নীরব ঘাতক ‘অসংক্রামক রোগ’ মোকাবিলায় নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতের তাগিদ

নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অভাব এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের ওপর বাড়তি নির্ভরতার কারণে বাংলাদেশে উচ্চরক্তচাপসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগ ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও ট্রান্সফ্যাটযুক্ত খাবার এসব রোগের প্রধান ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত হলেও ভোক্তাদের সচেতনতা এখনও আশঙ্কাজনকভাবে কম। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সহজবোধ্য ফ্রন্ট-অফ-প্যাক লেবেলিং চালু ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতের ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
শনিবার (১ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস-২০২৬ উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক ওয়েবিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।
গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের (জিএইচএআই) সহযোগিতায় গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) আয়োজন করে অসংক্রামক রোগ মোকাবিলায় নিরাপদ খাদ্য এবং আমাদের করণীয় শীর্ষক এই ওয়েবিনার। এবছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ছিল— “নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করি, সুস্থ সবল জীবন গড়ি”।
ওয়েবিনারে জানানো হয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৫ লাখ ৭০ হাজার মানুষ অসংক্রামক রোগে প্রাণ হারান। গ্লোবাল বারডেন অফ ডিজিজ (জিবিডি) ২০২১-এর হিসাব বলছে, অতিরিক্ত সোডিয়াম, ট্রান্সফ্যাটযুক্ত খাবার ও চিনিযুক্ত কোমল পানীয়সহ অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের কারণে দেশে বছরে অন্তত ২৭ হাজার ৩৮৭ জনের মৃত্যু হচ্ছে। অথচ এই খাত নিয়ন্ত্রণে বরাদ্দ অত্যন্ত সীমিত— মোট স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র ৪ দশমিক ২ শতাংশ।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ইপিডেমিওলজি অ্যান্ড রিসার্চ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, উচ্চ রক্তচাপসহ অন্যান্য অসংক্রামক রোগ এখন আর কেবল চিকিৎসা-সংক্রান্ত সমস্যা নয়, এটি জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে।
তিনি বলেন, জনগণের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনতে হবে। প্রক্রিয়াজাত খাবারের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা এখন সবচেয়ে জরুরি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. নাজমা শাহীন বলেন, ভোক্তারা কী খাচ্ছেন, তার পুষ্টিগুণ বা ঝুঁকি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা না থাকাই বড় সমস্যা। অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও ট্রান্সফ্যাটের মতো ক্ষতিকর উপাদান সম্পর্কে সহজ ও দৃশ্যমান তথ্য দিতে ফ্রন্ট-অফ-প্যাক লেবেলিং কার্যকর একটি ব্যবস্থা হতে পারে। এটি উচ্চ রক্তচাপসহ অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমাতে বাস্তব ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব বলেন, প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে ভোক্তাদের সচেতন করতে সরকার ফ্রন্ট-অফ-প্যাক লেবেলিং ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। সহজবোধ্যভাবে প্যাকেটের সামনেই তথ্য দিলে ভোক্তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। আশা করছি, দ্রুতই এই ব্যবস্থা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।
জিএইচএআই-এর বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড মুহাম্মাদ রূহুল কুদ্দুস বলেন, অসংক্রামক রোগ মোকাবেলায় সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি টেকসই অর্থায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। তাঁর মতে, পর্যাপ্ত বরাদ্দ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা সম্ভব নয়।
ওয়েবিনারে আলোচক হিসেবে আরও বক্তব্য দেন ডেইলি টাইমস অব বাংলাদেশ-এর হেড অব অনলাইন (বাংলা) মো. মনির হোসেন লিটন। প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়েরের সভাপতিত্বে আয়োজিত ওয়েবিনারটি সঞ্চালনা করেন প্রজ্ঞার প্রোগ্রাম অফিসার সামিহা বিনতে কামাল।
ওয়েবিনারে প্রিন্ট, টেলিভিশন ও অনলাইন মিডিয়ার সাংবাদিক, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, গবেষক ও বিভিন্ন পেশাজীবীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অংশগ্রহণকারীরা যুক্ত হন।
টিআই/এমএসএ