ব্র্যাকেটবন্দী দলের কাহিনি- ১

ব্র্যাকেটবন্দী দলগুলোতে ‘ব্র্যাকেট’ বাড়ছে

Aditto Rimon

৩০ আগস্ট ২০২১, ১১:০০ এএম


ব্র্যাকেটবন্দী দলগুলোতে ‘ব্র্যাকেট’ বাড়ছে

দল ভাঙাভাঙির খেলা বাংলাদেশে ৮০ দশক থেকে শুরু হয়। নেতৃত্বের কোন্দল বা আদর্শগত দ্বন্দ্বের কারণে বারবার রাজনৈতিক দলগুলোতে সৃষ্টি হয়েছে দ্বিধাবিভক্তি। একটি দল ভেঙে কয়েকটি দল হয়েছে। তবে এসব দলের অধিকাংশের সাংগঠনিক অবস্থা খুবই দুর্বল। নিবন্ধিত ৩৯টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে অন্তত ২৪টি বিভিন্ন কারণে ভেঙে ব্র্যাকেটবন্দী হয়েছে

বাংলাদেশে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ৩৯টি। এর মধ্যে ২৪টি দল ভেঙে ৩৯ টুকরা হয়ে ‘ব্র্যাকেটবন্দী’ হয়েছে। আর নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন নেই এমন দল আছে অন্তত শতাধিক। এসব দলের মধ্যে বেশ কয়েকটি আবার গঠনের পর একাধিকবার ভাঙনের মুখে পড়েছে। কেন ভাঙছে, কেন ব্র্যাকেটবন্দী হচ্ছে— এ নিয়ে ঢাকা পোস্টের বিশেষ আয়োজন ‘ব্র্যাকেটবন্দী দলের কাহিনি’। নিজস্ব প্রতিবেদক আদিত্য রিমনের অনুসন্ধানে চার পর্বের প্রতিবেদনের আজ থাকছে প্রথমটি।

দল ভাঙাভাঙির খেলা বাংলাদেশে ৮০ দশক থেকে শুরু হয়। নেতৃত্বের কোন্দল বা আদর্শগত দ্বন্দ্বের কারণে বারবার রাজনৈতিক দলগুলোতে সৃষ্টি হয়েছে দ্বিধাবিভক্তি। একটি দল ভেঙে কয়েকটি দল হয়েছে। আবার অনেক সময় ক্ষমতাসীন সরকারের ইন্ধনে বিরোধী দলে ভাঙন দেখা দিয়েছে। অনেকে আবার ক্ষমতার লোভে পড়ে দল ভাঙেন বা ছাড়েন। এভাবে রাজনৈতিক দলগুলো ভেঙে একই নামে ব্র্যাকেটবন্দী হচ্ছে। তবে এসব দলের অধিকাংশের সাংগঠনিক অবস্থা খুবই দুর্বল। নিবন্ধিত ৩৯টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে অন্তত ২৪টি বিভিন্ন কারণে ভেঙে ব্র্যাকেটবন্দী হয়েছে।

বিভিন্ন দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে অনিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা অন্তত শতাধিক। এর মধ্যে সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় রয়েছে মাত্র গুটিকয়েক। দলগুলো আবার নানাভাবে বিভক্ত। এর মধ্যে অনিবন্ধিত তিনটি দল ভেঙে সাত টুকরা হয়েছে। এসব দলের মধ্যে এমন দুটি দল আছে যারা ভেঙে ছয় টুকরা হয়ে একই নামে ব্র্যাকেটবন্দী হয়েছে। নিবন্ধিত ব্র্যাকেটবন্দী সাতটি দলের বিতর্কিত একাদশ সংসদে ৩৭ জনপ্রতিনিধিও রয়েছেন। এর মধ্যে জাতীয় পার্টির (জাপা) জি এম কাদেরের অংশের ২৪ জন, রওশন-বিদিশা অংশের দুজন, জাতীয় পার্টি আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর অংশের একজন, বিকল্পধারার বি. চৌধুরীর অংশের দুজন, গণফোরামের ড. কামালের অংশের দুজন, জাসদের হাসানুল হক ইনুর অংশের দুজন এবং বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেননের অংশের চারজন জনপ্রতিনিধি রয়েছেন সংসদে।

গণফোরাম ‘গৃহবন্দী’

