দেশে হঠাৎ হামের প্রাদুর্ভাব ও শিশুদের নিউমোনিয়াজনিত তীব্র অক্সিজেন সংকট মোকাবিলায় আশার আলো দেখাচ্ছে বাংলাদেশি বিজ্ঞানীর উদ্ভাবিত সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ‘বাবল সিপ্যাপ’। আইসিডিডিআর,বি-র সহায়তায় ডা. জুবায়ের চিশতীর তৈরি এই যন্ত্রটি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে সক্ষম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বীকৃত এই উদ্ভাবনটি বর্তমানে দেশের হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ-র বিকল্প হিসেবে সফলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ডা. মোহাম্মদ জুবায়ের চিশতী প্রায় এক যুগ আগে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআর,বি-র সহায়তায় ‘বাবল কন্টিনিউয়াস পজিটিভ এয়ারওয়ে প্রেসার’ (বাবল সিপ্যাপ) নামক একটি যন্ত্র উদ্ভাবন করেন। শিশুদের তীব্র নিউমোনিয়া ও অক্সিজেনের ঘাটতি মোকাবিলায় এই যন্ত্রটি অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বীকৃতি দিয়েছে।
আরও পড়ুন
সম্প্রতি ঢাকা পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডা. জুবায়ের চিশতী জানান, তার এই উদ্ভাবিত প্রযুক্তিটি সিভিয়ার নিউমোনিয়া বা তীব্র অক্সিজেন স্বল্পতায় ভোগা শিশুদের চিকিৎসায় সফলভাবে কাজ করছে। বর্তমানে বাবল সিপ্যাপের ব্যবহার কেবল বাংলাদেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই; ২০২৪ সাল থেকে আফ্রিকার তিনটি দেশের ৪০টি হাসপাতালে এই জীবন রক্ষাকারী প্রযুক্তিটি ব্যবহৃত হচ্ছে। এর মধ্যে ইথিওপিয়ার ২৪টি, নাইজেরিয়ার ১৫টি এবং মালাউইয়ের ১টি হাসপাতালে বর্তমানে বাবল সিপ্যাপের মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হচ্ছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, এই বাবল সিপ্যাপ প্রযুক্তি ব্যবহার করে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি প্রায় ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। অর্থাৎ, প্রচলিত চিকিৎসার পাশাপাশি এই যন্ত্রটি যুক্ত হলে তা শিশুদের জীবন রক্ষায় অভাবনীয় সাফল্য নিয়ে আসে
বাংলাদেশি এই বিজ্ঞানী বলেন, বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে যেখানে পর্যাপ্ত আইসিইউ-র অভাব রয়েছে, সেখানে এই প্রযুক্তিটি শিশুদের জীবন রক্ষায় তাৎক্ষণিক ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম।

মোহাম্মদ জুবায়ের চিশতী বলেন, তীব্র নিউমোনিয়া ও হাইপোক্সিয়ায় (রক্তে অক্সিজেনের স্বল্পতা) আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুহার কমাতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অ্যান্টিবায়োটিক ও অন্যান্য সেবার পাশাপাশি স্বল্প প্রবাহের অক্সিজেন দেওয়ার সুপারিশ করেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ডা. চিশতীর উদ্ভাবিত এই বাবল সিপ্যাপ প্রযুক্তি ব্যবহার করে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি প্রায় ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। অর্থাৎ, প্রচলিত চিকিৎসার পাশাপাশি এই যন্ত্রটি যুক্ত হলে তা শিশুদের জীবন রক্ষায় অভাবনীয় সাফল্য নিয়ে আসে।
উদ্ভাবনের প্রেক্ষাপট
