বিজ্ঞাপন

গেন্ডারিয়ায় রক্তক্ষয়ী সংঘাত: নেপথ্যে মাদক সাম্রাজ্যের দখল?

গেন্ডারিয়ায় রক্তক্ষয়ী সংঘাত: নেপথ্যে মাদক সাম্রাজ্যের দখল?

রাত তখন পৌনে আটটা। হঠাৎ রাজধানীর গেন্ডারিয়ার মুন্সিরটেক ও করাতিটোলা এলাকায় চিৎকার করতে করতে ধারাল অস্ত্র হাতে ঢুকে পড়ে ৩০ থেকে ৩৫ জনের একদল যুবক। স্থানীয়দের দাবি, দেশীয় অস্ত্রের পাশাপাশি তাদের কয়েকজনের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। অস্ত্রধারীরা ঢুকেই ব্যবসায়ীদের দোকানপাট বন্ধ করতে বলে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায় এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ। অন্ধকারে শুরু হয় দফায় দফায় গুলি বর্ষণ ও ধারাল অস্ত্র নিয়ে তাণ্ডব।

গুলির শব্দে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ মানুষ ছোটাছুটি শুরু করে। ব্যবসায়ীরা দ্রুত দোকানের শাটার বন্ধ করতে থাকেন। কিন্তু শাটার নামিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি এক কিশোরের। বন্ধ দোকানের শাটার ভেদ করে গুলি এসে লাগে তার শরীরে।

স্থানীয়দের দাবি, গেন্ডারিয়ার তিন মাদক কারবারিকে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়া এবং এলাকার শীর্ষ মাদক কারবারি ও সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত ‘অটো সজল’-এর বাবা ও চাচাকে মারধরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত। ঘটনায় এক নারীসহ তিনজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এছাড়া, স্থানীয় বিএনপি নেতা মনির হোসেনকে ধারাল অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আহত করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

তবে, এই গোলাগুলির নেপথ্যে শুধু তিন মাদক কারবারিকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার ঘটনাই দায়ী, নাকি গেন্ডারিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে চলা মাদক ও আধিপত্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন কোনো দ্বন্দ্ব— তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। সোমবার গেন্ডারিয়ার করাতিটোলা ও মুন্সিরটেক এলাকা ঘুরে প্রত্যক্ষদর্শী, স্থানীয় বাসিন্দা এবং আহতদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় শীর্ষ সন্ত্রাসী ও অস্ত্র ব্যবসায়ী ‘অটো সজল’ এবং তার ভাই গ্রেপ্তার হওয়ার পর এলাকায় দীর্ঘদিনের মাদক সাম্রাজ্য অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে। গোয়েন্দা তথ্যে জানা গেছে, এই শূন্যস্থান পূরণে স্থানীয় বিএনপি নেতা মনির হোসেন মাদকবিরোধী উদ্যোগের আড়ালে নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছেন। ফলস্বরূপ, সজলের অনুসারী ও মনিরের সমর্থকদের মধ্যে পুরো এলাকার একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে

শাটার ভেদ করে কিশোরের শরীরে গুলি

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ১০২ নম্বর ওয়ার্ডের ১১ নম্বর বেডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন গুলিবিদ্ধ কিশোর সিয়াম। জানান, তিনি যাত্রাবাড়ী এলাকার একটি হোটেলে কাজ করেন। গত কয়েকদিন ধরে জ্বরে আক্রান্ত থাকায় রোববার দুপুরের দিকে তিনি ফুফু জাহানারা বেগমের বাসায় আসেন। সন্ধ্যার দিকে তিনি ফুফা কাদিরের চায়ের দোকানে যান।

dhakapost
ডান পাশে কালো শার্ট পরা শীর্ষ সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারি অটো সজল, অস্ত্র ও তিন সহযোগীসহ গ্রেপ্তার / ঢাকা পোস্ট

