বিজ্ঞাপন

সেমিনারে বক্তারা

দেরিতে থাইরয়েড ধরা পড়ায় বাড়ছে জটিলতা

দেরিতে থাইরয়েড ধরা পড়ায় বাড়ছে জটিলতা

ক্লান্তি, অবসাদ, অস্বাভাবিক ওজন বৃদ্ধি, ঠান্ডা সহ্য করতে না পারা কিংবা মনোযোগ কমে যাওয়া এসব উপসর্গকে অনেকেই দৈনন্দিন শারীরিক দুর্বলতা বা সাধারণ সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যান। কিন্তু চিকিৎসকেরা বলছেন, এসবই হতে পারে থাইরয়েড রোগের নীরব সংকেত। সময়মতো শনাক্ত না হওয়ায় দেশে বাড়ছে থাইরয়েডজনিত জটিলতা, অথচ আক্রান্তের বড় অংশ এখনো চিকিৎসার বাইরে রয়ে গেছে।

মঙ্গলবার (১৯ মে) বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিনমাস কনফারেন্স রুমে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞরা এসব তথ্য তুলে ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

বিশ্ব থাইরয়েড দিবস উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ থাইরয়েড সোসাইটি ও বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরাম যৌথভাবে এ আয়োজন করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের থাইরয়েড সমস্যায় ভুগছেন। সেই হিসেবে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৩ থেকে ৪ কোটির মধ্যে। কিন্তু রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসার জন্য এখনো নেই কার্যকর জাতীয় কর্মসূচি, নেই নির্ভরযোগ্য জাতীয় ডাটাবেজও। ফলে বিপুলসংখ্যক রোগী নীরবে জটিলতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।

গোলটেবিল বৈঠকে জানানো হয়, দেশে থাইরয়েডে আক্রান্তদের অন্তত ৬০ শতাংশ চিকিৎসার আওতার বাইরে। অনেকেই বছরের পর বছর উপসর্গ নিয়ে চললেও পরীক্ষা করান না। আবার প্রান্তিক অঞ্চলের বহু মানুষ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছেও পৌঁছাতে পারছেন না। থাইরয়েডের উপসর্গগুলো সাধারণ অসুস্থতার মতো মনে হওয়ায় রোগীরা প্রথমদিকে গুরুত্ব দেন না। ফলে রোগ ধরা পড়ে অনেক দেরিতে।

থাইরয়েড সোসাইটির সভাপতি ও নিনমাসের পরিচালক অধ্যাপক ডা. এ কে এম ফজলুল বারী বলেন, থাইরয়েড গ্রন্থি শরীরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ। এটি শরীরের বিপাকক্রিয়া, হৃদস্পন্দন, রক্তচাপ, ওজন এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। কিন্তু এ গ্রন্থিতে সমস্যা দেখা দিলে পুরো শরীরের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, রোগীরা উপসর্গগুলোকে গুরুত্ব দেন না। ক্লান্তি, অবসাদ বা ওজন বৃদ্ধি অনেকেই সাধারণ বিষয় মনে করেন। ফলে রোগ ধরা পড়ে দেরিতে, তখন জটিলতাও বেড়ে যায়।

অধ্যাপক ডা. বারী বলেন, দেশে থাইরয়েড শনাক্ত ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে বড় ধরনের নীতিগত ঘাটতি রয়েছে। তার ভাষায়, বাংলাদেশে সরকারি অর্থায়নে থাইরয়েডের জন্য আলাদা বরাদ্দ প্রায় নেই বললেই চলে। অথচ এটি এখন বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। কত মানুষ আক্রান্ত, কোন অঞ্চলে বেশি, কী ধরনের রোগ বাড়ছে এসব জানার জন্য নিজস্ব গবেষণা ও জাতীয় কর্মসূচি প্রয়োজন। 

তিনি আরও বলেন, এখন আমরা বিদেশি তথ্য বা ছোট ছোট গবেষণার ওপর নির্ভর করে বাংলাদেশের হিসাব করছি। এতে প্রকৃত চিত্র আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জন্মের পরপরই শিশুর থাইরয়েড পরীক্ষা। এটি বাধ্যতামূলক করা উচিত। এছাড়া বয়ঃসন্ধিকালে, গর্ভধারণের আগে এবং ৫০ বছর বয়সের পর নিয়মিত স্ক্রিনিং দরকার। দেশে প্রতি ২৩০০ শিশুর মধ্যে একজন জন্মগত থাইরয়েড সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছে। সময়মতো শনাক্ত না হলে এসব শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

থাইরয়েড সোসাইটির সহসভাপতি ডা. শাহজাদা সেলিম বলেন, দেশে থাইরয়েড রোগীর প্রকৃত সংখ্যা হয়তো ধারণার চেয়েও বেশি। তিনি বলেন, আমরা বলছি প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ আক্রান্ত। সে হিসেবে ৩ থেকে ৪ কোটি মানুষ থাইরয়েড সমস্যায় ভুগছেন। কিন্তু আমাদের নিজস্ব বড় গবেষণা না থাকায় নির্ভুল সংখ্যা বলা যাচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, বিএমইউ হাসপাতালে যেসব মা চিকিৎসা নিতে আসেন, তাদের অন্তত ৮ শতাংশ হাইপোথাইরয়েড রোগী। এই সমস্যার কারণে শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ ও বুদ্ধিমত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কিন্তু এখনো এ বিষয়ে পর্যাপ্ত সচেতনতা নেই। ডায়াবেটিস নিয়ে মানুষ সচেতন, কিন্তু থাইরয়েড নিয়ে সেই গুরুত্ব নেই। অথচ রোগীর সংখ্যা প্রায় কাছাকাছি।

বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সেক্রেটারি মুজাহিদ শুভ বলেন, থাইরয়েড বিষয়ে এখনো জনসচেতনতা খুব সীমিত। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য সাংবাদিকরা কিছুটা জানলেও প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষ এখনো থাইরয়েড সম্পর্কে সচেতন নন। অনেকেই জানেন না কখন পরীক্ষা করাতে হবে, কোথায় চিকিৎসা পাওয়া যায়।

বৈঠকে অংশ নেওয়া চিকিৎসকদের মতে, থাইরয়েড এখন দেশের বড় কিন্তু অবহেলিত জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হচ্ছে। তাদের মতে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে স্ক্রিনিং কর্মসূচি, জাতীয় গবেষণা, নবজাতক পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা এবং প্রান্তিক পর্যায়ে চিকিৎসা সহজলভ্য করা না গেলে আগামী বছরগুলোতে জটিলতা আরও বাড়বে। থাইরয়েড আর নীরব রোগ নয়। এখন এটিকে জাতীয় স্বাস্থ্য অগ্রাধিকারের অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেন, থাইরয়েড মানবদেহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ, যা শরীরের নানা মৌলিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই থাইরয়েডজনিত রোগ দ্রুত শনাক্ত ও সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

তিনি বলেন, নিউক্লিয়ার মেডিসিন ও অ্যালায়েড সায়েন্সেস বর্তমানে থাইরয়েড রোগ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পরীক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থার মাধ্যমে এখন অনেক জটিল থাইরয়েড রোগও তুলনামূলক দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।

এমএল/বিআরইউ