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সর্বশেষ ভাঙনের মুখে পড়ে গণফোরাম। দীর্ঘদিন দলটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রেজা কিবরিয়াকে কেন্দ্র করে নেতাদের মধ্যে অন্তর্কলহ চলছিল। একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে দল থেকে পদত্যাগ করেন রেজা। তারপরও নানা জটিলতার কারণে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ভেঙে দুভাগে বিভক্ত হয় ১৯৯২ সালে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত দলটি। নতুন অংশের দায়িত্ব নেন মোস্তফা মহসিন মন্টু। তিনি হন এর আহ্বায়ক।

নানা জটিলতার কারণে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ড. কামাল হোসেনের গণফোরাম ভেঙে দুভাগে বিভক্ত হয়। নতুন অংশের দায়িত্ব নেন মোস্তফা মহসিন মন্টু। তিনি হন এর আহ্বায়ক।

তবে, গণফোরামের দুই অংশের সাংগঠনিক অবস্থা খুবই বেহাল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর থেকে কার্যত স্বেচ্ছায় গৃহবন্দী ড. কামাল হোসেন। দীর্ঘ এক বছরের বেশি সময় ধরে তিনি কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেন না। অন্যদিকে, মন্টুর নেতৃত্বাধীন নতুন অংশের আহ্বায়ক কমিটি গঠনের পাঁচ মাস অতিবাহিত হলেও সম্মেলন করতে পারেননি তারা। যদিও এ অংশটিকে করোনার মধ্যে রাজধানীকেন্দ্রিক দু-একদিন ত্রাণ বিতরণ করতে দেখা গেছে। মাঝেমধ্যে মতিঝিলের ইডেনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বসে নেতারা মিটিং করেন।

dhaka post
রেজা কিবরিয়াকে নিয়ে দ্বন্দ্বে ভেঙে যায় গণফোরাম। আলাদা হন ড. কামাল হোসেন ও মোস্তফা মহসিন মন্টু / ফাইল ছবি

সার্বিক কর্মকাণ্ড প্রসঙ্গে ড. কামাল হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, করোনা আসার পর থেকে তো গৃহবন্দী হয়ে আছি। তারপরও দলের যেখানে যেখানে কমিটি আছে, তাদেরকে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া আছে। করোনার কারণে দেশে তো কোনো  রাজনীতি নেই। সরকারের কর্মকাণ্ডে মনে হয় না তারা করোনা নিয়ে ভাবে।

অন্যদিকে, নিজের শারীরিক অসুস্থতার কথা জানিয়ে মোস্তফা মহসিন মন্টু বলেন, শারীরিক অবস্থা ভালো নয়। তারপরও আমরা কাজ করে যাচ্ছি। দেশে করোনা মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ায় সম্মেলন করতে পারিনি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সম্মেলন করব।

অস্তিত্ব সংকটে ব্র্যাকেটবন্দী বিকল্প ধারা

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনের আগে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যোগ দেওয়া নিয়ে বি. চৌধুরীর বিকল্পধারায় বিরোধ দেখা দেয়। ওই বছরের ১৯ অক্টোবর দলের প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও তার ছেলে মাহি বি. চৌধুরীকে দল থেকে বাদ দিয়ে নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। ফলে ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত দলটি ভেঙে দুভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। মূল অংশের দায়িত্বে থাকেন অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী, নতুন অংশের সভাপতি হন নুরুল আমিন ব্যাপারী।

ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও তার ছেলে মাহি বি. চৌধুরীকে দল থেকে বাদ দিয়ে নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। ফলে ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত দলটি ভেঙে দুভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। মূল অংশের দায়িত্বে থাকেন অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী, নতুন অংশের সভাপতি হন নুরুল আমিন ব্যাপারী

বি. চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিকল্পধারা একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে অংশ নেয়। আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক নিয়ে দলটির দুই নেতা সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হন। তবে দলটি সাংগঠনিক অবস্থা বর্তমানে খুবই দুর্বল। দলের দুই সংসদ সদস্য মাহি বি. চৌধুরী ও আবদুল মান্নানকে কেন্দ্র করে মুন্সিগঞ্জ- ১ ও লক্ষ্মীপুর- ৪ আসনে কিছু রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। এর বাইরে বিভিন্ন দিবসভিত্তিক প্রেস রিলিজ দেওয়া ছাড়া তেমন তৎপরতা দেখা যায় না তাদের।

dhaka post
ব্র্যাকেটবন্দী বিকল্প ধারা : ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, মাহি বি. চৌধুরী ও নুরুল আমিন ব্যাপারী / ফাইল ছবি