সিয়াম বলেন, ‘ফুফু অসুস্থ থাকায় তাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। এ সময় আমার দুই ফুফাতো ভাইও চায়ের দোকানে ছিলেন। হঠাৎ গলির মধ্যে অনেক লোক চিৎকার করতে করতে আসতে থাকে। তখন ফুফা দৌড়ে এসে দোকান বন্ধ করতে বলেন। ফুফাতো ভাই রিমন ও আরমান দ্রুত শাটার বন্ধ করে দেয়। আমরা সবাই ভেতরেই ছিলাম। হঠাৎ শাটার ভেদ করে একটি গুলি আমার ডান কাঁধে এসে লাগে।’

আহত সিয়ামকে প্রথমে ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগে এবং পরে ১০২ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকের উদ্ধৃতি দিয়ে সিয়াম বলেন, ‘শরীরে এখনও গুলি রয়ে গেছে, অস্ত্রোপচার করা হতে পারে।’

চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পথে অস্ত্রধারীদের মুখোমুখি

সিয়ামের ফুফু জাহানারা বেগম জানান, তিনি অসুস্থ ছিলেন এবং চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার জন্য স্বামীর সঙ্গে বের হয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘গলির ভেতরে অনেক লোককে ধারাল অস্ত্র নিয়ে ঢুকতে দেখি। তাই হাসপাতালে না গিয়ে দ্রুত দোকানে ফিরে আসি এবং শাটার বন্ধ করে দিই। শাটার বন্ধ করার পর হঠাৎ সেটি ভেদ করে ভাতিজা সিয়ামের শরীরে গুলি লাগে।’ বাইরে টানা গুলির শব্দ ও চিৎকার শুনলেও কারা কী কারণে এটি করেছে, সে বিষয়ে কিছু জানেন না বলে জানান তিনি।

মেয়েকে নিয়ে ফেরার পথে গুলিবিদ্ধ নারী

ডান পাশের কোমরে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঢামেক হাসপাতালের ২০৩ নম্বর ওয়ার্ডের ৮ নম্বর বেডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন আশা নামের এক নারী। 

তিনি জানান, তার ১২ বছরের মেয়ে জান্নাত আক্তার ইশা মুন্সিরটেক এলাকায় কোচিংয়ে ছিল। কোচিং শেষে তিনি ও তার মা ডলি বেগম মেয়েকে নিয়ে সায়েদাবাদ রেললাইন এলাকার দিকে যাচ্ছিলেন। 

আশা বলেন, ‘হঠাৎ চারিদিকে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু হলে আমরা দ্রুত দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করি। কিন্তু ঠিক তখনই আমার কোমরের ডান পাশে একটি গুলি এসে লাগে। ভাগ্য ভালো যে গুলিটি আমার গায়ে লেগেছে, নইলে ১২ বছরের মেয়েটিরও লাগতে পারত।’ পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হয়।

ঘটনার দিন বিএনপি নেতা মনির তিন মাদক কারবারিকে ৯৬টি ইয়াবাসহ আটক করে গেন্ডারিয়া থানা পুলিশে সোপর্দ করেন। এর প্রতিশোধ হিসেবে এবং সজলের অনুসারীদের মারধরের ঘটনায় রাতে ৩০-৩৫ জনের একদল যুবক তাণ্ডব চালায়। হামলাকারীরা পরিকল্পিতভাবে বিদ্যুতের লাইন কেটে দেয়, সিসিটিভি ক্যামেরা ভেঙে ফেলে এবং কার্যালয় ও বাসাবাড়িতে এলোপাতাড়ি ইটপাটকেল ও গুলি চালায়

কোমরে আটকে থাকা গুলির বিষয়ে আশা জানান, চিকিৎসকেরা এক্স-রে রিপোর্ট দেখে নিশ্চিত করেছেন যে গুলিটি এখনও কোমরের ভেতরেই আটকে আছে। আগামীকাল অস্ত্রোপচার করে সেটি বের করার কথা রয়েছে।

পারিবারিক পরিচয়ের বিষয়ে আশা জানান, তার স্বামী নজরুল ইসলাম একজন দুবাইপ্রবাসী এবং কাজের প্রয়োজনে মাঝেমধ্যে সেখানে যাতায়াত করেন। বর্তমানে তিনি তার একমাত্র সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে মায়ের সঙ্গে বসবাস করছেন।

dhakapost
দোকানের শাটারে লাগা গুলির চিহ্ন, যা ভেদ করে কিশোর সিয়াম গুলিবিদ্ধ হয় / ঢাকা পোস্ট

