বিজ্ঞাপন

বিশ্ব রক্তদাতা দিবস

তোমার রক্তে বাঁচুক পৃথিবী, আঁকুক নতুন স্বপ্ন

তোমার রক্তে বাঁচুক পৃথিবী, আঁকুক নতুন স্বপ্ন

আজ ১৪ জুন বিশ্ব রক্তদাতা দিবস। প্রতিবছরের মতো এবারও বিশ্বজুড়ে দিনটি পালিত হচ্ছে এক বুক গভীর কৃতজ্ঞতা নিয়ে– সেইসব নাম না জানা মানুষদের জন্য, যারা নিজেদের শরীরের এক ব্যাগ তপ্ত লাল রক্ত অন্য একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষের জীবন বাঁচাতে নিঃস্বার্থভাবে বিলিয়ে দেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অভূতপূর্ব অগ্রগতির এই স্বর্ণযুগে দাঁড়িয়েও মানুষ কৃত্রিম উপায়ে বহু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বা টিস্যু তৈরি করতে পারলেও, রক্তের কোনো বিকল্প আজ পর্যন্ত ল্যাবরেটরিতে তৈরি করা সম্ভব হয়নি। রক্ত কেবল মানুষের শরীরেই তৈরি হয়; তাই মুমূর্ষু মানুষের জীবনপ্রদীপ সচল রাখতে মানুষের ভালোবাসাই একমাত্র ভরসা। এই ধ্রুব সত্যকে ধারণ করেই বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতা প্রতিদিন গড়ে তুলছেন এক অবিচল মানবিক প্রাচীর।

প্রেক্ষাপট ও বৈশ্বিক গুরুত্ব

অস্ট্রিয়ান জীববিজ্ঞানী ও নোবেলজয়ী চিকিৎসক কার্ল ল্যান্ডস্টেইনার, যিনি মানবদেহের রক্তের প্রধান গ্রুপগুলো (‘এ, বি, ও’) আবিষ্কার করে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক বৈপ্লবিক দিগন্তের উন্মোচন করেছিলেন, তার জন্মদিনকে স্মরণীয় করে রাখতেই প্রতিবছর ১৪ জুন বিশ্বজুড়ে এই দিবসটি পালন করা হয়। রক্তদানের এই মহৎ আন্দোলনকে টেকসই করতে এবং নতুন প্রজন্মকে এই জীবনরক্ষাকারী কাজে উদ্বুদ্ধ করতে এই দিনটির গুরুত্ব অপরিসীম।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশনা অনুযায়ী, একটি দেশের মোট জনসংখ্যার অন্তত ১ শতাংশ মানুষ যদি নিয়মিত ও স্বেচ্ছায় রক্তদান করেন, তবে সেই দেশের রক্তের মৌলিক ও জরুরি চাহিদা মেটানো সম্ভব [১]। কিন্তু উন্নত বিশ্বের তুলনায় উন্নয়নশীল দেশগুলোতে স্বেচ্ছায় রক্তদানের হার এখনো অনেক কম, যার কারণে প্রতিদিন বহু মানুষকে রক্তের অভাবে জীবনসংকটে পড়তে হয়।

রক্তের অভাবজনিত মৃত্যুর ভয়াবহ চিত্র

রক্তের তীব্র অভাব বা সময়মতো নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন (ব্লাড ট্রান্সফিউশন) না করতে পারা বিশ্বব্যাপী এবং বাংলাদেশে অসংখ্য মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। চিকিৎসাবিজ্ঞানের আন্তর্জাতিক জার্নাল ও জাতীয় জরিপের নির্ভরযোগ্য উপাত্তগুলো এর সত্যতা প্রমাণ করে:

১. বৈশ্বিক প্রসবোত্তর রক্তক্ষরণ ও মাতৃমৃত্যু: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী মাতৃমৃত্যুর একক বৃহত্তম কারণ হলো প্রসবোত্তর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ (পোস্টপার্টাম হেমোরেজ)। প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ১৪ মিলিয়ন (১ কোটি ৪০ লাখ) নারী প্রসবোত্তর রক্তক্ষরণের সম্মুখীন হন, যার ফলে বছরে প্রায় ৭০,০০০ নারী মারা যান। এর একটি বড় অংশের কারণ হলো যথাসময়ে রক্তের জোগান না পাওয়া [৫]। তবে গ্লোবাল হেলথ রিপোর্টস অনুযায়ী, এই মৃত্যুর প্রায় ৯৫ শতাংশ মৃত্যুই প্রতিরোধ করা সম্ভব যদি সময়মতো রক্তের উপাদান ও সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা যায় [৮]।

২. রক্তের বৈশ্বিক ঘাটতি : চিকিৎসাবিজ্ঞানের আন্তর্জাতিক জার্নাল (পিএমসি ব্লাড সাপ্লাই রিপোর্ট) অনুসারে, বিশ্বজুড়ে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে (এলএমআইসিএস) প্রতি বছর ১০০ মিলিয়নেরও (১০ কোটি) বেশি ইউনিট রক্তের ঘাটতি রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া, সাব-সাহারা আফ্রিকা এবং ওশেনিয়ার প্রায় ১০০% দেশই এই স্থায়ী রক্ত সংকটের মুখোমুখি, যা সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রসবকালীন মৃত্যুর হারকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে [৭]।

