চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর বহুমুখী সংক্রমণ : প্রস্তুতি ও নজরদারি জোরদারের আহ্বান

চট্টগ্রামে ডেঙ্গু রোগীদের মধ্যে একই সময়ে ভাইরাসের একাধিক ধরনে (সেরোটাইপ) আক্রান্ত হওয়ার হার বেড়েছে। ২০২৫ সালে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, বন্দরনগরীর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ডেঙ্গু রোগীর শরীরে একই সঙ্গে দুই বা ততোধিক ধরনের ভাইরাসের উপস্থিতি রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘কো-সংক্রমণ’ বা সংক্রমণের এই বহুমুখী প্রবণতা ভবিষ্যতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ও চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল মেডিকেল কলেজ-এর মাইক্রোবায়োলজি ও মেডিসিন বিভাগ টানা ছয় মাস ধরে ২২৩ জন নিশ্চিত ডেঙ্গু রোগীর নমুনা পরীক্ষা করে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে। গবেষণাপত্রটি ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি প্রি-প্রিন্ট প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত হয়েছে এবং একটি স্বীকৃত পিয়ার-রিভিউড জার্নালে পর্যালোচনার জন্য জমা দেওয়া হয়েছে।
মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. রজত শংকর রায় বিশ্বাসের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন একই প্রতিষ্ঠানের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সিনিয়র ল্যাবরেটরি টেকনোলজিস্ট তমাল মোহরার, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ-এর সহযোগী অধ্যাপক ডা. রেজাউল করিম, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়-এর জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. মাহবুব হাসান এবং অধ্যাপক ডা. সঞ্জয় কান্তি বিশ্বাস।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরীক্ষায় ডেন-২ সেরোটাইপ সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হয়েছে, যার হার ৭৩ দশমিক ১ শতাংশ। এ ছাড়া ডেন-৩ সেরোটাইপ পাওয়া গেছে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ডেন-১ সেরোটাইপ ১ দশমিক ৩ শতাংশ রোগীর শরীরে।
গবেষকেরা জানান, ২০২৩ ও ২০২৪ সালের মতো ২০২৫ সালেও ডেন-২-এর প্রাধান্য থাকলেও এ বছর ডেন-৩ দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ডেন-২-এর সঙ্গে মিলিত হয়ে কো-সংক্রমণের ঘটনা বাড়িয়েছে।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডেন-২ ও ডেন-৩ একসঙ্গে পাওয়া গেছে মোট রোগীর ১৪ দশমিক ৩ শতাংশের শরীরে। ডেন-১ ও ডেন-২ শনাক্ত হয়েছে ৩ দশমিক ৬ শতাংশে। খুব অল্প ক্ষেত্রে তিনটি সেরোটাইপ একসঙ্গে পাওয়া গেছে, যার হার শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ। ডেন-৩ ও ডেন-৪ একত্রে শনাক্ত হয়েছে আরও শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে। গবেষকদের মতে, সেরোটাইপের এই পরিবর্তন বা ‘টুইস্টিং’ ভবিষ্যতে রোগের তীব্রতা বাড়িয়ে দিতে পারে।
গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত রোগীদের মধ্যে ১১৩ জন পুরুষ এবং ১১০ জন নারী ছিলেন। বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সীদের আক্রান্ত হওয়ার হার সর্বোচ্চ (৩১ দশমিক ৪ শতাংশ)। এরপর ৩১ থেকে ৪০ বছর বয়সী ২৪ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ১৩ থেকে ২০ বছর বয়সী ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ। এ ছাড়া ৫ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুর হার ১ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ৬১ বছরের বেশি বয়সীদের হার ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে ভাইরাসমাত্রা বিশ্লেষণে নারী ও পুরুষের মধ্যে বিশেষ কোনো পার্থক্য পাওয়া যায়নি।
গবেষণা দলের মতে, একই এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে একাধিক সেরোটাইপের সক্রিয় উপস্থিতি এবং সারা বছর ডেঙ্গুর সংক্রমণ চলমান থাকা কো-সংক্রমণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, বর্তমানে ডেন-১ ও ডেন-৪ সেরোটাইপের উপস্থিতি কম হলেও ভবিষ্যতে এগুলো পুনরায় বিস্তার লাভ করলে ‘সেকেন্ডারি সংক্রমণ’-এর ঝুঁকি বাড়বে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম নগরীতে মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত পদক্ষেপ, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, হাসপাতালের প্রস্তুতি জোরদার এবং নিয়মিত সেরোটাইপ পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রাখার জোর সুপারিশ করেছেন গবেষকেরা।
এমআর/বিআরইউ