বিজ্ঞাপন

হান্টা ভাইরাস কী, এটি কীভাবে ছড়ায়?

হান্টা ভাইরাস কী, এটি কীভাবে ছড়ায়?

প্রাণঘাতী হান্টা ভাইরাসের প্রকোপ ছড়িয়ে পড়া সেই প্রমোদতরী এই সপ্তাহের শেষ নাগাদ ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে নোঙর করতে যাচ্ছে। ‘এমভি হোন্ডিয়াস’ নামের এই জাহাজে ভ্রমণকারী পাঁচজন যাত্রীর শরীরে ইতিমধ্যে ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে এবং আরও আটজন এই তালিকায় যুক্ত হতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ভাইরাসে আক্রান্তদের মধ্যে একজন ডাচ নারী ইতিমধ্যে মারা গেছেন। এ ছাড়া গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় এক ব্রিটিশ নাগরিক দক্ষিণ আফ্রিকার একটি হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন রয়েছেন। অন্য এক সুইস যাত্রীকে সুইজারল্যান্ডের জুরিখের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

সন্দেহভাজন রোগীদের তালিকায় একজন ব্রিটিশ পুরুষ, একজন ডাচ ক্রু সদস্য এবং একজন জার্মান নাগরিক রয়েছেন। তাদের মধ্যে দুজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য নেদারল্যান্ডসে পাঠানো হয়েছে এবং তৃতীয় ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা বর্তমানে স্থিতিশীল বলে জানা গেছে।

এখন পর্যন্ত এই তিনজনের হান্টা ভাইরাস পরীক্ষার ফল পজিটিভ আসেনি, তবে দুজনের মধ্যে ভাইরাসের স্পষ্ট উপসর্গ দেখা গেছে। এ ছাড়া আরও দুই ব্রিটিশ যাত্রী ভাইরাসে আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসায় বর্তমানে নিজ বাড়িতে আইসোলেশনে (বিচ্ছিন্ন অবস্থায়) রয়েছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হান্টা ভাইরাস সাধারণত ইঁদুর বা এ জাতীয় প্রাণীর মলমূত্র থেকে ছড়ায়। প্রমোদতরিটিতে কীভাবে এই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ল, তা খতিয়ে দেখছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ক্যানারি দ্বীপে জাহাজটি ভিড়লে আক্রান্তদের দ্রুত হাসপাতালে স্থানান্তরের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

ব্রিটেনের স্বাস্থ্য সুরক্ষা সংস্থা জানিয়েছে, ওই যাত্রীরা ভ্রমণের শুরুতেই জাহাজটি ছেড়ে দিয়েছিলেন এবং তাদের শরীরে কোনো উপসর্গ দেখা যায়নি। জাহাজটি আর্জেন্টিনা থেকে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে কেপ ভার্দে যাচ্ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা ও জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের কর্মকর্তারা বিবিসিকে নিশ্চিত করেছেন যে, তারা এমন তিন যাত্রীর ওপর নজর রাখছেন যারা জাহাজটি কেপ ভার্দে পৌঁছানোর আগেই নেমে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে এসেছিলেন। তবে তাদের কারও মধ্যেই হান্টা ভাইরাসের কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি।

বর্তমানে ২৩টি দেশের মোট ১৪৬ জন যাত্রী ও ক্রু সদস্য ‘এমভি হোন্ডিয়াস’ জাহাজে অবস্থান করছেন, যা এখন ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। সেখানে পৌঁছানোর পর নিজ দেশে ফেরার আগে তাদের প্রত্যেকের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হবে।

হান্টা ভাইরাসের ‘এন্ডিজ স্ট্রেইন’ কী?
দক্ষিণ কোরিয়ার একটি নদীর নামানুসারে হান্টা ভাইরাসের নামকরণ করা হয়েছে। এটি নির্দিষ্ট কোনো একক রোগ নয়, বরং ভাইরাসের একটি পুরো পরিবারকে বোঝায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্যমতে, এই ভাইরাসের ২০টিরও বেশি ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতি রয়েছে। এগুলোর প্রায় সবকটিই ‘রোডেন্ট’ বা ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর মাধ্যমে সংক্রমিত হয়। সাধারণত ইঁদুর বা কাঠবিড়ালির শুকিয়ে যাওয়া মলমূত্র থেকে এই সংক্রমণ ছড়ায়।

এই ভাইরাসের একটি বিশেষ ধরন ‘এন্ডিজ ভাইরাস’ নামে পরিচিত। ধারণা করা হয়, এটি মানুষের শরীর থেকে মানুষের শরীরে ছড়াতে পারে, যদিও এমন ঘটনা খুব কমই দেখা যায়।