৩. বাংলাদেশে রক্তের অভাব ও মাতৃমৃত্যুর করুণ পরিসংখ্যান: বাংলাদেশে প্রতি বছর আনুমানিক ৮ থেকে ১০ লক্ষ ব্যাগ রক্তের চাহিদা থাকে [৯]। এই চাহিদার একটি বড় অংশ ঘাটতি থাকায় থ্যালাসেমিয়া রোগী, ক্যানসার আক্রান্ত এবং জরুরি অস্ত্রোপচারের রোগীদের পাশাপাশি প্রসবকালীন মায়েরা চরম ঝুঁকিতে পড়েন। বাংলাদেশ ম্যাটারনাল মর্টালিটি অ্যান্ড হেলথ কেয়ার সার্ভে (বিএমএমএস) এবং চিকিৎসাবিষয়ক আন্তর্জাতিক জার্নাল (জেওজিএইচ)-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট মাতৃমৃত্যুর প্রায় ৩১ শতাংশ বা এক-তৃতীয়াংশ ঘটে থাকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে [৬]।

৪. সময়মতো রক্ত না পাওয়ার ট্র্যাজেডি: বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রসবকালীন ও প্রসবোত্তর জটিল রক্তক্ষরণের কারণে আনুমানিক ২ হাজার ৩৯ জন মা মৃত্যুবরণ করেন। এই মৃত মায়েদের মধ্যে একটি বিশাল অংশ (প্রায় ৪৬২ জন) হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই বা পথিমধ্যে রক্তের অভাবে মারা যান এবং ১ হাজার ১৫৪ জন হাসপাতালে থাকা সত্ত্বেও তাৎক্ষণিক রক্তের জোগান না মেলায় প্রাণ হারান [৬]। জাতীয় মাতৃমৃত্যু রিভিউ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রক্তক্ষরণ শুরু হওয়ার পর প্রথম ২৪ ঘণ্টাই হলো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। মূলত রক্তদাতার অভাব বা রক্তের গ্রুপ মিলতে দেরি হওয়ার কারণে হওয়া বিলম্বই এই ৭৮ শতাংশ মাতৃমৃত্যুর জন্য দায়ী।

হাসপাতালের অলিন্দে রক্তের হাহাকার : বাস্তব জীবনের গল্প

নিরাপদ রক্তের অভাব বা সময়মতো রক্ত না পাওয়ার কষ্ট কতটা ভয়ানক ও নির্মম হতে পারে, তা হাসপাতালের সাদা বিছানায় শুয়ে থাকা রোগীদের ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকালে অনুধাবন করা যায়। রক্তদান আন্দোলনের আসল সার্থকতা লুকিয়ে আছে এই মানুষগুলোর বেঁচে থাকার আকুল আকুতিতে।

যেমন, থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত ৮ বছরের ছোট্ট শিশু মারজিয়ার শরীরে প্রাকৃতিকভাবে পর্যাপ্ত লোহিত রক্তকণিকা তৈরি হয় না। প্রতি ২৫-৩০ দিন পর পর তার শরীরে নতুন রক্ত দিতে হয়। মারজিয়ার মায়ের ভাষায়, মাস শেষ হয়ে আসলেই তাদের বুক কাঁপতে থাকে, সময়মতো বি পজিটিভ রক্ত জোগাড় করতে না পারলে মনে হয় চোখের সামনে মেয়েটা শেষ হয়ে যাচ্ছে।

একইভাবে, কিডনি বিকল হয়ে যাওয়া যাওয়া রোগী আব্দুর রহমান সাহেবকে সপ্তাহে দুই দিন ডায়ালাইসিসের যন্ত্রণাদায়ক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, যার কারণে তার শরীরে তীব্র রক্তশূন্যতা দেখা দেয়। তার ছেলে জানান, ডায়ালাইসিসের খরচ চালাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন, তার ওপর হঠাৎ রক্তের প্রয়োজন হলে তরুণ স্বেচ্ছাসেবীরা যখন রক্ত নিয়ে হাজির হোন, তখন মনে হয় পৃথিবীতে এখনো ভালোবাসা বেঁচে আছে।

আর থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তামিমকেও প্রতি মাসে রক্ত দিতে হয়। অন্যের রক্তের সহায়তাতেই বেঁচে থাকতে হয় তাকে। ব্লাড ক্যান্সার, অ্যানিমিয়া, সিজার, অপারেশন, অ্যাক্সিডেন্টসহ বাংলাদেশে এমন হাজারো মানুষ শুধু অন্যের দেওয়া রক্তের ওপর ভরসা করে নতুন দিনের সূর্য দেখার স্বপ্ন দেখে।