ডা. জুবায়ের চিশতীর এই যুগান্তকারী উদ্ভাবনের মূলে ছিল এক মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা। তিনি জানান, ১৯৯৭ সালে সিলেট মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস শেষ করে তিনি যখন ইন্টার্নশিপ শুরু করেন, প্রথম রাতেই তার চোখের সামনে তিন শিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। বইপুস্তকের সব ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ করার পরও শিশুদের এই অকাল মৃত্যু তাকে প্রচণ্ড অসহায়ত্ব ও অপরাধবোধে নিমজ্জিত করে। সেই রাতেই তিনি প্রতিজ্ঞা করেন, শিশুদের ফুসফুস নিয়ে উচ্চতর পড়াশোনা করবেন এবং নিউমোনিয়াজনিত শিশুমৃত্যু রোধে কার্যকর কিছু করবেন।
২০১১ সালের আগস্ট থেকে ২০১৩ সালের জুলাই পর্যন্ত আইসিডিডিআর,বি হাসপাতালে ভর্তি ২২৫ জন শিশুর ওপর একটি বিশেষ গবেষণা চালানো হয়। গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় বাবল সিপ্যাপ ব্যবহারে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুর ঝুঁকি ৭৫ শতাংশ কমে গেছে
নিজের লক্ষ্য পূরণে ২০০২ সালে তিনি আইসিডিডিআর,বি-তে যোগ দেন, যা তাকে শিশুদের নিয়ে নিবিড়ভাবে কাজ করার সুযোগ করে দেয়। পরবর্তীতে শিশুদের ফুসফুস বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নিতে তিনি অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে ‘রয়্যাল চিলড্রেন হাসপাতালে’ যান। সেখানে থাকা অবস্থায় তিনি ‘সিপ্যাপ’ নামে একটি যন্ত্রের কার্যকারিতা দেখতে পান। যন্ত্রটি মূলত রোগীর শ্বাসনালিতে বায়ুচাপ বাড়িয়ে ফুসফুসের সংকোচন রোধ করে, যা নিজে থেকে নিশ্বাস নিতে না পারা রোগীদের জন্য জীবন রক্ষাকারী। এরপর তিনি এটি নিয়ে ব্যাপক গবেষণায় লেগে যান।
মেলবোর্নের সেই যন্ত্রটি অত্যন্ত কার্যকর হলেও তা ছিল অনেক বেশি ব্যয়বহুল। মূলত স্বল্পোন্নত দেশগুলোর সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থেকে কীভাবে এমন একটি উন্নত সেবা নিশ্চিত করা যায়, সেই চিন্তা থেকেই তিনি বাবল সিপ্যাপ উদ্ভাবনের পথে এগিয়ে যান।

অস্ট্রেলিয়া থেকে দেশে ফিরে ডা. চিশতী আইসিডিডিআর,বি-তে গবেষণায় যুক্ত হন এবং অত্যন্ত কম খরচে একটি সাশ্রয়ী সিপ্যাপ যন্ত্র তৈরির কাজ শুরু করেন। সেই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে একদিন একটি ফেলে দেওয়া শ্যাম্পুর স্বচ্ছ বোতল, পানি এবং একটি প্লাস্টিকের নল ব্যবহার করে তিনি ‘বাবল সিপ্যাপ’-এর প্রাথমিক মডেলটি তৈরি করেন।
এই পদ্ধতিতে শিশু একটি ট্যাংক থেকে অক্সিজেন টেনে নেয় এবং প্লাস্টিকের নলের মাধ্যমে পানিপূর্ণ বোতলে সেই বাতাস ছাড়ে। এতে বোতলের পানিতে বুদবুদ তৈরি হয়, যা শিশুর ফুসফুসের বায়ুথলিগুলো খোলা রাখতে প্রয়োজনীয় চাপ তৈরি করে। ফলে শিশুটি সহজেই শ্বাস নিতে পারে এবং শরীরে অক্সিজেনের সরবরাহ স্বাভাবিক হয়
এই উদ্ভাবন নিয়ে ২০০৭ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত নিবিড় গবেষণা চলে। পরবর্তীতে এর কার্যকারিতা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণের জন্য ২০১১ সালের আগস্ট থেকে ২০১৩ সালের জুলাই পর্যন্ত আইসিডিডিআর,বি হাসপাতালে ভর্তি ২২৫ জন শিশুর ওপর একটি বিশেষ গবেষণা চালানো হয়। গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় বাবল সিপ্যাপ ব্যবহারে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুর ঝুঁকি ৭৫ শতাংশ কমে গেছে।
আরও পড়ুন