সার্বিক কার্যক্রম সম্পর্কে বি. চৌধুরী ঢাকা পোস্টকে বলেন, করোনার মধ্যে রাজনীতি নয়, বেঁচে থাকাই জরুরি। তারপরও আমাদের যে দুটি আসনে সংসদ সদস্য রয়েছেন, সেখানে দলের পক্ষ থেকে ত্রাণকার্যক্রম চালানো হয়েছে। মাঝেমধ্যে ভার্চুয়ালি দলের বৈঠকও অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

এদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নুরুল আমিনের নেতৃত্বাধীন বিকল্পধারা প্রায় অস্তিত্বহীন। মূলত এ অংশটি দুজন নেতানির্ভর দল। দলটির নিজস্ব কোনো কর্মসূচি কখনও ছিল না। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে কোনো কর্মসূচি হলে দলের সভাপতি নুরুল আমিন ও মহাসচিব শাহ আহম্মেদ বাদল তাতে অংশ নেন।

রাজনৈতিক কর্মসূচি না নেওয়া প্রসঙ্গে নুরুল আমিন ঢাকা পোস্টকে বলেন, আসলে দেশে তো কোনো রাজনীতি নাই। করোনার কারণে আমরা সম্মেলন করতে পারিনি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে করার ইচ্ছা আছে। যেহেতু আমরা নতুন করে শুরু করেছি, তাই সারাদেশে এখনও আমাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম নাই।

এলডিপির এক অংশ অলিনির্ভর, অপর অংশ এলাকানির্ভর

২০০৬ সালে বি. চৌধুরীর বিকল্পধারার সঙ্গে সাবেক বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য অলি আহমদের নেতৃত্বে ২৪ এমপি-মন্ত্রী মিলে প্রতিষ্ঠা করেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)। যদিও ২০০৭ সালে এ দল থেকে বি. চৌধুরীর বিকল্পধারা বেরিয়ে যায়। ২০১৯ সালে নেতৃত্বের দ্বন্দ্বের কারণে এলডিপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিমের নেতৃত্বে একটি অংশ বেরিয়ে এসে একই নামে আরেকটি দল করে ব্র্যাকেটবন্দী হন। মূল অংশের নেতৃত্বে থাকেন অলি আহমদ, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) অপর অংশের সভাপতি হন আবদুল করিম আব্বাসী। দুই অংশই বিএনপি জোটের শরিক।

২০১৯ সালে নেতৃত্বের দ্বন্দ্বের কারণে এলডিপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিমের নেতৃত্বে একটি অংশ বেরিয়ে এসে একই নামে আরেকটি দল করে ব্র্যাকেটবন্দী হন

চেয়ারম্যান অলি আহমদকে কেন্দ্র করে এলডিপির সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু দেশে করোনার প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে রাজনৈতিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন তিনি। অন্যদিকে, ২০১৯ সালে খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য বিএনপিকে বাদ দিয়ে ‘মুক্তিমঞ্চ’ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। এটি নিয়ে অলি আহমদের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হয় বিএনপির। দলটির এ অংশের চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, চাঁদপুর ও বগুড়ায় অল্পবিস্তর সাংগঠনিক কার্যক্রম রয়েছে।

dhaka post
ব্র্যাকেটবন্দী এলডিপি : অলি আহমদ, শাহাদাত হোসেন সেলিম ও আবদুল করিম আব্বাসী / ফাইল ছবি

দলীয় কর্মকাণ্ডের বিষয়ে জানতে অলি আহমদের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হয়। কিন্তু তাকে পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে, এলডিপির আব্বাসী অংশের কর্মকাণ্ড মূলত মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিমকে ঘিরে পরিচালিত হয়। মহাসচিবের নির্বাচনী এলাকা লক্ষ্মীপুর ও চট্টগ্রামে দলটির কিছু সাংগঠনিক কার্যক্রম আছে। এর বাইরে অন্য কোনো এলাকায় কার্যক্রম নেই।

এ প্রসঙ্গে শাহাদাত হোসেন সেলিম ঢাকা পোস্টকে বলেন, করোনার কারণে দলের কার্যক্রম বন্ধ আছে। তারপরও সারাদেশের ১৫-১৬টির মতো জেলায় সাংগঠনিক ইউনিট আছে। ১০১ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটি আছে। সেখানে ছয়-সাতজনের মতো নারী সদস্য আছেন।