রক্তদান সংগঠনসমূহ : মানবিকতার মূল চালিকাশক্তি

বাংলাদেশে নিরাপদ রক্ত আন্দোলনের ইতিহাস অত্যন্ত গৌরবময় এবং এর পেছনে রয়েছে কিছু প্রথম সারির সুপরিচিত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, যা রক্তদানের সংস্কৃতিকে এ দেশের মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছে। ১৯৭৭ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের হাত ধরে যাত্রা শুরু করা 'সন্ধানী' এ দেশে স্বেচ্ছায় রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদান আন্দোলনের অগ্রদূত। অন্যদিকে ১৯৯৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত ‘বাঁধন’ (স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের সংগঠন) “একের রক্তে অন্যের জীবন, রক্তই হোক আত্মার বাঁধন” স্লোগানকে বুকে ধারণ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এক বিশাল রক্তদাতার নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। আবার, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসাগুলোতে মাদকমুক্ত নিরাপদ রক্তদাতা বাড়াতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ‘বিআরএফ ইয়ুথ ক্লাব’। 

জাতীয় এই সংগঠনগুলোর পাশাপাশি বর্তমান সময়ে রক্তদান আন্দোলনকে জেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যায়ে সফলভাবে ছড়িয়ে দিচ্ছে স্থানীয় তরুণদের গড়া বিভিন্ন আঞ্চলিক ও সামাজিক সংগঠন, যেমন নওগাঁর বুকে আশার আলো জাগানো ‘নওগাঁ ব্লাড সার্কেল’। প্রাতিষ্ঠানিক বড় কোনো ফান্ডিং বা সরকারি অনুদান ছাড়াই, মফস্বল এলাকার সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় রক্তের সেবা পৌঁছে দিতে এবং মধ্যরাতের জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতার সন্ধান দিতে এই স্থানীয় সংগঠনগুলো এখন গ্রামীণ জনপদের সবচেয়ে বড় ভরসার নাম। আন্তর্জাতিকভাবে ‘রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি’ এবং ‘আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন অব ব্লাড ব্যাংকস (এএবিবি)’ বিশ্বজুড়ে নিরাপদ রক্তদান পদ্ধতি ও আপদকালীন রক্তের চাহিদা মেটাতে কাজ করে যাচ্ছে।

মফস্বল শহরের লড়াই ও নওগাঁ ব্লাড সার্কেলের মানবিক যাত্রা

ঢাকার মতো বড় শহরগুলোতে রক্তের খোঁজ পাওয়া যতটা সহজ, মফস্বল বা জেলা শহরগুলোতে সেই লড়াইটা অনেক বেশি কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং। প্রত্যন্ত অঞ্চলে রক্তদাতার অভাব, যাতায়াতের সমস্যা এবং রক্তের গ্রুপ সম্পর্কে অসচেতনতার কারণে বহু রোগীকে চরম সংকটে পড়তে হতো। এই সংকট দূর করতে এবং নওগাঁ জেলায় রক্তের অভাবে যেন কোনো মানুষের প্রাণ না যায়, সেই স্বপ্ন নিয়ে একঝাঁক তরুণের হাত ধরে যাত্রা শুরু করে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন 'নওগাঁ ব্লাড সার্কেলের'।

দিন কিংবা গভীর রাত– যেকোনো মুহূর্তে মুমূর্ষু রোগীর প্রয়োজনে ছুটে যান এই সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবীরা। প্রত্যন্ত গ্রামের সাধারণ মানুষকে রক্তদানে সচেতন করা, বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করা এবং কোনো বাণিজ্যিক স্বার্থ ছাড়া সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে রক্তের জোগান দিয়ে নওগাঁ ব্লাড সার্কেল আজ এ অঞ্চলের মানুষের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে। মফস্বলের এই নীরব বিপ্লবীরাই এ দেশের স্বাস্থ্যখাতের এক একটি অদৃশ্য শক্তি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রক্তদান : এক নতুন দিগন্ত

বর্তমান সময়ে মুমূর্ষু রোগীর জন্য রক্ত জোগাড়ের লড়াইয়ে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ বা মেসেঞ্জারের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো এখন কেবল আড্ডার জায়গা নয়, বরং জীবন বাঁচানোর একেকটি ভার্চুয়াল নিয়ন্ত্রণ কক্ষে পরিণত হয়েছে। 'নওগাঁ ব্লাড সার্কেল' ও 'বিআরএফ ইয়ুথ ক্লাব'-এর মতো সংগঠনগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে দারুণভাবে কাজে লাগাচ্ছে। রক্তের প্রয়োজন হওয়া মাত্রই একটি পোস্ট বা গ্রুপের একটি আলার্ট নিমেষেই পৌঁছে যাচ্ছে হাজারো তরুণের কাছে। প্রযুক্তির এই দ্রুত মেলবন্ধনের ফলে ডোনার খোঁজার সময় যেমন কমে এসেছে, তেমনি প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ঘরে বসে রক্তের সন্ধান মিলছে। সোশ্যাল মিডিয়ার এই ইতিবাচক ব্যবহার রক্তদানের আন্দোলনকে মফস্বল থেকে শুরু করে বিশ্বজুড়ে আরও বেগবান ও সুসংগঠিত করে তুলেছে।

