বিজ্ঞাপন

হামের প্রকোপ

বাবা-মায়ের কোলে দুই শিশুর মৃত্যু, সরকার বলছে ‘কেউ মারা যায়নি’!

বাবা-মায়ের কোলে দুই শিশুর মৃত্যু, সরকার বলছে ‘কেউ মারা যায়নি’!

রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে গত ৭ এপ্রিল সকাল সাড়ে ১০টায় হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় ছয় মাস বয়সী শিশু রিসা। হাসপাতালের মিজেলস আইসিইউ ওয়ার্ডের ৭ নম্বর বেডে তার মৃত্যু হয়। একই দিনে ওই হাসপাতালে হামে আক্রান্ত আরও এক শিশুর প্রাণহানি ঘটে, যা হাসপাতালের নিয়মিত তথ্যের নথিতেও সংরক্ষিত আছে। তবে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মাঠপর্যায়ের এই মৃত্যুর তথ্য সরকারি নিয়মিত বুলেটিনে স্থান পায়নি।

রিসার মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে আইসিইউ ওয়ার্ডের চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেন, সে হামেই আক্রান্ত ছিল। হাসপাতালের নথিতে মৃত্যুর কারণ হিসেবে হাম থেকে রক্তে সংক্রমণ (সেপটিসেমিয়া), সেপটিক শক, ফুসফুসের অকার্যকারিতা (এআরডিএস) এবং রক্ত জমাট বাঁধার গুরুতর সমস্যা (ডিআইসি) উল্লেখ করা হয়েছে।

গত ৮ এপ্রিলের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ৭ এপ্রিল সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় শিশু হাসপাতালে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে— রিসা (৬ মাস) এবং আয়াত (সাড়ে ৩ মাস)। এদের মধ্যে আয়াতের হামের সঙ্গে নিউমোনিয়া থাকলেও রিসার শরীরে নিউমোনিয়া ছিল না। তা সত্ত্বেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রেকর্ডে রিসাকে ‘হাম সন্দেহে মৃত’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। অথচ স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন নিজেই গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, রিসার মৃত্যু হামজনিত কারণেই হয়েছে।

এদিকে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে প্রকাশিত গত ৮ এপ্রিলের নিয়মিত বুলেটিন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ওই ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে হামে কোনো শিশুর মৃত্যু হয়নি বলে জানানো হয়েছে। যদিও ওই দিন ‘হাম সন্দেহে’ সারাদেশে ১০ শিশুর মৃত্যুর তথ্য দেওয়া হয়।

রিসার মৃত্যুর বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে হামে আক্রান্ত রোগীদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া আইসিইউতে কর্তব্যরত এক চিকিৎসক বলেন, রিসার হামের সঙ্গে শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা বেড়ে গিয়েছিল। তার অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়ায় তাকে আর বাঁচানো যায়নি। তার মৃত্যুর অন্যতম একটি কারণ হলো হাম।

রিসার বাবা জাকির হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, ‘হামের কারণেই আমার মেয়ের মৃত্যু হয়েছে, ডাক্তাররাও তাই বলেছেন। এখন সরকারি হিসাবে যদি সেটি না থাকে, তবে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমার আরেক মেয়ে রুহিও হামে আক্রান্ত হয়ে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন।’

‘রিসা মারা যাওয়ার ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার রাতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এসেছিলেন’— বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

dhakapost
হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া সোহা মনি ও রিসা। অথচ তাদের মৃত্যুর তথ্য সরকারি নিয়মিত বুলেটিনে স্থান পায়নি / ছবি- সংগৃহীত

একই হাসপাতালে গত ১০ এপ্রিল ভোর ৬টায় মারা যায় মাদারীপুর থেকে আসা ১০ মাস বয়সী সোহা মনি। তার মৃত্যুর কারণ হিসেবেও হাসপাতালের নথিতে ‘মিজেলস’ বা হাম উল্লেখ করা হয়েছে। সোহা মনির চাচা রাশেদুল ইসলাম জানান, গত মাসের ২৬ তারিখ থেকে হামে আক্রান্ত সোহা মনিকে চারটি হাসপাতাল ঘুরে ৯ এপ্রিল শিশু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। অবস্থা গুরুতর হওয়ায় সেদিন রাতেই আইসিইউতে নেওয়া হয় তাকে। ভোর সাড়ে ৫টার দিকে আইসিইউর ডাক্তাররা ডেকে জানান, সোহার অবস্থা সংকটাপন্ন। হয়তো আর ৩০ মিনিট সময় দিতে পারে। এর ঠিক এক ঘণ্টা পরই সোহার মৃত্যুর খবর দেওয়া হয়।

হাসপাতালের নথি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সোহার মৃত্যুর কারণ ছিল মিজেলস (হাম)। অথচ ১০ এপ্রিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাঠানো বুলেটিনে বলা হয়, বিগত ২৪ ঘণ্টায় দেশে হামে কোনো শিশুর মৃত্যু ঘটেনি। অর্থাৎ ৯ এপ্রিল সকাল ৮টা থেকে ১০ এপ্রিল সকাল ৮টা পর্যন্ত তথ্যে সোহা মনির মৃত্যুর কোনো উল্লেখ ছিল না।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

এ প্রসঙ্গে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রতিদিন নতুন রোগী ভর্তি, চিকিৎসাধীন এবং মৃত্যুর যাবতীয় তথ্য নিয়মিতভাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে (এমআইএস) পাঠানো হয়। অধিদপ্তর যদি তা যুক্ত না করে, তবে সেখানে হাসপাতালের কিছু করার নেই।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমআইএস পরিচালক ডা. আবু আহম্মদ আল মামুন বলেন, প্রতিদিন শতাধিক হাসপাতালের তথ্য স্বল্প সময়ে সংগ্রহ করতে হয়। সিভিল সার্জনরা তাদের জেলার তথ্য পাঠান। এগুলো ম্যানুয়ালি তৈরি করা হয় না, গুগল ফর্মে যেভাবে তথ্য আপলোড করা হয়, তার ভিত্তিতেই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। স্বল্প সময়ে হওয়ায় সব তথ্য যাচাই করা সবসময় সম্ভব হয় না।

‘বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল আলাদাভাবে তথ্য পাঠায়। তারা যদি সেখানে তথ্য না দেয়, তাহলে আমাদের কিছুই করার থাকে না। এত অল্প সময়ে সব তথ্য ক্রসচেক করার সুযোগও থাকে না’— যোগ করেন তিনি।

এমএল/এমএআর/