কে জেলে যেতে চায়, প্রতিটি জেলায় মুসলিম লীগের ৫-১০ জন লোক আছে

১৯৭৬ সালে আবদুস সবুর খানের (খান এ সবুর) নেতৃত্বে পুনরুজ্জীবিত হয় বাংলাদেশ মুসলিম লীগ। তখন এর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শাহ আজিজুর রহমান। ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ মুসলিম লীগ দুটি অংশে বিভক্ত হয়। একটি অংশের নেতৃত্ব দেন আবদুস সবুর খান, অন্য অংশের শাহ আজিজুর রহমান। ১৯৮২ সালে আবদুস সবুর খানের মৃত্যুর পর মুসলিম লীগ কয়েকটি অংশে বিভক্ত হয়। এর মধ্যে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন পায় দুটি দল। একটি হলো- কামরুজ্জামান খানের সভাপতিত্বে বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (বিএমএল), অন্যটি হলো- বেগম জুবেদা কাদের চৌধুরীর সভাপতিত্বে বাংলাদেশ মুসলিম লীগ।

১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ মুসলিম লীগ দুটি অংশে বিভক্ত হয়। একটি অংশের নেতৃত্ব দেন আবদুস সবুর খান, অন্য অংশের শাহ আজিজুর রহমান। ১৯৮২ সালে আবদুস সবুর খানের মৃত্যুর পর মুসলিম লীগ কয়েকটি অংশে বিভক্ত হয়

কামরুজ্জামান খানের মুসলিম লীগ বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিক। সার্বিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রসঙ্গে কামরুজ্জামান খান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আমি এলাকায় থাকি। কাজ থাকলে ঢাকায় আসি। আর এখন কে জেলে যেতে চায়? দেশের প্রতিটি জেলায় মুসলিম লীগের পাঁচ থেকে ১০ জন লোক আছেন। কিন্তু কোনো কমিটি নাই।’

dhaka post
ব্র্যাকেটবন্দী মুসলিম লীগ : আবদুস সবুর খানের (খান এ সবুর), কামরুজ্জামান খান ও বেগম জুবেদা কাদের চৌধুরী / ফাইল ছবি

বেগম জুবেদা কাদের চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজী আবুল খায়ের বলেন, ‘আমাদের সভাপতি পাবনায় থাকেন। দলের মিটিং হলে ঢাকায় আসেন। ৩০টির মতো জেলায় আমাদের সাংগঠনিক কমিটি আছে।’

ধুঁকছে পিডিপির উভয় অংশ

এক-এগারোর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেন বিএনপির সাবেক নেতা প্রয়াত ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী। তার নেতৃত্বে গঠিত হয় প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দল (পিডিপি)। ২০১৬ সালের ২৬ ডিসেম্বর দলটিতে ভাঙন ধরে। সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এম দেলাওয়ার হোসেনের নেতৃত্বে একটি অংশ বেরিয়ে যায়। একই নামে আরেকটি দল গঠন করেন তারা। এ অংশের চেয়ারম্যান হন এম দেলাওয়ার হোসেন। ২০২০ সালের ৩১ আগস্ট কোরেশীর মৃত্যুর পর পিডিপির কোনো চেয়ারম্যান নেই। যদিও তার স্ত্রী নিলুফার পান্না কোরেশী নিজেকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে পরিচয় দেন।

এক-এগারোর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেন বিএনপির সাবেক নেতা প্রয়াত ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী। তার নেতৃত্বে গঠিত হয় প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দল (পিডিপি)। ২০১৬ সালের ২৬ ডিসেম্বর দলটিতে ভাঙন ধরে

নিলুফার পান্না কোরেশীর নেতৃত্বাধীন পিডিপি নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধিত দল ছিল। কিন্তু ২০২০ সালের ডিসেম্বরে দলটির নিবন্ধন বাতিল করে নির্বাচন কমিশন। কারণ, সক্রিয় কেন্দ্রীয় দফতর, এক তৃতীয়াংশ জেলা দফতর ও ১০০টি উপজেলা/থানা কার্যালয়ের ঠিকানা ও কমিটির তালিকা জমা দিতে ব্যর্থ হয় দলটি। ২০১৭ সালের পর এ অংশটি আর সম্মেলন করতে পারেনি। দলটির তোপখানা রোডের কেন্দ্রীয় কার্যালয়টিও বছরের অধিকাংশ সময় তালাবদ্ধ থাকে। অন্যদিকে, দেলাওয়ার হোসেনের নেতৃত্বাধীন পিডিপির কোনো অস্তিত্ব নেই বর্তমানে।