নারীদের রক্তদান : ভাঙছে ভুল ধারণা ও শঙ্কা

আমাদের সমাজে নারীদের রক্তদান নিয়ে নানা রকম সামাজিক ট্যাবু, ভুল ধারণা আর অমূলক শঙ্কা প্রচলিত রয়েছে। শারীরিক দুর্বলতা বা রক্তশূন্যতার ভয়ে অনেক নারীই রক্তদানে পিছিয়ে থাকেন। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে এই বৃত্ত ভাঙতে শুরু করেছে। চিকিৎসকদের মতে, সুস্থ ও নির্দিষ্ট ওজনের যেকোনো প্রাপ্তবয়স্ক নারী (হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ঠিক থাকলে) নিয়মিত রক্ত দিতে পারেন। রক্তদাতা দিবসের এই বিশেষ ক্ষণে বিআরএফ ইয়ুথ ক্লাব ও নওগাঁ ব্লাড সার্কেলের মতো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো নারীদের রক্তদানে উদ্বুদ্ধ করতে বিশেষ ক্যাম্পেইন পরিচালনা করছে। বোন, মা কিংবা ঘরের নারীরা যখন রক্তদানের এই মহৎ মিছিলে শামিল হন, তখন তা কেবল একজন রোগীর প্রাণ বাঁচায় না, বরং পুরো সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। নারীদের এই অংশগ্রহণ রক্তদানের আন্দোলনকে আরও সমৃদ্ধ ও মানবিক করে তুলছে।

১৮তম জন্মদিন : রক্তদানের মাধ্যমে প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের অনন্য সূচনা

আমাদের সমাজে ১৮তম জন্মদিনটি প্রতিটি তরুণের জীবনেই এক বিশাল মাইলফলক। আইনত প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া, নাগরিক অধিকার পাওয়া আর দায়িত্ববোধের এক নতুন বৃত্তে প্রবেশ করার এই বিশেষ দিনটিকে আজকাল অনেকে কেক কেটে বা জমকালো পার্টির মাধ্যমে উদযাপন করেন। তবে বর্তমান প্রজন্মের অনেক তরুণ এই দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং এক অনন্য মানবিক উপায়ে– নিজেদের ১৮তম জন্মদিনের প্রথম প্রহরে স্বেচ্ছায় জীবনের প্রথম ব্যাগ রক্ত দান করে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের নিয়মানুযায়ী ১৮ বছর পূরণ হওয়াই হলো রক্তদানের প্রধানতম আইনি ও শারীরিক শর্ত। জীবনের এই নতুন বসন্তে পা দিয়ে নিজের এক ব্যাগ তাজা রক্ত অন্য কোনো মুমূর্ষু মানুষের ধমনিতে বিলিয়ে দেওয়ার চেয়ে শ্রেষ্ঠ শুভসূচনা আর কী হতে পারে! জন্মদিন মানে কেবল নিজের বেঁচে থাকার আনন্দ নয়, জন্মদিন মানে অন্যের বেঁচে থাকাতেও অংশীদার হওয়া। বিআরএফ ইয়ুথ ক্লাব ও নওগাঁ ব্লাড সার্কেলের মতো সংগঠনগুলো তরুণদের এই মহৎ উদযাপনে প্রতিনিয়ত উৎসাহ দিচ্ছে, যেন প্রতিটি তরুণের প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের প্রথম স্বাক্ষরটি অঙ্কিত হয় মানবতার তপ্ত লাল অক্ষরে।

রক্তদানের প্রাথমিক যোগ্যতা ও নিয়মাবলি

রক্তদান একটি মহৎ কাজ হলেও নিরাপদ রক্ত সঞ্চালনের জন্য রক্তদাতার কিছু ন্যূনতম যোগ্যতা ও নিয়ম মানা জরুরি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী:

১. বয়স ও ওজন: রক্তদাতার বয়স অবশ্যই ১৮ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে হতে হবে এবং ওজন সর্বনিম্ন ৪৫ কেজি (মেয়েদের ক্ষেত্রে ৫০ কেজি শ্রেয়) হওয়া বাঞ্ছনীয়।

২. শারীরিক সুস্থতা: রক্তদাতার রক্তচাপ (ব্লাড প্রেশার) এবং শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকতে হবে। রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ (পুরুষদের ন্যূনতম ১২.৫ গ্রাম/ডেসিলিটার এবং নারীদের ১১.৫ গ্রাম/ডেসিলিটার) সঠিক থাকা আবশ্যক।

৩. সময়সীমা বা বিরতি: একবার পূর্ণাঙ্গ রক্ত (হোল ব্লাড) দেওয়ার পর পরবর্তী রক্তদানের জন্য পুরুষদের ক্ষেত্রে অন্তত ৩ মাস এবং নারীদের ক্ষেত্রে ৪ মাস অপেক্ষা করতে হয়।

