বিজ্ঞাপন

শিশু হাসপাতালে হামের চিত্র

যমজ শিশুর একটির লাশ মায়ের কোলে, অপরটি আইসিইউতে

অ+
অ-
যমজ শিশুর একটির লাশ মায়ের কোলে, অপরটি আইসিইউতে

ছয় মাস বয়সী যমজ কন্যাশিশু রিসা ও রুহি। তাদের হাসি-কান্নায় ভরে উঠেছিল কনিকা বেগমের সংসার। সুখের সেই ঘরে আজ নেমে এসেছে দুঃখের নিদারুণ বেদনা আর শোক। হামে আক্রান্ত হয়ে আজ (মঙ্গলবার) সকাল সাড়ে ১০টায় মারা গেছে কনিকা বেগমের দুই জমজ কন্যার একজন রিসা। আরেকজন রুহিও হাম আক্রান্ত হয়ে লড়ছে মৃত্যুর সঙ্গে। 

বিজ্ঞাপন

আইসিইউ শয্যায় ছটফট করা সন্তানের দিকে তাকাবেন নাকি কোলে থাকা অপর সন্তানের প্রাণহীন দেহটাকে একটু আদর করবেন- কী করবেন কনিকা বেগম? নিয়তির নির্মমতায় বাকরুদ্ধ এই মা শোকে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন হাসপাতালের করিডোরে।

মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের আইসিইউর সামনে দেখা যায় এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্য। মা, বাবা, স্বজন কারও চোখে পানি নেই। শোকে বিমূঢ় মুখগুলো কেবল বলে দিচ্ছে- তাদের ভেতরের ভাঙচুরের গল্প। পরিবার-পরিজন সবাই তাকিয়ে আছে সদ্য আইসিইউতে নেওয়া শিশু রুহির দিকে।

শিশুদের মামা তানভীর হোসেন বলেন, ‘আমাদের ভাগনিদের বাঁচাতে সব চেষ্টাই আমরা করেছি। ওরা দুই বোন, জন্মের পর থেকেই বেশ হাসিখুশি থাকত। একজনকে তো আল্লাহ নিয়ে গেছেন, বাকিজনকে যেন ওর মায়ের কোলে ফিরিয়ে দেন আল্লাহ– সেই দোয়া চাই সবার কাছে।’

বিজ্ঞাপন

পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত বুধবার শিশু দুটিকে গাজীপুর থেকে হামের উপসর্গ নিয়ে ঢাকায় নিয়ে আসে পরিবার। ঢাকা মেডিকেল ও শিশু হাসপাতাল ঘুরে সিট না পাওয়ায় ভর্তি করা হয় ঢাকার পদ্মা জেনারেল হাসপাতালে। সেখানে এক রাত আইসিইউতে রাখার পর সিট পাওয়া সাপেক্ষে শিশু হাসপাতালে ভর্তি করানো হয় তাদের। সেখানে গত শনিবার অবস্থার অবনতি হলে শিশু রিসাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। তিনদিন পর আজ সকালে রিসার মৃত্যু হয়।

আইসিইউতে কর্মরত চিকিৎসক জানান, হামের পাশাপাশি নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যার কারণে মৃত্যু হয় রিসার। তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। আজ রিসার যমজ বোন রুহির অবস্থা একটু সিরিয়াস হওয়ায় তাকেও আমরা ইতোমধ্যে আইসিইউতে শিফট করেছি। আমাদের এখানে আইসিইউতে ১৪টি শিশু আছে। তাদের অধিকাংশের বয়স ১০ মাসের কম। এর মধ্যে ১৩ জনের অবস্থাই খুবই ক্রিটিক্যাল।’

হাসপাতালের আইসিইউর সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন হাম আক্রান্ত ১০ মাস বয়সী আরেক শিশু জোবায়দা রহমানের দাদা নুরুল হক। নাতনিকে নিয়ে গত ৭ দিন ধরে এ হাসপাতালে আছেন তিনি। প্রথমে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হলেও পরে হামের র‍্যাশ দেখা যায় জোবায়দার শরীরে। গতকাল জোবায়দাকে নেওয়া হয় আইসিইউতে। কিছুক্ষণ পরপর নাতনিকে একপলক দেখতে বারবার আইসিইউতে প্রবেশের চেষ্টা করেন নুরুল হক। বারবার চেষ্টার পরও আইসিইউতে ঢুকতে না পেরে সেদিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

ঢাকা পোস্টকে নুরুল হক বলেন, ‘আমার খুব আদরের নাতনি। ডাক্তাররা বলছেন এখন নাকি অসুস্থ বেশি। ও দীর্ঘদিন ধরে নিউমোনিয়ায় ভুগছে। ১৫ দিন আগেও এ হাসপাতালের নিউমোনিয়া ওয়ার্ডে ৪ দিন ভর্তি ছিলাম ওকে নিয়ে। খুব চিন্তা হচ্ছে।’

এদিকে মিরপুর-১০ থেকে হামের উপসর্গ নিয়ে তিন মাসের শিশু রিফাতকে নিয়ে দুপুর আড়াইটার দিকে শিশু হাসপাতালে আসেন মুন্নি বেগম। হাম ও নিউমোনিয়ার সাথে শ্বাসকষ্ট থাকায় ইমারজেন্সি আইসিইউর ব্যবস্থা করতে বলা হয় তাদের। কিন্তু এখানে আইসিইউ খালি না থাকায় অ্যাম্বুলেন্সে করে অন্য হাসপাতালে চলে যান তারা।

কোন হাসপাতালে যাবেন জিজ্ঞেস করলে মুন্নি বেগম বলেন, ‘তা এখনো ঠিক হয়নি। হয়তো বেসরকারি কোনো হাসপাতালে যেতে হবে। আগে তো আমার ছেলেকে বাঁচাতে হবে।’

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে ৬১ জন শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে বিশেষায়িত ওয়ার্ডে ভর্তি আছে। এর মধ্যে গতকাল দুপুর দেড়টায় আরও এক শিশু আইসিইউতে মারা যায়। এ নিয়ে এ হাসপাতালে আজ সকাল আটটা পর্যন্ত ৪ শিশু মারা গেছে।

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ঢাকা বিভাগে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েই চলেছে। এ বিভাগে গত ৫ এপ্রিল ৩৯২ শিশুর হাম উপসর্গ দেখা যায়। গতকাল তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৭০ জনে, আর আজ ৪৯৯ জন। মৃত্যুর হিসাবেও বেশ এগিয়ে ঢাকা বিভাগ। এখানে গত ১৫ মার্চ থেকে আজ পর্যন্ত ৬০টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

এমএল/বিআরইউ