মাথায় গুলিবিদ্ধ চায়ের দোকানদার

এদিকে, মাথায় গুলিবিদ্ধ চায়ের দোকানদার আলমগীরের অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে। আহত আলমগীরের ছোট ভাই আরিফুর রহমান জানান, তার ভাই চা-সিগারেট বিক্রির পাশাপাশি দিনমজুরের কাজও করেন। ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘সন্ধ্যার পর হঠাৎ এলাকায় সংঘাত শুরু হলে একটি গুলি সরাসরি আমার ভাইয়ের কপালের ঠিক মাঝখানে এসে লাগে। খবর পেয়ে আমি মিরপুর থেকে দ্রুত ঢামেক হাসপাতালে ছুটে আসি।’

তিনি আরও জানান, দুপুর ১টার দিকে আলমগীরকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয় এবং ঘণ্টাখানেক পর দুপুর ২টায় অস্ত্রোপচার শেষ হলে তাকে বের করা হয়। বর্তমানে তিনি ঢামেক হাসপাতালের ১০৫ নম্বর ওয়ার্ডের ওটি (অপারেশন থিয়েটার) অবজারভেশনে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

দোকান বন্ধ করে সটকে পড়েন ব্যবসায়ীরা

ঘটনার স্থান পরিদর্শনকালে বিসমিল্লাহ জেনারেল স্টোরের মালিক মো. ইদ্রিস ঢাকা পোস্টের কাছে ঘটনার বর্ণনা দেন। তিনি জানান, হঠাৎ গলির ভেতর হট্টগোল ও গুলির বিকট শব্দ শুনে তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। জীবন বাঁচাতে দ্রুত দোকানের শাটার নামিয়ে তালা মারার সুযোগ না পেয়েই নিরাপদ স্থানের দিকে ছুটে যান।
 
পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে দোকানে ফিরে তিনি জানতে পারেন, তার পাশের কাদিরের চায়ের দোকানের শাটার ভেদ করে ভেতরে থাকা সিয়াম নামের এক কিশোর গুলিবিদ্ধ হয়েছে। মো. ইদ্রিস আরও বলেন, ‘আমার দোকান থেকে মাত্র ২০-২৫ ফুট দূরে অন্য একটি চায়ের দোকানের মালিক আলমগীরের মাথায় গুলি লেগেছে। এছাড়া, এক নারীও গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বলে শুনেছি। স্বজনরা তাদের সবাইকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেছেন।’

তিনি আরও জানান, তার দোকানের পাশেই বিএনপি নেতা মনির হোসেনের একটি কার্যালয় ছিল, সেখানেও হামলা, ভাঙচুর ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। দোকানে ফিরে এসে তিনি দ্রুত তালা ঝুলিয়ে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হন। তবে, হামলাকারীদের পরিচয় সম্পর্কে তিনি কিছুই বলতে পারেননি।

বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন ও সিসিটিভি ভাঙচুর

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, রাত পৌনে ৮টার দিকে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। তাদের দাবি, তাণ্ডব শুরুর ঠিক আগেই পরিকল্পিতভাবে এলাকার বিদ্যুতের লাইন বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর অন্ধকারে ধারাল অস্ত্র হাতে একদল যুবক রাস্তার সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো ভেঙে ফেলে এবং বিএনপি নেতা মনির হোসেনের কার্যালয়ে ভাঙচুর ও হামলা চালায়। মনিরের অফিসে তাণ্ডব চালানোর পর হামলাকারীরা তার বড় ভাই শাহাবুদ্দিন ওরফে বুদ্দিনের বাসায়ও হামলা ও ভাঙচুর চালায় বলে বাসিন্দারা জানান।