পান্নার অংশের পিডিপির প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী আবদুর রহিম অনেকটা কষ্ট নিয়ে ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আমাদের দলের নিবন্ধন তো বাতিল হয়ে গেছে। সত্য কথা কী, এখন দলের কিছুই নেই। অনেক চেষ্টা করেও দলকে গোছাতে পারি নাই। কোরেশী ভাইয়ের মৃত্যুর পর আমাদের আশা ছিল সম্মেলন করে পান্না আপাকে চেয়ারম্যান করার। কিন্তু সেটিও করতে পারি নাই। ছোট দল কিন্তু সবাই গ্রুপিং নিয়ে ব্যস্ত।’

জাগপায় তিন ব্র্যাকেট

১৯৮০ সালের ৬ এপ্রিল রমনার সবুজ চত্বরে ঘোষণাপত্র পাঠের মাধ্যমে জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) নামের নতুন একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেন ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শফিউল আলম প্রধান। ২০১৬ সালে দলটির সহ-সভাপতি মহিউদ্দিন বাবলুর নেতৃত্বে একটি অংশ বেরিয়ে যায়। একই নামে আরেকটি দল গঠনের মধ্য দিয়ে ভাঙন শুরু হয় মূল জাগপার। ২০১৯ সালে প্রধানের মেয়ে ও দলটির বর্তমান সভাপতি তাসনিয়া প্রধানকে অব্যাহতি দেন জাগপার সাধারণ সম্পাদক খন্দকার লৎফুর রহমান। আরেক দফা ভাঙনের কবলে পড়ে দলটি। বর্তমানে জাগপা নামে তিনটি দল রয়েছে।

২০১৬ সালে দলটির সহ-সভাপতি মহিউদ্দিন বাবলুর নেতৃত্বে একটি অংশ বেরিয়ে যায়। একই নামে আরেকটি দল গঠনের মধ্য দিয়ে ভাঙন শুরু হয় মূল জাগপার। ২০১৯ সালে প্রধানের মেয়ে ও দলটির বর্তমান সভাপতি তাসনিয়া প্রধানকে অব্যাহতি দেন জাগপার সাধারণ সম্পাদক খন্দকার লৎফুর রহমান। আরেক দফা ভাঙনের কবলে পড়ে দলটি

দলগুলো হলো- অ্যাডভোকেট তাসনিয়া প্রধানের নেতৃত্বে জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), মহিউদ্দিন বাবলুর নেতৃত্বে জাগপা এবং খন্দকার লৎফুর রহমানের নেতৃত্বাধীন জাগপা। তারা সবাই স্ব স্ব দলের চেয়ারম্যান।

জাগপার তিন অংশের মধ্যে তাসনিয়া প্রধানের নেতৃত্বাধীন অংশটি নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন পায়। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের শর্ত অনুযায়ী দেশের এক-তৃতীয়াংশ প্রশাসনিক জেলায় আবশ্যকীয় দলের কার্যকর দফতর থাকার শর্ত পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় নিবন্ধন বাতিল হয়ে যায়। জানা যায়, বর্তমানে তাসনিয়া প্রধান রাজনীতির চেয়ে নিজের আইন পেশায় বেশি সময় দিচ্ছেন। অন্যদিকে, মহিউদ্দিন বাবলুর নেতৃত্বাধীন জাগপার অস্তিত্ব অনেকটা বিলীন হওয়ার পথে।

dhaka post
ব্র্যাকেটবন্দী জাগপা : শফিউল আলম প্রধান, তাসনিয়া প্রধান ও খন্দকার লৎফুর রহমান / ফাইল ছবি

জাগপার সাংগঠনিক কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে তাসনিয়া প্রধান ঢাকা পোস্টকে বলেন, দলের নিবন্ধন বাতিল হলেও আগে যেখানে-যেখানে আমাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম ছিল তা এখন গোছানো হচ্ছে। বর্তমানে দেশের ৩১টি জেলায় দলের কার্যক্রম রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

জাগপার তৃতীয় অংশের চেয়ারম্যান খন্দকার লৎফুর রহমান একসময় বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের বৈঠক ও কর্মসূচিতে অংশ নিতেন। মাঝেমধ্যে দলটির নিজস্ব ব্যানারে জাতীয় প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠানের আয়োজনও করতেন। কিন্তু করোনা আসার পর রাজনীতির মাঠে এ অংশটি একেবারে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।