দক্ষিণ আফ্রিকার স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এমভি হোন্ডিয়াস জাহাজের দুই যাত্রীর শরীরে এই ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাদের মধ্যে একজন ব্রিটিশ নাগরিক জোহানেসবার্গের একটি হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন এবং অন্যজন এক ডাচ নারী, যিনি ইতিমধ্যে মারা গেছেন।

এন্ডিজ ভাইরাস মূলত আর্জেন্টিনা এবং চিলিতে পাওয়া যায়। এর আগে ২০১৮ সালের শেষের দিকে আর্জেন্টিনায় এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল। সে সময় একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মাধ্যমে এই ভাইরাসের বিস্তার ঘটেছিল বলে শনাক্ত করা হয়।

তদন্তে দেখা যায়, ভাইরাসে আক্রান্ত মাত্র একজন ব্যক্তি অজান্তেই আরও ৩৪ জনের মধ্যে এটি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, যাদের মধ্যে ১১ জন মৃত্যুবরণ করেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বর্তমানে এই ধারণা নিয়ে কাজ করছে যে, আক্রান্ত কোনো ব্যক্তির নিবিড় সংস্পর্শে এলে অথবা ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর মাধ্যমে এই ভাইরাস জাহাজে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

যেহেতু এন্ডিজ ভাইরাসের উপস্থিতির বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে, তাই জাহাজে থাকা যাত্রী ও ক্রু সদস্যদের জন্য এখন সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা আরও জরুরি হয়ে পড়েছে—ঠিক যেমনটি আমরা কোভিড মহামারির সময় দেখেছিলাম। সংক্রমণ ঝুঁকি কমাতে বর্তমানে যাত্রীদের নিজ নিজ কেবিনে বন্দি রাখা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আক্রান্ত রোগীদের আলাদা রাখা, নিয়মিত হাত ধোয়া, সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্ত করে তাদের ওপর নজর রাখা এবং কঠোর সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করাই এখন এই ভাইরাসের বিস্তার ঠেকানোর প্রধান উপায়।

তবে এই সংক্রমণ ঠিক কীভাবে শুরু হলো, তা এখনো স্পষ্ট নয়। আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া এক ডাচ দম্পতি গত এপ্রিলের শুরুতে জাহাজে ওঠার আগে দক্ষিণ আমেরিকা ভ্রমণ করেছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে, সেই ভ্রমণের সময় তাদের একজন বা উভয়ই ভাইরাসের সংস্পর্শে এসে থাকতে পারেন।

যেহেতু এই প্রমোদতরী বা ক্রুজটি দুর্গম বনাঞ্চলীয় এলাকায় যাতায়াত করছিল, তাই ভ্রমণের সময় অন্য কোনো যাত্রীও ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ভাইরাসের জিনগত পরীক্ষা সম্পন্ন হলে হয়তো জানা যাবে এটি ঠিক কীভাবে প্রথম জাহাজে প্রবেশ করেছিল।

বিশেষজ্ঞরা আশ্বস্ত করে বলেছেন, সাধারণ মানুষের জন্য এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অত্যন্ত কম। এখন পর্যন্ত জাহাজের বাইরে এই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। 

কীভাবে ছড়ায় হান্টা ভাইরাস?
সাধারণত ইঁদুর বা কাঠবিড়ালির মতো প্রাণীর মল, মূত্র ও লালার সরাসরি সংস্পর্শে এলে এই ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এই সংক্রমণ ঘটে বাতাসের মাধ্যমে। ইঁদুরের মলমূত্রে থাকা ভাইরাস যখন কোনোভাবে বাতাসের সঙ্গে মিশে যায় এবং মানুষ নিশ্বাসের মাধ্যমে তা গ্রহণ করে, তখনই আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এ ছাড়া আক্রান্ত প্রাণীর কামড়েও এই ভাইরাস ছড়াতে পারে।

হান্টা ভাইরাসের অনেকগুলো ধরন বা স্ট্রেইন থাকলেও কেবল ‘এন্ডিজ’ নামের স্ট্রেইনটি একজনের শরীর থেকে অন্যজনের শরীরে ছড়াতে পারে বলে এখন পর্যন্ত জানা গেছে; যদিও এমন নজির খুবই কম। মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণের ক্ষেত্রে সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে অত্যন্ত কাছাকাছি থাকা বা ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শকে দায়ী করা হয়।

হান্টা ভাইরাস ছড়ানোর ধরন সাধারণ ফ্লুর চেয়ে একেবারেই আলাদা। ফ্লু বা সর্দি-জ্বর সাধারণত হাঁচি-কাশির সময় নির্গত ক্ষুদ্র জলকণার (ড্রপলেট) মাধ্যমে ছড়িয়ে থাকে। এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) কর্মকর্তা ডক্টর মারিয়া ভ্যান কেরখোভ বিবিসিকে বলেন, “আমরা এখানে একজনের থেকে অন্যজনের যথেষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে করা সাধারণ মেলামেশার কথা বলছি না (বরং অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শের কথা বলছি)।”