বিদ্যুৎহীন অন্ধকারে হঠাৎ শুরু হওয়া গোলাগুলির মধ্যে প্রাণ বাঁচাতে গিয়ে সাধারণ নাগরিকরা সহিংসতার শিকার হন। চায়ের দোকানের শাটার নামিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি; শাটার ভেদ করে সিয়াম নামের এক কিশোরের কাঁধে গুলি লাগে। একই ঘটনায় চায়ের দোকানদার আলমগীরের কপালে এবং কন্যা সন্তানকে কোচিং থেকে নিয়ে ফেরার পথে আশা নামে এক নারীর কোমরে গুলি লাগে। আহতরা বর্তমানে ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন
dhakapost
ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে পিবিআইয়ের আলামত সংগ্রহের দৃশ্য / ঢাকা পোস্ট

সংঘর্ষের নেপথ্যে তিন মাদক কারবারি আটক

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিএনপি নেতা মনিরের বড় ভাই শাহাবুদ্দিন ওরফে বুদ্দিন এক সময় এলাকার শীর্ষ ফেনসিডিল ব্যবসায়ী ছিলেন বলে আলোচনা রয়েছে। দলীয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে তিনি দীর্ঘ ১৭ বছর এলাকায় ছিলেন না। তিনি ৪০ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক কাউন্সিলর মকবুল ইসলাম খান টিপুর বলয়ে রাজনীতি করতেন।

অন্যদিকে, তার ছোট ভাই মনিরও স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এবং ভবিষ্যতে ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করতে চান; তবে বর্তমানে তার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পদ-পদবি নেই।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ঘটনার দিন এলাকার চিহ্নিত শীর্ষ মাদক কারবারি ও সন্ত্রাসী ‘অটো সজল’-এর বাবা আলম ও চাচা কসাই রাসেলকে মারধর করেন মনিরের অনুসারীরা। এর জের ধরে সজলের দলবল মনিরের লোকজনের ওপর পাল্টা হামলা চালায়।
 
পরে মনির গেন্ডারিয়ার করাতিটোলা রেললাইন এলাকা থেকে মো. রাকিব (২২), মো. বিল্লাল (২৫) ও মো. রিফাত (২১) নামের তিনজনকে ইয়াবা ও গাঁজাসহ আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেন। এই খবর ছড়িয়ে পড়লে অটো সজলের অনুসারী এবং মনিরের সমর্থক ও ভাগ্নেদের মধ্যে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। 

বাসিন্দারা জানান, এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ ও সিসিটিভি ক্যামেরা বন্ধ করে দেওয়ার পর দুই পক্ষই দেশীয় ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এতে অটো সজলের ক্যাডারদের পাশাপাশি মনিরের অনুসারীরাও অস্ত্র ব্যবহার করে এবং উভয় পক্ষ থেকেই এলোপাতাড়ি গুলি বর্ষণ করা হয়।

অটো সজল কারাগারে, ভেঙে পড়েছে সিন্ডিকেট?

স্থানীয়দের তথ্য মতে, গত বছরের ১৯ জুন চার সহযোগী ও বিপুল পরিমাণ বিদেশি অস্ত্রসহ যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন এলাকার শীর্ষ মাদক কারবারি ও সন্ত্রাসী ‘অটো সজল’। তার অপর ভাই সজীবও মাদক কারবারের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।

সজল ও তার মূল সহযোগীরা কারাবন্দি হওয়ায় তাদের নিয়ন্ত্রিত শক্তিশালী সিন্ডিকেটটি কিছুটা ভেঙে পড়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তবে, শীর্ষ নেতারা জেলে থাকলেও তাদের অনুসারীরা এখনও গেন্ডারিয়া ও মুন্সিরটেক এলাকায় মাদক কারবার এবং অরাজকতা সক্রিয়ভাবে চালিয়ে যাচ্ছে। এই সহিংস ঘটনার পর থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে পুরো এলাকায়; অনেক দোকানপাট বন্ধ রয়েছে এবং প্রাণভয়ে স্থানীয় অধিবাসীদের অনেকেই প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না।

