বিজ্ঞাপন

বিমানের কাছে সিভিল এভিয়েশনের পাওনা ৫৮৪২ কোটি, দিন দিন বাড়ছে বকেয়ার বোঝা

বিমানের কাছে সিভিল এভিয়েশনের পাওনা ৫৮৪২ কোটি, দিন দিন বাড়ছে বকেয়ার বোঝা

দেশের আকাশপথের রাষ্ট্রীয় বাহন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কাছেই বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) পাওনা ৫ হাজার ৮৪২ কোটি টাকার বেশি। বছরের পর বছর অ্যারোনটিক্যাল ও নন-অ্যারোনটিক্যাল চার্জ পরিশোধ না হওয়ায় ফুলে-ফেঁপে উঠেছে এই বকেয়া। পাঁচটি দেশীয় এয়ারলাইন্স মিলিয়ে বেবিচকের মোট পাওনা এখন ৭ হাজার কোটি টাকার বেশি—যেখানে একাই সিংহভাগ অর্থ আটকে রেখেছে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী উড়োজাহাজ সংস্থাটি।

বেবিচকের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, অ্যারোনটিক্যাল ও নন-অ্যারোনটিক্যাল চার্জসহ এই বিপুল বকেয়া নিয়ে আর্থিক চাপ বাড়ছে দেশের বেসামরিক বিমান চলাচল খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির ওপর। সরকার পরিবর্তন হয়, বিমানের প্রশাসন পরিবর্তন হয়। তবে বারবার চাপ দিয়েও বিমান থেকে টাকা আদায় করা যাচ্ছে না।

বেবিচকের অধীন বর্তমানে তিনটি আন্তর্জাতিকসহ মোট আটটি বিমানবন্দর রয়েছে। তাদের আদায় করা অ্যারোনটিক্যাল চার্জগুলোর মধ্যে রয়েছে- বিমানের ল্যান্ডিং চার্জ, রুট নেভিগেশন সার্ভিস চার্জ, বোর্ডিং ব্রিজ ব্যবহার চার্জ ও এমবারকেশন। নন-অ্যারোনটিক্যাল চার্জগুলো হলো- গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, চেক-ইন কাউন্টার ভাড়া, কার পার্কিং ও এভিয়েশন ক্যাটারিং সার্ভিস।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ১১ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা আয় এবং ৭৮৫ কোটি ২১ লাখ টাকা নিট মুনাফা দেখিয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তারা লাভ দেখিয়েছিল ২৮২ কোটি। অথচ বেবিচকের প্রায় ৬ হাজার কোটি বকেয়ার পাশাপাশি ২০২৫ সাল পর্যন্ত পদ্মা অয়েলের কাছে বিমানের বকেয়া ছিল ১ হাজার ২৭৭ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। নতুন করে তেল কেনার টাকা পরিশোধ করলেও আগের বকেয়া পরিশোধ করেনি বিমান।

বেবিচকের অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত বিমানের বিভিন্ন অ্যারোনটিক্যাল ও নন-অ্যারোনটিক্যাল চার্জের বকেয়া এবং সারচার্জ মিলে ৫ হাজার ৮৪২ কোটি ৯১ লাখ ২৩ হাজার ৮৭৪ টাকা। তবে পাওনা পরিশোধে তেমন কোনো তোড়জোড় নেই তাদের।

dhakapost

সূত্র জানায়, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বকেয়ার মধ্যে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বিল ৩ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা, চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরের ১ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা, সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৬০৩ কোটি টাকা, যশোর বিমানবন্দরে ১০ কোটি, সৈয়দপুর বিমানবন্দরে ৩৬ লাখ, রাজশাহী বিমানবন্দরে ১ কোটি ৯০ লাখ, কক্সবাজার বিমানবন্দরের ২ কোটি ২৬ লাখ এবং বরিশাল বিমানবন্দরের বিল ৩১ লাখ টাকা।

বিমানের এই বকেয়ার মধ্যে ৫১২ কোটি টাকা ভ্যাট এবং ৫৩ লাখ টাকা ইনকাম ট্যাক্সও রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এই অঙ্ক পরিশোধ না করায় প্রভাব পড়ছে দেশের রাজস্বে।

বিমানের কাছে বেবিচকের বকেয়া ৫ হাজার ৮৪২ কোটি টাকা— অঙ্কটি শুধু একটি পাওনা নয়, দেশের এভিয়েশন অবকাঠামোর বড় বিনিয়োগের সমান। এই অর্থ দিয়ে কক্সবাজার বিমানবন্দরের ৩ হাজার ৭১০ কোটি টাকার রানওয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্পের পাশাপাশি ২ হাজার ১৬ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পও প্রায় পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব ছিল। দুই প্রকল্পের মোট ব্যয় প্রায় ৫ হাজার ৭২৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ বিমানের কাছে আটকে থাকা অর্থ দিয়েই কক্সবাজার বিমানবন্দরের দুটি বড় উন্নয়ন প্রকল্পের প্রায় পুরো অর্থ জোগান দেওয়া যেত। সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণেও এর চেয়ে ৩ ভাগের এক ভাগ টাকা খরচ হয়েছে। এমনকি শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের ২১ হাজার ৩৯৯ কোটি টাকার প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় ২৭ শতাংশও এই এক বকেয়া থেকে মেটানো যেত।

