানু হয়ে থাকাকেই কূটনৈতিক সম্পর্ক মনে করা হয়। কিন্তু এটি প্রকৃতপক্ষে কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নয়, বরং এক ধরনের গোলামির সম্পর্ক।’
‘এনসিপি বাংলাদেশকে এই নতজানু অবস্থান থেকে বের করে আনতে চায়। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে নিজের মর্যাদা বজায় রেখে দাঁড়াবে এবং ভারতও সেই মর্যাদা অনুযায়ী সম্মান প্রদর্শন করবে। এনসিপি ভারতের সঙ্গে এমন সমমর্যাদার সম্পর্কই আশা করে, যার জন্য ভারতকেও তাদের নীতি পরিবর্তন করতে হবে।’
‘আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে যে ধরনের স্বাভাবিক ও সম্মানজনক সম্পর্ক বজায় রাখা উচিত, ভারত যদি তা অনুসরণ করে, তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও অবশ্যই ইতিবাচক সাড়া থাকবে’— মনে করেন তিনি।
এমএসআই/এমএআর