এ প্রসঙ্গে খন্দকার লৎফুর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, করোনা কারণে অন্য দলগুলোর মতো আমাদের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ আছে। আশা করি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবারও কর্মকাণ্ড শুরু করতে পারব। ২০১৯ সালে সর্বশেষ আমাদের সম্মেলন হয়েছে। ১০১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি থাকার কথা থাকলেও তা পূরণ হয়নি। তবে কমিটিতে ১০-১২ জন নারী সদস্য রয়েছেন।

প্রেস ক্লাবে সক্রিয় ইরানের লেবার পার্টি, ফেসবুকে হামদুল্লাহ

১৯৭৪ সালে মাওলানা আবদুল মতীনের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ লেবার পার্টি। ১৯৭৫ সালে দেশের সব রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা হয়। ওই সময় এর কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৭৮ সালে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট গঠন করলে সেখানে যোগ দেয় লেবার পার্টি। পরবর্তীতে ফ্রন্ট বিলুপ্ত হলে লেবার পার্টি বেরিয়ে আসে। ১৯৯৯ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট গঠন হলে সেখানে যোগ দেয় লেবার পার্টি।

মোস্তাফিজুর রহমান ইরানের নেতৃত্বে লেবার পার্টি এবং হামদুল্লাহ আল মেহেদির নেতৃত্বে বাংলাদেশ লেবার পার্টি পরিচালিত হচ্ছে। প্রথম অংশটি জাতীয় প্রেস ক্লাবকেন্দ্রিক সভা-সেমিনার করে। দ্বিতীয় অংশটি ফেসবুকে নিয়মিত স্ট্যাটাস দেয়

২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে দলটির মহাসচিব হামদুল্লাহ আল মেহেদির নেতৃত্বে একটি অংশ জোট থেকে বেরিয়ে আসে। তারা যোগ দেন বি. চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন জোট যুক্তফ্রন্টে। লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরানের নেতৃত্বে একটি অংশ ২০ দলীয় জোটে থেকে যায়।

বর্তমানে মোস্তাফিজুর রহমান ইরানের নেতৃত্বে লেবার পার্টি এবং হামদুল্লাহ আল মেহেদির নেতৃত্বে বাংলাদেশ লেবার পার্টি পরিচালিত হচ্ছে। প্রথম অংশটি জাতীয় প্রেস ক্লাবকেন্দ্রিক সভা-সেমিনার করে। দ্বিতীয় অংশটি ফেসবুকে নিয়মিত স্ট্যাটাস দেয়।

জানা যায়, ২০১৬ সালের পর ইরানের নেতৃত্বাধীন লেবার পার্টিতে কোনো সম্মেলন হয়নি। ৭১ সদস্যবিশিষ্ট এ অংশের কমিটিতে বর্তমানে কত সদস্য বেঁচে আছেন তারও সঠিক হিসাব নেই দলের চেয়ারম্যানের কাছে।

dhaka post
ব্র্যাকেটবন্দী লেবার পার্টি : মাওলানা আবদুল মতীন, মোস্তাফিজুর রহমান ইরান ও হামদুল্লাহ আল মেহেদি / ফাইল ছবি

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোস্তাফিজুর রহমান ইরান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ৭১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটির চার/পাঁচজনের মতো মারা গেছেন। কমিটিতে সাতজন নারী সদস্য আছেন। নিজ নির্বাচনী এলাকা পিরোজপুরসহ দেশের বেশকিছু জেলায় দলের সাংগঠনিক কমিটি আছে বলেও দাবি করেন তিনি।

অন্যদিকে, হামদুল্লাহ মেহেদির নেতৃত্বাধীন লেবার পার্টির কোনো সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রম নেই। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের জোট যুক্তফ্রন্ট তো নাই হয়ে গেছে। দেশে এখন রাজনীতি নাই। ফলে আমাদের মতো ছোট দলের কী আর করার আছে?’

লেবার পার্টির এ অংশে ৭১ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটি রয়েছে। সেখানে নারী সদস্য আছেন তিনজন। সারাদেশের ১০টির মতো জেলায় দলের কার্যক্রম রয়েছে বলেও দাবি করেন হামদুল্লাহ মেহেদি।

দ্বিতীয় পর্বে থাকছে : সবচেয়ে বেশি ব্র্যাকেট জাতীয় পার্টিতে

এএইচআর/এমএআর/এমএইচএস

Link copied