এদিকে পাহাড়সম বকেয়া থাকার পরও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে ফ্লাইট পরিচালনা করতে দিচ্ছে বেবিচক। তবে অন্য এয়ারলাইন্সগুলোর ক্ষেত্রে বকেয়া পরিশোধ না করলে ফ্লাইট পরিচালনায় বিধিনিষেধও আরোপ করার নজির রয়েছে।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ উইং কমান্ডার (অব.) এটিএম নজরুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, পাওনা আদায়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলোর সঙ্গে দ্বিমুখী নীতি অনুসরণ করে বেবিচক। এই সারচার্জের দেশে বেশ কয়েকটি এয়ারলাইন্স বন্ধ হয়েছে। পুরোনো বকেয়া নিয়ে এয়ারলাইন্সগুলোর সঙ্গে বেবিচকের একসঙ্গে বসে সারচার্জ ও মূল পাওনা সমন্বয়ের একটি বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি বিমানকে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর সময় দিয়ে কিস্তিতে বকেয়া পরিশোধের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। এতে বেবিচকের পাওনা আদায় হবে এবং এয়ারলাইন্সগুলোর ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে না।

dhakapost

বর্তমানে বেসরকারি বিমান সংস্থা জিএমজি এয়ারলাইন্সের কাছে ৪১১ কোটি টাকার মতো পাওনা। দীর্ঘদিন ধরে এয়ারলাইন্সটির কার্যক্রম বন্ধ থাকা এবং নিয়মিত পরিশোধ না করায় মূল বিলের তুলনায় সারচার্জ বা জরিমানার পরিমাণ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সের কাছে বেবিচকের পাওনা প্রায় ৩৯১ কোটি, আর রিজেন্ট এয়ারওয়েজের কাছে পাওনা ৪৫৪ কোটি টাকা। এয়ারলাইন্স দুটির কার্যক্রম বন্ধ থাকা এবং নিয়মিত পরিশোধ না করায় মূল বিলের তুলনায় সারচার্জ বা জরিমানার পরিমাণ বহুগুণ বৃদ্ধি।

বিমানবন্দরগুলোতে বিভিন্ন সেবার বিপরীতে বকেয়া পড়া এই অর্থ আদায়ের জন্য সিভিল এভিয়েশনের পক্ষ থেকে নিয়মিত তদারকি ও প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেবিচকের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) মুহাম্মাদ কাউছার মাহমুদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, বেবিচক আওতাধীন বিমানবন্দরগুলোর বিভিন্ন খাতের বকেয়া পাওনা আদায়ে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছি। দেশি ও আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে এবং বকেয়া পরিশোধের জন্য তাদের ধারাবাহিকভাবে তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। অনেক এয়ারলাইন্স এরইমধ্যে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে এবং বকেয়া পরিশোধের বিষয়ে আলোচনা চলছে। আমরা আশাবাদী যে, পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমেই এই বকেয়া পাওনা দ্রুত আদায় করা সম্ভব হবে। এভিয়েশন খাতের সার্বিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং রাষ্ট্রীয় রাজস্ব আহরণ বাড়াতে বেবিচকের এমন তদারকি ও প্রচেষ্টা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।

কাগজে কলমে লাভ দেখিয়ে সরকারকে বিভ্রান্ত করছে বিমান

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ১১ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা আয় এবং ৭৮৫ কোটি ২১ লাখ টাকা নিট মুনাফা দেখিয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তারা লাভ দেখিয়েছিল ২৮২ কোটি। অথচ বেবিচকের প্রায় ৬ হাজার কোটি বকেয়ার পাশাপাশি ২০২৫ সাল পর্যন্ত পদ্মা অয়েলের কাছে বিমানের বকেয়া ছিল ১ হাজার ২৭৭ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। নতুন করে তেল কেনার টাকা পরিশোধ করলেও আগের বকেয়া পরিশোধ করেনি বিমান।

dhakapost

২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে পদ্মা অয়েলের টাকা বকেয়া রাখা শুরু করে বিমান। ২০২০ সালে বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়ায় ২১০০ কোটি টাকায়। এ বছরগুলোতে বিমান প্রতি মাসে ৩০০ কোটি টাকার জেট ফুয়েল কিনত। কিন্তু পরিশোধ করত ২০ কোটি টাকার মতো। হঠাৎ সে সময় দেশে করোনা মহামারি শুরু হলে এভিয়েশন খাতের লোকসানের কথা উল্লেখ করে বকেয়া মওকুফের আবেদন করে বিপিসি ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছিল বিমান। তবে বিল মওকুফের আবেদন খারিজ করে বিপিসি। 

২০০৮ সালে প্রায় ১৮০০ কোটি টাকার পাহাড়সম দেনায় পড়ে বিমান। ওই সময় অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদন করে ১ হাজার ২১৬ কোটি টাকার সারচার্জ মওকুফ পায় প্রতিষ্ঠানটি। বাকি ৫৭৩ কোটি টাকা পরিশোধ করে দায়মুক্তি পায়। ২০১৭ সালেও তাদের বকেয়া ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা মাফ করে দেয় বেবিচক। তবে এবার আর মাফ পাচ্ছে না তারা।

বর্তমানে ছোট ছোট কিস্তিতে টাকা পরিশোধের চেষ্টা করছে বিমান। তবে বিপিসি জানায়, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে বকেয়া পরিশোধে ১৫-১৬ বছর লেগে যাবে বলে জানিয়েছে পদ্মা অয়েল।

এআর/জেডএস