dhakapost
বিএনপি নেতা মনিরের কার্যালয়ে ভাঙচুর ও গুলির আলামত / ঢাকা পোস্ট

আধিপত্যের শূন্যস্থান পূরণের চেষ্টা: গোয়েন্দা তথ্য

গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, রাজধানীর গেন্ডারিয়াসহ সংলগ্ন এলাকাগুলোতে মাদক কারবার ও চাঁদাবাজির একক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন ‘অটো সজল’। তবে, গত বছরের জুনে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তাকে গুলি করার ঘটনায় সজল গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান। সম্প্রতি তার ছোট ভাই সজীবও মাদক ও অস্ত্রসহ যৌথবাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়ে কারাবন্দি রয়েছেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানের পর সজলের শক্ত ঘাঁটি ও মাদক সিন্ডিকেট তছনছ হয়ে গেলেও তৈরি হয় নেতৃত্বের শূন্যতা। গোয়েন্দাদের ধারণা, এই শূন্যস্থান দখল করতেই এলাকায় নতুন করে আধিপত্য বিস্তারের রক্তক্ষয়ী সংঘাত শুরু হয়েছে।

সূত্রটির ভাষ্য, স্থানীয়ভাবে মনির হোসেন নিজেকে মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হিসেবে উপস্থাপন করলেও, গোয়েন্দা তথ্যে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। অভিযোগ রয়েছে, মাদকবিরোধী সামাজিক উদ্যোগের আড়ালে তিনি মূলত সজলের ফেলে যাওয়া মাদক সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

কে এই ‘অটো সজল’?

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ‘অটো সজল’ নামে পরিচিত ইসমাইল হোসেন ওরফে সজল পুরান ঢাকার ওয়ারী ও গেন্ডারিয়া এলাকার চিহ্নিত শীর্ষ সন্ত্রাসী, মাদক কারবারি এবং অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ী। পরিবহনের হেল্পার পরিচয়ের আড়ালে তিনি দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীতে একটি অপরাধী সিন্ডিকেট পরিচালনা করে আসছিলেন।

অভিযোগ রয়েছে, পুরান ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় অবৈধ অস্ত্র সরবরাহ এবং হেরোইন ও ইয়াবার ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতেন সজল। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বিভিন্ন থানায় অস্ত্র ও মাদকসহ একাধিক অপরাধে তার বিরুদ্ধে ১১টি মামলা রয়েছে। যাত্রাবাড়ী, গেন্ডারিয়া, বংশাল ও চকবাজার এলাকায় চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারে তার নিজস্ব একটি গ্যাং রয়েছে, যা স্থানীয়ভাবে ‘অটো সজল গ্রুপ’ নামে পরিচিত।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রে জানা যায়, ২০২৬ সালের ২ মার্চ ঢাকার সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল এলাকায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক পরিদর্শককে গুলি করার ঘটনায় তদন্তে অস্ত্র সরবরাহকারী হিসেবে অটো সজলের নাম উঠে আসে। পরবর্তীতে ১৯ জুন সায়েদাবাদ এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ।

গ্রেপ্তারের পর গেন্ডারিয়ার স্বামীবাগে সজলের একটি ভাড়া বাসায় অভিযান চালিয়ে দুটি টরাস ব্র্যান্ডের পিস্তল, চারটি ম্যাগাজিন, ৭৭ রাউন্ড গুলি, বিপুল পরিমাণ হেরোইন ও নগদ টাকা উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার করা অস্ত্রের মধ্যে পুলিশের লুণ্ঠিত আগ্নেয়াস্ত্রও ছিল বলে পুলিশ নিশ্চিত করে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সজল বর্তমানে কারাগারে থাকলেও পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়া ও মুন্সিরটেক এলাকায় তার অনুসারীরা এখনও মাদক সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখা এবং আধিপত্য বিস্তারে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।

dhakapost
হামলার সিসিটিভি ফুটেজ থেকে সংগৃহীত স্থিরচিত্র / ঢাকা পোস্ট

মনিরের কার্যালয়ের কাছেই ভাইয়ের বাসায় হামলা

বিএনপি নেতা মনির হোসেনের কার্যালয় থেকে প্রায় ১৫০ গজ দূরেই তার বড় ভাই শাহাবুদ্দিন ওরফে বুদ্দিনের বাসা। সরেজমিনে সেই বাড়িতে গিয়ে কথা হয় নিরাপত্তা প্রহরী কাশেমের সঙ্গে। 

