হামে আক্রান্ত ১৬ বছর বয়সী সাকিবকে নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ঘুরেছেন মা লুবনা বেগম। অবশেষে তিনটি হাসপাতাল ঘুরে ১৭ দিনের মাথায় ছেলেকে সুস্থ করে বাড়ির পথে রওনা হয়েছেন তিনি। চোখেমুখে আনন্দ এবং উদ্বেগ, দুটো ছাপই দেখা গেছে।
তিনি বলেন, ছেলেটা যে কিছুটা সুস্থ হয়েছে, সেটাই আমার কাছে বড় ঈদ।
রোববার (২৪ মে) দুপুরে রাজধানীর ডিএনসিসি কোভিড হাসপাতালের সামনে ঢাকা পোস্টের সঙ্গে কথা হয় লুবনা বেগমের।
তিনি জানান, গত ১৭ দিন আমার জীবনের ওপর দিয়ে কী গেছে, সেটা একমাত্র আমিই ভালো জানি। ছেলেটার প্রথমে ডায়রিয়া হয়েছিল। পরে মিটফোর্ড (স্যার সলিমুল্লাহ) হাসপাতালে সাকিবকে ভর্তি করাই। সেখানে ভর্তির ৬ দিনের মাথায় শরীরে হামের র্যাশ ওঠে। পরে আমাদের সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেলে পাঠিয়ে দেয় কিন্তু ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি রাখেনি। তখন ওর কোনো সেন্স ছিল না, বারবার অজ্ঞান হয়ে যেত। এরপর আমরা চলে আসি এই (ডিএনসিসি কোভিড) হাসপাতালে। গত ১১ দিন ধরে ভর্তি থাকার পর আজ হাসপাতাল থেকে আমাদের ছুটি দেয়। এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়নি; শরীরে কোনো শক্তি পাচ্ছে না, চোখও এখনো লাল হয়ে আছে। সামনে যেহেতু ঈদ, তাই বাড়ি নিয়ে যাচ্ছি। আবার কোনো সমস্যা হবে কিনা, সেই ভয়ও করছে।

ছেলেকে ৯ মাস ও ১৫ মাসে হামের টিকা দেওয়া হয়েছিল কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, না, ওকে কোনো টিকা দেইনি। শুনেছি এ টিকা দিলে নাকি সমস্যা হয়। এখন ডাক্তাররা বলছেন, টিকা না দেওয়ার ফলেই এমন পরিস্থিতি হয়েছে। আমার মতো আর কোনো মা যেন এ কাজ না করেন।

চাঁদপুর থেকে ৭ মাস বয়সী ছেলে রাফসানকে নিয়ে গত ৮ দিন আগে ডিএনসিসি কোভিড হাসপাতালে হাম ও নিউমোনিয়া নিয়ে ভর্তি হন মা সোনিয়া আক্তার। সুস্থ হওয়ায় আজ রাফসানকে ছাড়পত্র দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
১৫ এপ্রিল থেকে এখন পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে ৫ হাজার ৯৫২ জন ভর্তি হয়ে সেবা নিয়েছেন। এ সময়ে মৃত্যু হয়েছে ৩৪ জনের
সোনিয়া আক্তার বলেন, এই হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আগে আমার ছেলে চাঁদপুর সদর হাসপাতালে ৫ দিন ভর্তি ছিল। কিন্তু শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা বেড়ে যাওয়ায় তারা ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়। প্রথমে শিশু হাসপাতালে গিয়েছিলাম, সেখানে সিট খালি না থাকায় এখানে এসেছি। ও এখন পুরোপুরি সুস্থ।
এদিকে ৮ মাস বয়সী রাফিয়াকে নিয়ে এখনো দুশ্চিন্তায় রয়েছেন মা জেসমিন বেগম। ঈদে বাড়ি যেতে পারবেন কি না, এখনো জানেন না। গত ৪ দিন ধরে এই হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে রাফিয়া। জ্বর ও র্যাশ কিছুটা কমলেও এখনো শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা আছে। মেয়েকে নেবুলাইজার দেওয়া অবস্থায় জেসমিন বেগম বলেন, ঈদ জীবনে অনেক করতে পারবো। এই মুহূর্তে আমার মেয়ের সুস্থ হওয়াটাই জরুরি। আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যে যদি সুস্থ হয়, তাহলে বাড়ি যেতে পারবো। অন্যথায় হাসপাতালেই থাকতে হবে।
হাসপাতালটিতে দায়িত্বে থাকা চিকিৎসকরা জানান, ঈদের আগে অনেক রোগী মোটামুটি সুস্থ হয়েছে। আরও দুই-এক দিন রেখে পুরোপুরি সুস্থ করে ছাড়পত্র দিতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু অভিভাবকরাও বাড়িতে যাওয়ার জন্য একটু তাড়াহুড়ো করছেন। তাই যেসব রোগী কিছুটা সুস্থতার দিকে, তাদের অনেককেই ছুটি দেওয়া হচ্ছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে হাসপাতালে ৪৮৪ জন রোগী ভর্তি আছেন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন ভর্তি হয়েছেন ১২৩ জন, হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়েছেন ১৪১ জন এবং ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত ১৫ এপ্রিল থেকে এখন পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে ৫ হাজার ৯৫২ জন ভর্তি হয়ে সেবা নিয়েছেন। এ সময়ে মৃত্যু হয়েছে ৩৪ জনের।
এমএল/এমএসএ