৪. কারা রক্ত দিতে পারবেন না: কোনো বড় ধরনের অস্ত্রোপচার হলে, জন্ডিস, টাইফয়েড বা কোনো সংক্রামক রোগে আক্রান্ত থাকলে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত রক্ত দেওয়া যায় না। এ ছাড়া, অন্তঃসত্ত্বা বা সন্তানকে স্তন্যপান করাচ্ছেন এমন নারীদের রক্তদান থেকে বিরত থাকতে বলা হয়।

মাদকমুক্ত রক্ত : জীবন বাঁচানোর পূর্বশর্ত

রক্তদান যেমন একটি মহান কাজ, তেমনি রক্তদাতার রক্তটি কতটা নিরাপদ ও সুস্থ, তা নিশ্চিত করা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসাবিজ্ঞান স্পষ্ট নির্দেশ দেয় যে, কোনো মাদকাসক্ত ব্যক্তি রক্তদান করতে পারবেন না। মাদক সেবনের ফলে রক্তের স্বাভাবিক গঠন ব্যাহত হয় এবং রক্তে বিষাক্ত রাসায়নিক উপাদান মিশে যায়, যা একজন মুমূর্ষু রোগীর শরীরে প্রবেশ করলে হিতে বিপরীত হতে পারে।

বিশেষ করে যারা সিরিঞ্জের মাধ্যমে শিরায় মাদক নেন, তাদের রক্তে হেপাটাইটিস-বি, হেপাটাইটিস-সি এবং এইচআইভি/এইডস-এর মতো মারাত্মক রক্তবাহিত সংক্রামক ব্যাধি থাকার ঝুঁকি থাকে শতভাগ। এ ছাড়া, নিয়মিত ধূমপান বা অ্যালকোহল সেবনকারীদের রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যায় এবং কার্বন মনোক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যায়। তাই, একজন রোগীর শিরায় বিশুদ্ধ ভালোবাসার তপ্ত লাল রক্ত পৌঁছে দিতে রক্তদাতাকে অবশ্যই সম্পূর্ণ মাদকমুক্ত ও সুস্থ জীবনযাত্রার অধিকারী হতে হবে। রক্তদানের আগে এই সত্যটি গোপন করা এক প্রকার অপরাধ, কারণ মাদকমুক্ত রক্ত একটি নিভে যাওয়া জীবনকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারে।

সামাজিক উদ্বুদ্ধকরণে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব

রক্তদান নিয়ে সাধারণ মানুষের মনের অবৈজ্ঞানিক ভয় ও ধর্মীয় দ্বিধাদ্বন্দ্ব দূর করতে মসজিদ, মন্দির, গির্জাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় নেতারা (যেমন ইমাম, খতিব বা পুরোহিত) সবচেয়ে প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করতে পারেন:

১. খুতবা ও ধর্মীয় আলোচনায় রক্তদানের আহ্বান : প্রতি জুমার নামাজের খুতবায় কিংবা ধর্মীয় মাহফিল ও প্রার্থনাসভায় মানবসেবার অংশ হিসেবে নিয়মিত রক্তদানের ফজিলত ও গুরুত্ব আলোচনা করা। বিশেষ করে ‘রক্ত দিলে শরীর দুর্বল হয় না’ এবং ‘এটি একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ দান’– এই বার্তাটি ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সাধারণ মানুষের মাঝে পৌঁছে দেওয়া।
২. ধর্মীয় উৎসবগুলোতে ব্লাড ক্যাম্প : পবিত্র রমজান মাস, ঈদে মিলাদুন্নবী, দুর্গাপূজা বা বুদ্ধপূর্ণিমার মতো বড় ধর্মীয় উৎসব ও মহাসমাবেশগুলোকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় উপাসনালয় প্রাঙ্গণে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর সহযোগিতায় রক্তদান ক্যাম্পের আয়োজন করা।
৩. ভুল ধারণা নিরসন : রক্তদান নিয়ে গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকায় প্রচলিত নানাবিধ কুসংস্কার দূর করতে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সচেতনতামূলক বক্তব্য প্রদান করা, যা সাধারণ মানুষের মনে দ্রুত বিশ্বাস ও আস্থা তৈরি করে।

ইসলামের দৃষ্টিতে রক্তদান : মানবতার সর্বোচ্চ সেবা

রক্তদান নিয়ে অনেকের মনেই বিভিন্ন ধর্মীয় প্রশ্ন বা সামাজিক দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করে। তবে আধুনিক ইসলামের স্কলার এবং বিশ্বের প্রথম সারির ফতোয়া বোর্ডগুলোর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী– কোনো মুমূর্ষু মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য রক্তদান করা কেবল জায়েজই নয়, বরং এটি অত্যন্ত সওয়াবের এবং একটি মহান মানবিক ইবাদত।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘এবং যে ব্যক্তি কোনো মানুষের জীবন রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতির জীবন রক্ষা করল।’ (সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত: ৩২)। একজন মুমূর্ষু রোগীকে রক্ত দিয়ে তার জীবন বাঁচাতে সাহায্য করা এই আয়াতের মর্মার্থের শামিল। ইসলামে মানবসেবাকে ইবাদতের অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে দেখা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুনিয়াবি বিপদ-আপদ দূর করবে, আল্লাহ তাআলা কেয়ামতের দিন তার কঠিন বিপদসমূহ দূর করে দেবেন।’ (সহিহ মুসলিম)।