এই ভাইরাসটি মূলত দুটি মারাত্মক রোগের কারণ হতে পারে। প্রথমটি হলো হান্টা ভাইরাস পালমোনারি সিনড্রোম। এই রোগের শুরুতে সাধারণত ক্লান্তি, জ্বর এবং মাংসপেশিতে ব্যথা অনুভূত হয়। পরবর্তীতে মাথাব্যথা, মাথা ঘোরানো, শরীরে কাঁপুনি এবং পেটের সমস্যা দেখা দেয়।

তবে এর সবচেয়ে জটিল দিক হলো শ্বাসকষ্ট। আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাস নিতে প্রচণ্ড কষ্ট হতে পারে এবং এমন পরিস্থিতিতে রোগীকে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি। ‘এন্ডিজ স্ট্রেইন’-এর কারণে হওয়া প্রধান রোগগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম, যার মৃত্যুহার ২০ থেকে ৪০ শতাংশ।

এই রোগের আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো এর ইনকিউবেশন পিরিয়ড বা জীবাণু শরীরে প্রবেশের পর রোগলক্ষণ প্রকাশের সময়কাল। সাধারণত সংক্রমণ হওয়ার এক থেকে আট সপ্তাহ পর এই রোগের লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে পারে।

দ্বিতীয় রোগটি হলো হেমোরেজিক ফিভার উইথ রেনাল সিনড্রোম। শুরুতে সাধারণ ফ্লু বা জ্বরের মতো মনে হলেও এটি ধীরে ধীরে কিডনিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। এর ফলে রক্তচাপ কমে যাওয়া (লো ব্লাড প্রেসার), শরীরের ভেতরে রক্তক্ষরণ এবং কিডনি পুরোপুরি অকেজো হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

হান্টা ভাইরাসের সুনির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই, তবে প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা শুরু করলে রোগীর সুস্থ হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে। আক্রান্ত রোগীদের জন্য অক্সিজেন থেরাপি, মেকানিক্যাল ভেন্টিলেশন এমনকি প্রয়োজনভেদে ডায়ালাইসিসেরও পরামর্শ দেওয়া হয়।

যেসব রোগীর শরীরে তীব্র উপসর্গ দেখা দেয় এবং তারা মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন, তাদের দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) রেখে চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। বর্তমানে এই ভাইরাসের চিকিৎসার নতুন কিছু পদ্ধতি নিয়ে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা পরীক্ষা-নিরীক্ষাও চলছে।

প্রতিরোধের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত এই ভাইরাসের কোনো টিকা বা ভ্যাকসিন বড় পরিসরে সহজলভ্য নয়। তবে চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ায় ভাইরাসের স্থানীয় কিছু স্ট্রেইনের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কিছু ভ্যাকসিনের ব্যবহার দেখা যায়। 

বিশ্বজুড়ে হান্টা ভাইরাসের প্রকোপ কতটা?
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার মানুষ এইচএফআরএস বা হেমোরেজিক ফিভার উইথ রেনাল সিনড্রোমে আক্রান্ত হন। আক্রান্তদের বড় একটি অংশই ইউরোপ ও এশিয়া মহাদেশের বাসিন্দা। পরিসংখ্যান বলছে, মোট শনাক্ত হওয়া রোগীদের অর্ধেকেরও বেশি সাধারণত চীনে পাওয়া যায়। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, ১৯৯৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশটিতে হান্টা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ৮৯০টি ঘটনা সামনে এসেছে।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে অস্কারজয়ী অভিনেতা জিন হ্যাকম্যানের স্ত্রী বেটসি আরাকাওয়া হান্টা ভাইরাসজনিত শ্বাসকষ্টের সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। চিকিৎসকদের ধারণা, আরাকাওয়া এইচপিএস বা হান্টা ভাইরাস পালমোনারি সিনড্রোমে আক্রান্ত হয়েছিলেন, যা যুক্তরাষ্ট্রে পাওয়া ভাইরাসের সবচেয়ে সাধারণ ধরন। তার মৃত্যুর পর তদন্তকারীরা ওই বাড়ির বাইরের ঘরে পাখির বাসা এবং বেশ কিছু মরা ইঁদুরের সন্ধান পেয়েছিলেন। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, ইঁদুরের সংস্পর্শ থেকেই তিনি এই প্রাণঘাতী ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছিলেন। 

এনএফ