চলতি বছরের ডিসেম্বরে হতে পারে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে মাঠের রাজনীতিতে নিজেদের শক্তি যাচাইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। শুধু প্রার্থী ঘোষণা নয়, নির্বাচনের আগেই উপজেলা থেকে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যন্ত শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো দাঁড় করিয়ে মাঠ দখলের কৌশল নিয়েছে দলটি। আগামী ২৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেশের সব উপজেলায় আহ্বায়ক কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়েও সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ চলছে। দলটির একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতার বরাতে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক জোটের ওপর নির্ভর না করে নিজস্ব সংগঠন ও প্রার্থী নিয়ে এককভাবে স্থানীয় নির্বাচনে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও তৃণমূলের সাংগঠনিক প্রস্তুতি প্রসঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব ঢাকা পোস্ট-কে বলেন, ‘স্থানীয় নির্বাচনে এনসিপির মূল অবস্থান হলো দলকে এককভাবে শক্তিশালী করা। সে লক্ষ্যে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে প্রতিটি স্তরে আমাদের প্রার্থী ও সাংগঠনিক অবস্থান সুসংহত করার কাজ চলছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ধারাবাহিক কর্মীসভা আয়োজন করা হচ্ছে। গত সপ্তাহে পুরো চট্টগ্রাম বিভাগে জেলা পর্যায়ের স্থানীয় নেতাদের নিয়ে সমন্বয় সভা সম্পন্ন হয়েছে। আগামী দুই-এক মাসের মধ্যে একেবারে ওয়ার্ড বা তৃণমূল পর্যায়ের কমিটি গঠনের কাজ দ্রুত সম্পন্ন হবে। এর সঙ্গে সমন্বয় করেই মূলত স্থানীয় প্রতিনিধিদের নাম ঘোষণা করা হবে।’
প্রতিনিধি বাছাইয়ের মানদণ্ড নিয়ে তিনি জানান, প্রার্থীর সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হবে। এছাড়া, স্থানীয় মানুষের সঙ্গে প্রার্থীর সম্পৃক্ততা দেখা হবে। অন্যায়ের সঙ্গে জড়িত নন এবং নতুন করে রাজনীতিতে আসতে চান— এমন ব্যক্তিদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।’
আরও পড়ুন

আগামী ডিসেম্বরের স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে তৃণমূল পর্যায়ে শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তি দাঁড় করাতে মাঠে নেমেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। আগামী ২৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেশের সব উপজেলায় আহ্বায়ক কমিটি গঠনের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনে অংশ নিতে ইচ্ছুক সম্ভাব্য প্রার্থীদের সংগঠনে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি নেতৃত্ব নির্বাচনে বয়সসীমা, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি, নারী প্রতিনিধিত্ব ও স্থানীয় জাতিগত বৈচিত্র্য নিশ্চিতের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে
৫০ থেকে ১০০ জন প্রার্থীর নাম আগাম ঘোষণার বিষয়ে এনসিপির এই জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক বলেন, ‘প্রথম দিকে ধারণা ছিল ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে। স্বাভাবিকভাবেই আমরা আগে সিটি কর্পোরেশনসহ কিছু পৌরসভা ও উপজেলা চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী ঘোষণা করেছি। তাদের এলাকায় পরিচিত করানোর লক্ষ্যে গত জুলাই-আগস্টে কেন্দ্র থেকে নেতৃবৃন্দ গিয়ে পথসভা ও পদযাত্রার মতো কর্মসূচিও পালন করেছেন। এগুলো আমাদের ধারাবাহিক কার্যক্রমের অংশ।’
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেবল জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখছে না এনসিপি; বরং এটিকে তৃণমূলে দলটির রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরির একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে নেওয়া হচ্ছে। দলের উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম স্বাক্ষরিত সাংগঠনিক নির্দেশনায় আগামী ২৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সব উপজেলায় আহ্বায়ক কমিটি গঠনের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ কমিটি সম্ভব না হলে আপাতত ১১ থেকে ১৫ সদস্যের আংশিক কমিটি এবং পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে তা ৫১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে রূপ দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
আরও পড়ুন
শুধু উপজেলা কমিটি গঠনেই থামছে না এনসিপি। নতুন গঠিত উপজেলা কমিটিকে অবিলম্বে ইউনিয়ন পর্যায়ে আহ্বায়ক কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ নির্বাচনের সময়সূচি বা আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরুর আগেই সাংগঠনিক ভিত্তিকে তৃণমূল পর্যন্ত নিয়ে যেতে চায় দলটি।
অন্য কোনো রাজনৈতিক দল বা জোটের ওপর ভর না করে সম্পূর্ণ নিজস্ব শক্তি ও প্রার্থীর ওপর ভিত্তি করে এককভাবে স্থানীয় নির্বাচনে লড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে এনসিপি। ইতোমধ্যে দুই শতাধিক উপজেলা চেয়ারম্যান ও পৌর মেয়রের নাম চূড়ান্তকরণের কাজ চলছে। নতুন দল হিসেবে একক নির্বাচন করা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হলেও, স্থানীয়ভাবে অত্যন্ত পরিচিত, সর্বজনগ্রহণযোগ্য ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির ব্যক্তিদের প্রার্থী বানিয়ে সাংগঠনিক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠাই দলটির মূল রাজনৈতিক কৌশল
উপজেলা নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট বয়সসীমা ও শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। যেমন— আহ্বায়কের বয়স অন্তত ৪০ বছর এবং সদস্যসচিবের বয়স কমপক্ষে ৩০ বছর হওয়া বাধ্যতামূলক। এছাড়া, যারা ইতোমধ্যে উপজেলা চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হয়েছেন বা সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন, তাদের কমিটির আহ্বায়ক বা সদস্যসচিব পদে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।