ইসলামের দৃষ্টিতে রক্তদানের ক্ষেত্রে রক্তের কোনো বেচাকেনা বা বাণিজ্যিক ব্যবসা বৈধ নয়; এটি সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থ উপহার হতে হবে। রক্তদাতার নিজের শারীরিক কোনো বড় ক্ষতি না করে এবং নিরাপদ পদ্ধতিতে রক্তদান করতে হবে। এ ছাড়া, রক্তদানের ক্ষেত্রে রোগীর ধর্মীয় পরিচয় মুখ্য নয়; একজন মুসলিম অন্য যেকোনো ধর্মের রোগীকে রক্ত দিতে পারবেন এবং একইভাবে অন্য ধর্মাবলম্বীদের রক্তও নিতে পারবেন, কারণ মানুষের জীবন বাঁচানোই এখানে ইসলামের মূল লক্ষ্য।

রক্তের বিজ্ঞান : হোল ব্লাড বনাম উপাদানের পৃথকীকরণ

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক ব্যাগ রক্ত কেবল একজন রোগীর জীবন বাঁচায় না, বরং রক্তকে বিভিন্ন উপাদানে বিভক্ত করে এক সঙ্গে ৩ জন রোগীর প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব। রক্তের প্রধান উপাদানগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো লোহিত রক্তকণিকা (আরবিসি), যা মূলত তীব্র রক্তক্ষরণ, দুর্ঘটনা, অ্যানিমিয়া বা অস্ত্রোপচারের রোগীদের দেওয়া হয় এবং এটি ফ্রিজে ৪২ দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়।

রক্তের তরল অংশকে বলা হয় প্লাজমা (প্লাজমা), যা আগুনে পোড়া রোগী বা লিভারের জটিলতায় আক্রান্তদের জন্য অতীব প্রয়োজনীয় এবং এটি হিমায়িত অবস্থায় ১ বছর পর্যন্ত টিকিয়ে রাখা সম্ভব। অন্যদিকে ডেঙ্গু, ব্লাড ক্যানসার বা বোন ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্টের রোগীদের জন্য সবচেয়ে জরুরি উপাদান হলো প্লাটিলেট (প্লাটিলেটস); তবে এর আয়ু মাত্র ৫ দিন এবং একে ল্যাবে সার্বক্ষণিক নাড়াচাড়ার মধ্যে রাখতে হয়।

তাই রক্তের এই বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে রক্তদাতারা শুধু পূর্ণাঙ্গ রক্ত বা হোল ব্লাড দান করেই ক্ষান্ত হোন না, বরং উপাদান পৃথকীকরণের মাধ্যমে একটিমাত্র রক্তদান থেকে একাধিক মুমূর্ষু মানুষের বেঁচে থাকার অবলম্বন হয়ে ওঠেন।

সরকারের দায়িত্ব ও করণীয়

একটি দেশের স্বাস্থ্য খাতের মেরুদণ্ড হলো নিরাপদ ও সহজলভ্য রক্ত সঞ্চালন ব্যবস্থা। এ ক্ষেত্রে একক সংগঠনগুলোর প্রচেষ্টার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বড় ভূমিকা রয়েছে। সরকারের প্রধান দায়িত্বগুলো হলো–

১. রক্তের আধুনিক স্ক্রিনিং ও সেন্ট্রালাইজড ব্লাড ব্যাংক : প্রতিটি জেলা হাসপাতালে সরকারি উদ্যোগে আধুনিক সেন্ট্রাল ব্লাড ব্যাংক স্থাপন এবং শতভাগ নিরাপদ রক্তের জন্য প্রযুক্তির প্রসার ঘটানো।
২. দালাল চক্র ও রক্ত বাণিজ্য বন্ধ করা: রক্তের বাণিজ্যিক কেনাবেচা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে পেশাদার রক্ত বিক্রেতাদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা এবং অনিবন্ধিত ও অস্বাস্থ্যকর ব্লাড ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া।

৩. স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে নীতিগত সহায়তা: নওগাঁ ব্লাড সার্কেলের মতো স্থানীয় ও জাতীয় স্তরের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি, প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সাপোর্ট এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্লাড ক্যাম্প করার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সহযোগিতা দেওয়া।

৪. জাতীয় তথ্যভাণ্ডার (ন্যাশনাল ডাটাবেজ): সরকারি উদ্যোগে একটি সেন্ট্রাল রক্তদাতা ডাটাবেজ বা মোবাইল অ্যাপ তৈরি করা, যার মাধ্যমে যেকোনো দুর্যোগে বা জরুরি মুহূর্তে দ্রুত রক্তদাতার সন্ধান মেলানো সম্ভব হয়।

