স্বাস্থ্যখাতের দুর্দশায় ৫০ শতাংশ চিকিৎসক, ২০ শতাংশ রাজনীতিবিদরা দায়ী

দেশের স্বাস্থ্যখাতের বর্তমান বেহাল অবস্থার জন্য চিকিৎসক, আমলা ও রাজনীতিবিদরা দায়ী বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা) কাজী দেলোয়ার হোসেন।
তার মতে, এই খাতের দুর্দশার জন্য চিকিৎসকেরা ৫০ শতাংশ, আমলারা ৩০ শতাংশ এবং রাজনীতিবিদরা ২০ শতাংশ দায়ী। এই তিন পক্ষের দায়িত্ব অবহেলা ও সমন্বয়হীনতার কারণেই স্বাস্থ্যখাতের প্রত্যাশিত উন্নতি হচ্ছে না।
বুধবার (২১ জানুয়ারি) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশ রোড টু ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।
সভায় দেশের বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকেরা স্বাস্থ্যসেবাকে কেবল চিকিৎসার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে একে মানুষের মৌলিক অধিকার ও সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনার দাবি জানান।
কাজী দেলোয়ার হোসেন আরও বলেন, ‘ত্রৈমূলক দায়িত্ব অমান্য ও অবহেলার কারণে স্বাস্থ্যখাতের উন্নতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক সময় সরকারের মধ্যেই সরকার বাধা সৃষ্টি করে। সরকারি সেবার লক্ষ্য মানুষের সেবা হলেও বেসরকারি খাতের লক্ষ্য মূলত মুনাফা। এই ফাঁকগুলো নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যকর করা সম্ভব নয়।’
চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে তিনি বলেন, চেম্বারে কাজ শেষে অনেক চিকিৎসক বাসায় ফিরেও নিরাপদে ঘুমাতে পারছেন না।
সভায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এম এ ফয়েজ বলেন, স্বাস্থ্য মানুষের মৌলিক অধিকার। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার (পিএইচসি) জন্য একটি অধ্যাদেশ বা আইন থাকা এখন সময়ের দাবি। রাষ্ট্রের দায়িত্ব সব নাগরিকের জন্য মানসম্মত ও সাশ্রয়ী মূল্যের সেবা নিশ্চিত করা। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় ন্যায্যতা আনতে জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি ও সাংবিধানিক আদেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দ্রুত সংস্কার প্রয়োজন।
স্বাস্থ্যখাত সংস্কার কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ডা. আকরাম হোসেন বলেন, স্বাস্থ্যকে একটি মৌলিক রাজনৈতিক অঙ্গীকার হিসেবে দেখতে হবে। সব রাজনৈতিক দলের উচিত এই খাতকে গুরুত্ব দেওয়া। মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছাতে বিকেন্দ্রীকরণের কোনো বিকল্প নেই।
ব্র্যাকের সিনিয়র পরিচালক আকরামুল ইসলাম তার বক্তব্যে গুণগত পরিবর্তনের ওপর জোর দিয়ে বলেন, বর্তমানে যেভাবে স্বাস্থ্যসেবা পরিচালনা করা হচ্ছে, তা দীর্ঘমেয়াদে যথেষ্ট নয়। সরকারি ও বেসরকারি– উভয় খাতের সেবার মান নিশ্চিত করতে জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ানো প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. রোমানা হক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার কাঠামো স্পষ্ট করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ইউনিয়ন বা উপজেলা পর্যায়ে কতজন চিকিৎসক থাকবেন এবং স্বাস্থ্যসেবা টিমের গঠন কেমন হবে, তা সুনির্দিষ্ট করা দরকার। বিক্ষিপ্তভাবে না এগিয়ে একটি নির্দিষ্ট মডেল অনুযায়ী এগোলে সব নাগরিকের জন্য সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব।
অবসটেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনিকলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের (ওজিএসবি) সাবেক সভাপতি রওশন আরা বেগম মাতৃ স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, দেশে প্রায় ৯ থেকে ১০ হাজার মিডওয়াইফ বেকার বসে আছেন। এই দক্ষ জনশক্তিকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো প্রয়োজন। সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া এ খাতের উন্নতি অসম্ভব।
আলোচনা সভায় বক্তারা আরও বলেন, কোন কোন সেবা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার (পিএইচসি) আওতায় আসবে, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি। স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং এটি কেবল সঠিক নীতি ও পরিকল্পনার মাধ্যমেই টেকসই হতে পারে।
অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
টিআই/বিআরইউ