তিনি ঘটনার বিবরণ দিয়ে বলেন, ‘রাত ৮টার ঠিক কিছু আগে হঠাৎ বাসার দিকে চারদিক থেকে এলোপাতাড়ি ইটপাটকেল মারা শুরু হয়। আমি দ্রুত গেট বন্ধ করার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু পরিস্থিতি ভয়াবহ দেখে প্রাণভয়ে দৌড়ে বাসার ভেতরে চলে যাই।’

তিনি আরও জানান, পরে তাণ্ডব থামলে তিনি জানতে পারেন যে তার আগেই মনিরের মূল কার্যালয়েও একইভাবে হামলা ও ভাঙচুর চালিয়েছে দুষ্কৃতকারীরা।

মাদক কারবারিরা হামলা চালিয়েছে: বিএনপি নেতা মনির

ঘটনার বিষয়ে মুঠোফোনে জানতে চাওয়া হলে স্থানীয় বিএনপি নেতা মনির হোসেন দাবি করেন, তিনি নিজে উদ্যোগী হয়ে তিন মাদক কারবারিকে ধরে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিলেন।
 
“আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে মাদক কারবারিদের সোপর্দ করার বিষয়টি স্থানীয় সন্ত্রাসী ও মাদক সিন্ডিকেট ভালোভাবে মেনে নিতে পারেনি। এর জের ধরেই শীর্ষ মাদক কারবারি ‘অটো সজল’-এর ক্যাডাররা এসে আমার কার্যালয়ে ভাঙচুর চালায় এবং পুরো এলাকায় এলোপাতাড়ি গোলাগুলি শুরু করে।”

হামলাকারীদের শনাক্ত করার বিষয়ে মনির জানান, তিনি সজলের বাবা আলম, ভাগ্নে রবিন এবং ইমরানসহ চক্রের কয়েকজনকে চিনতে পেরেছেন। ঘটনার সময় নিজের উপস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি এই এলাকায় নিয়মিত থাকি না, তবে খবর পেয়েই বিষয়টি জানতে পেরেছি।’

সিসিটিভি ফুটেজ ও পুলিশের বক্তব্য

এলাকার একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, রাত ৮টার দিকে ৩০ থেকে ৩৫ জনের একদল যুবক দেশীয় অস্ত্র হাতে মুন্সিরটেক এলাকায় প্রবেশ করছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, তাদের বেশিরভাগের হাতে ধারাল অস্ত্র এবং কয়েকজনের হাতে ব্যাগ ছিল। ফুটেজে কয়েকজনকে ব্যাগের চেইন খুলতে দেখা গেলেও ব্যাগের ভেতরে আগ্নেয়াস্ত্র ছিল কি না, তা স্পষ্ট বোঝা যায়নি।

dhakapost
হামলার সিসিটিভি ফুটেজ থেকে সংগৃহীত স্থিরচিত্র / ঢাকা পোস্ট

তাণ্ডব চালানোর সময় হামলাকারীরা একটি সিসিটিভি ক্যামেরা ভেঙে ফেলে। তবে, পাশের অন্য একটি ক্যামেরার ফুটেজে যুবকদের দৌড়ে এলাকা ছেড়ে পালাতে দেখা যায়।

এ বিষয়ে গেন্ডারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান জানান, স্থানীয় বিএনপি নেতা মনির হোসেন তিন মাদক কারবারিকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেন। পুলিশ তাদের কাছ থেকে ৯৬টি ইয়াবা ও ৩০-৩৫ পুরিয়া গাঁজা উদ্ধার করেছে এবং সংশ্লিষ্ট মামলায় তাদের আদালতে পাঠানো হয়েছে।

ওসি আরও বলেন, ‘তিন মাদক কারবারিকে থানায় নিয়ে আসার পরপরই এলাকায় গোলাগুলির খবর পাই। প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, তাদের পুলিশের কাছে সোপর্দ করার প্রতিক্রিয়াতেই এই হামলা ঘটেছে। তবে, ওই তিনজন ছাড়া ঘটনায় জড়িত কাউকে এখনও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।’

মামলা সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষ লিখিত অভিযোগ দেয়নি। তবে, কেউ মামলা করতে না এলে পুলিশ নিজেই বাদী হয়ে মামলা দায়ের করবে।

এসএএ/এমএআর/