জনসচেতনতায় ইনফ্লুয়েন্সার ও সেলিব্রিটিদের ভূমিকা

আজকের ডিজিটাল যুগে মানুষের চিন্তাভাবনা ও জীবনযাত্রায় সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার, কনটেন্ট ক্রিয়েটর, খেলোয়াড় এবং বিনোদন জগতের তারকাদের প্রভাব অপরিসীম। রক্তদানের মতো একটি মানবিক আন্দোলনকে গণআন্দোলনে রূপ দিতে তারা দারুণ ভূমিকা রাখতে পারেন:

১. ভীতি দূরীকরণ ও ইতিবাচক বার্তা: অনেক তরুণ সুইয়ের ভয় বা শারীরিক দুর্বলতার আশঙ্কায় রক্ত দিতে দ্বিধাবোধ করেন। ইনফ্লুয়েন্সাররা তাদের মিলিয়ন অনুসারীদের সামনে নিজে রক্ত দেওয়ার অভিজ্ঞতা বা ভ্লগ শেয়ার করে এই অমূলক ভয় দূর করতে পারেন।

২. ক্যাম্পেইনের প্রচার: বিশ্ব রক্তদাতা দিবসের মতো বিশেষ দিনগুলোতে বা কোনো জরুরি সংকটে (যেমন ডেঙ্গু মহামারির সময় প্লাটিলেটের অভাব) ইনফ্লুয়েন্সারদের একটিমাত্র সচেতনতামূলক পোস্ট বা ভিডিও নিমেষেই লাখো তরুণকে ডোনার হতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে।

৩. সামাজিক ট্যাবু ভাঙা: বিশেষ করে নারীদের রক্তদান কিংবা ধর্মীয় ভুল ধারণাগুলো ভাঙতে সেলিব্রিটিদের ইতিবাচক বক্তব্য ও প্রচারণা সমাজের রক্ষণশীল মানসিকতা বদলে দিতে ম্যাজিকের মতো কাজ করে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমের অংশীদারিত্ব

রক্তদানের এই সংস্কৃতি স্থায়ী করতে হলে তরুণদের একদম ছাত্রজীবন থেকেই মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে হবে। মাধ্যমিক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের পাঠ্যপুস্তকে রক্তদানের বৈজ্ঞানিক ও মানবিক গুরুত্বের ওপর বিশেষ অধ্যায় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা এবং স্বেচ্ছায় রক্তদান ক্যাম্পের আয়োজন করা উচিত। পাশাপাশি টেলিভিশন, সংবাদপত্র ও অনলাইন পোর্টালগুলোর উচিত রক্তদানের মানবিক গল্পগুলো বেশি বেশি প্রচার করা, যাতে মানুষ অনুপ্রাণিত হয় এবং রক্তদাতারা সামাজিকভাবে সম্মানিত বোধ করেন।

রক্তদানের স্বাস্থ্যগত সুফল ও বৈজ্ঞানিক উপকারিতা

নিয়মিত রক্তদান কেবল অন্যের জীবনই বাঁচায় না, বরং রক্তদাতার নিজের শরীরের জন্যও এটি অত্যন্ত উপকারী। নিয়মিত রক্তদান করলে শরীরে অতিরিক্ত আয়রনের মাত্রা কমে যায়, যা হৃদরোগ (Heart Attack) এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে দেয় [২]। এটি রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে [৪], রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে এবং ফুসফুস, লিভার ও কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি হ্রাস করতে সাহায্য করে [৩] ।

রক্ত দেওয়ার পর শরীরের অস্থিমজ্জা (বোন ম্যারো) নতুন রক্তকণিকা তৈরির জন্য উদ্দীপিত হয়, ফলে শরীরে নতুন এবং কর্মক্ষম লোহিত রক্তকণিকা তৈরি হয় যা শরীরকে প্রাণবন্ত করে তোলে। এ ছাড়া, প্রতিবার রক্তদানের পূর্বে রক্তদাতার শরীরের রক্তচাপ, পালস, ওজন এবং হিমোগ্লোবিনের মাত্রা পরীক্ষার পাশাপাশি হেপাটাইটিস-বি, হেপাটাইটিস-সি, ম্যালেরিয়া, সিফিলিস এবং এইচআইভি-এর মতো ৫টি মারাত্মক রোগের স্ক্রিনিং সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা হয়।

বৈশ্বিক পরিসংখ্যান ও তরুণ প্রজন্মের দায়িত্ব

বিশ্বব্যাপী বছরে প্রায় ১১ কোটি ৮৫ লাখ ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ করা হয় [১]। তবে সংগৃহীত রক্তের প্রায় ৪০ শতাংশই আসে বিশ্বের উচ্চ আয়ের বা উন্নত দেশগুলো থেকে, যেখানে পৃথিবীর মাত্র ১৬ শতাংশ মানুষ বসবাস করে; বাকি ৮৪ শতাংশ মানুষের জন্য অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে রক্তের তীব্র সংকট লেগেই থাকে [১]।