এই পদ্ধতিতে শিশু একটি ট্যাংক থেকে অক্সিজেন টেনে নেয় এবং প্লাস্টিকের নলের মাধ্যমে পানিপূর্ণ বোতলে সেই বাতাস ছাড়ে। এতে বোতলের পানিতে বুদবুদ তৈরি হয়, যা শিশুর ফুসফুসের বায়ুথলিগুলো খোলা রাখতে প্রয়োজনীয় চাপ তৈরি করে। ফলে শিশুটি সহজেই শ্বাস নিতে পারে এবং শরীরে অক্সিজেনের সরবরাহ স্বাভাবিক হয়।
খরচ ও সহজলভ্যতা
ব্যয়বহুল বিদেশি যন্ত্রের সাশ্রয়ী বিকল্প হিসেবে ডা. চিশতীর এই উদ্ভাবনটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। তিনি জানিয়েছেন, বিদেশে তৈরি সাধারণ অক্সিজেন সরবরাহ যন্ত্রগুলো আমদানিতে যেখানে ৫ হাজার থেকে ১৮ হাজার ডলার পর্যন্ত খরচ হয়, সেখানে বাবল সিপ্যাপ তৈরিতে ব্যয় হয় মাত্র দুই ডলার বা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা।
অত্যন্ত কম খরচে এবং সহজ উপায়ে হাজার হাজার বাবল সিপ্যাপ তৈরি করা সম্ভব। সাধারণ একটি প্লাস্টিকের বোতল, একটি নল ও কিছু সাধারণ সরঞ্জাম ব্যবহার করেই এই জীবন রক্ষাকারী প্রযুক্তিটি প্রস্তুত করা যায়। মূলত সহজলভ্যতা ও স্বল্প ব্যয়ের কারণে এই প্রযুক্তিটি তীব্র নিউমোনিয়া বা অক্সিজেন স্বল্পতায় ভোগা শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি কমাতে একটি বৈপ্লবিক সমাধান হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
বাবল সিপ্যাপ আগে কেন জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্ব পায়নি, সে বিষয়ে ডা. চিশতী জানান, তারা বিভিন্ন মাধ্যমে চেষ্টা করলেও সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেননি। যদিও দেশের প্রথিতযশা শিশু, নবজাতক ও ফুসফুস বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন সভা-সেমিনারে এই প্রযুক্তির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
২০২৩ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও বিভিন্ন হাসপাতালের পরিচালকদের উপস্থিতিতে একটি সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে কর্মকর্তারা এটি জাতীয়ভাবে গ্রহণের আশ্বাস দেন এবং জেলা পর্যায়ের (সেকেন্ডারি) হাসপাতালগুলোতে ব্যবহারের কথা জানান। এমনকি পরবর্তী অপারেশন প্ল্যানে (ওপি) এটি যুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা আর বাস্তবায়িত হয়নি।
গত মাস থেকে দেশে হামের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালগুলোতে তীব্র আইসিইউ সংকট দেখা দেয়। এই জরুরি পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী আইসিডিডিআর,বি-র নির্বাহী পরিচালক ডা. তাহমিদ আহমেদসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি বিশেষ বৈঠক করেন। সেখানে ‘বাবল সিপ্যাপ’র কার্যকারিতা সম্পর্কে ব্রিফ পাওয়ার পর মন্ত্রী দ্রুত এটি হাসপাতালগুলোতে সরবরাহের নির্দেশ দেন।
মন্ত্রীর এই নির্দেশের পরই দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে এর কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে দেশের অনেকগুলো হাসপাতালে বাবল সিপ্যাপের মাধ্যমে তীব্র নিউমোনিয়া ও হাইপোক্সিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হওয়ায় নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হলে তার ফলাফল অত্যন্ত মারাত্মক হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ৯ লক্ষ শিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়।
এমএল/এমএসএ