নেতৃত্বের ভৌগোলিক অবস্থানের বিষয়ে বলা হয়েছে, আহ্বায়ক ও সদস্যসচিবের মধ্যে অন্তত একজনের বাসস্থান শহরের মধ্যে বা শহরের আশপাশে হওয়া বাধ্যতামূলক। দুজনেরই বাসভবন শহর বা নিকটবর্তী এলাকায় হলে তা আরও ইতিবাচক হিসেবে দেখা হবে। এছাড়া, প্রতিটি উপজেলা কমিটিতে অন্তত ৫ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব এবং স্থানীয় ধর্মীয় ও জাতিগত জনসংখ্যার আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে।
নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে পরিচিত, সর্বজনগ্রহণযোগ্য, শক্তিশালী নেতৃত্বের সক্ষমতাসম্পন্ন, সংগঠনের প্রতি অনুগত এবং পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়ার সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে সম্ভাব্য উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থীদের দলীয় সাংগঠনিক নেতৃত্বে নিয়ে আসার প্রক্রিয়াটিকে অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতে নির্বাচনী প্রার্থী এবং তৃণমূলের মূল সংগঠনকে একই সুতোয় গাঁথার একটি কৌশলগত পরিকল্পনা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
আরও পড়ুন
এ বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন ঢাকা পোস্ট-কে বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে ১০০ জন সমর্থিত প্রার্থীর (উপজেলা চেয়ারম্যান ও পৌরসভার মেয়র) নাম প্রকাশ করেছি। খুব শিগগিরই আরও ১০০ জন প্রার্থীর তালিকা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘পদযাত্রার মাধ্যমে আমরা ইতোমধ্যে উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে গেছি। বর্তমানে ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত কমিটি সম্প্রসারণের কাজ চলছে। পাশাপাশি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করার প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।’

ইউনিয়ন পর্যায়ের প্রস্তুতি সম্পর্কে মনিরা শারমিন জানান, তৃণমূল পর্যন্ত সংগঠন বিস্তারের কথা মাথায় রেখে এখন বিভাগ ধরে ধরে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে সাংগঠনিক সভা করা হচ্ছে। এসব ক্ষেত্র থেকে উঠে আসা সমর্থিত প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রস্তুতির বিষয়টিকেও দল গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিভিন্ন দলের সঙ্গে জোট গঠন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর গুঞ্জন থাকলেও, এনসিপির বর্তমান দৃশ্যমান প্রস্তুতি সম্পূর্ণ একক নির্বাচনের দিকেই। দলটির জ্যেষ্ঠ নেতারা জানান, জোটবদ্ধ নির্বাচনে গেলে আসন সমঝোতা কিংবা প্রার্থী প্রত্যাহারের মতো সমীকরণ তৈরি হয়; যা নতুন একটি দলের চটজলদি তৃণমূল ভিত্তি গড়ার পথে বাধা হতে পারে। তাই জোটের ওপর ভর না করে প্রতিটি এলাকায় নিজস্ব প্রার্থী, সংগঠন ও জনসমর্থনের ওপর ভিত্তি করে এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চায় দলটি।
আরও পড়ুন

নীতিনির্ধারকদের মতে, নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে একক নির্বাচন করা যেমন বড় ঝুঁকি, তেমনি নিজেদের রাজনৈতিক সক্ষমতা প্রমাণের চমৎকার সুযোগ। নির্বাচনে আশানুরূপ ফল এলে দেশজুড়ে দলটির গ্রহণযোগ্যতা রাতারাতি বহু গুণ বেড়ে যাবে; আবার প্রত্যাশিত ফল না পেলে দলের সাংগঠনিক ভঙ্গুরতা ও দুর্বলতাগুলোও প্রকাশ্যে আসবে। তবে ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে টানা কমিটি গঠন, ধাপে ধাপে প্রার্থী ঘোষণা এবং জোটের বাইরে থেকে এককভাবে লড়ার প্রস্তুতিতেই তারা অনড়।
জোটের সম্ভাবনার বিষয়ে জাতীয় নারীশক্তির আহ্বায়ক ও এনসিপি নেতা মনিরা শারমিন স্পষ্ট করে বলেন, ‘আমরা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রভাবে নিজেদের শক্তিতে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। জামায়াতসহ অন্যান্য দলগুলোও যার যার মতো করে প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমরা আমাদের অবস্থান থেকে ইতোমধ্যে শতাধিক প্রার্থী ঘোষণা করেছি এবং এখন পর্যন্ত এককভাবেই মাঠে নামার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছি।’
এমএসআই/এমএআর