রক্তদানকে কেবল একটি সাময়িক সাহায্য হিসেবে না দেখে একে একটি সামাজিক দায়িত্ব ও মানবিক ইবাদত হিসেবে নেওয়া উচিত। মারজিয়া, আব্দুর রহমান সাহেব কিংবা তামিমদের মতো লাখো মানুষের জীবনপ্রদীপ সচল রাখতে তরুণ সমাজের প্রতি বিশেষ অনুরোধ, আপনার বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হলেই এবং শারীরিকভাবে সুস্থ থাকলে নিয়মিত রক্তদানে এগিয়ে আসুন। আপনার দেওয়া মাত্র এক ব্যাগ রক্তে শুধু একজন রোগীর প্রাণ বাঁচে না, বরং বেঁচে যায় একটি পুরো পরিবার। পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে রক্তের জন্য যেন আর কোনো হাহাকার না হয়– এই হোক এবারের রক্তদাতা দিবসের অঙ্গীকার।

রক্তদানের পর করণীয়

রক্ত শেষ হওয়ার পর পরই তাড়াহুড়ো করে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়া উচিত নয়; অন্তত ১০ থেকে ১৫ মিনিট সোজা হয়ে শুয়ে বিশ্রাম নেওয়া জরুরি, যেন মস্তিষ্কে রক্তসঞ্চালন স্বাভাবিক থাকে। সুই ফোটানোর স্থানে লাগানো ব্যান্ডেজটি অন্তত কয়েক ঘণ্টা রাখা উচিত এবং সেদিন ভারী কোনো জিনিস তোলা বা অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রমের কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে।

রক্তদানের পর তরল উপাদানের যে ঘাটতি তৈরি হয়, তা পূরণে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় প্রচুর পরিমাণে পানি, ডাবের পানি, ফলের রস এবং সাধারণ খাবার খাওয়া প্রয়োজন। যদি সাময়িকভাবে কিছুটা মাথা ঘোরানোর অনুভূতি হয়, তবে তৎক্ষণাৎ মাথা নিচু করে বসে পড়তে হবে অথবা পা দুটি কিছুটা উঁচুতে রেখে শুয়ে পড়তে হবে। মনে রাখতে হবে, নিজের শরীরকে দ্রুত সতেজ করে তোলাই হলো আগামীতে আরেকজন মানুষকে বাঁচানোর প্রথম প্রস্তুতি।

রক্তদাতার সঙ্গে করণীয়

যিনি নিজের শরীরের মহামূল্যবান উপাদান বিলিয়ে দিতে কোনো প্রতিদানের আশা না করে হাসপাতালে ছুটে আসেন, তিনি কোনো সাধারণ মানুষ নন– তিনি একজন নিঃস্বার্থ জীবনদাতা। তাই রোগী, রোগীর স্বজন কিংবা ব্লাড ব্যাংকের কর্মীদের দায়িত্ব হলো তার প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান ও যত্নশীল আচরণ করা। রক্তদানের পর তাকে আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞতা জানানো এবং একটি হাসিমুখের ধন্যবাদ দেওয়া আমাদের সামাজিক ও মানবিক দায়িত্ব।

অনেক সময় দেখা যায়, রক্ত দেওয়ার পর ডোনারকে এক গ্লাস পানি বা একটু জুস এগিয়ে দিতেও স্বজনরা ভুলে যান– এই উদাসীনতা কাম্য নয়। রক্তদাতার যাতায়াত এবং ন্যূনতম আপ্যায়নের সুবিধাটুকু যেন কোনো অবহেলার শিকার না হয়, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা উচিত। সর্বোপরি, রক্তদাতাকে কোনো ‘রক্তের জোগানদার’ ভাবার ভুল না করে, তাকে সমাজের এক একজন অনন্য হিরো বা নায়ক হিসেবে সম্মানিত করা উচিত, কারণ তাদের এই ত্যাগ কোনো আর্থিক মূল্যে পরিমাপ করা অসম্ভব।

থ্যালাসেমিয়া, ব্লাড ক্যানসার, ডায়ালাইসিস সহ অনেক রোগী বেঁচে আছে আপনার মতো তরুণ-তরুণীর দেওয়া রক্তেই। এ ছাড়া, সিভিয়ার অ্যানিমিয়া, সিজার, অপারেশন, অ্যাক্সিডেন্ট সহ অসংখ্য রোগী তাকিয়ে আছে আপনার রক্তের দিকে। আপনি রক্ত দেবেন, আর না হয় তারা মারা যাবে। যদি নিজে সুস্থ থাকেন, তাহলে সিদ্ধান্ত আপনার।

“যদি কোনো ব্যক্তি কোনো মানুষের জীবন রক্ষা করে সে যেন পুরো মানবজাতিকেই রক্ষা করলো” (সূরা মায়িদা, আয়াত ৩২)

রক্ত দিন, জীবন বাঁচান। শুভ বিশ্ব রক্তদাতা দিবস।

বিআরইউ

বিজ্ঞাপন