‘আমরা সবাই আমাদের রক্তের গ্রুপ জানি, কিন্তু ক্যারিয়ার স্ট্যাটাস জানি না। আর এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় অজ্ঞতা।’ বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. রাজিয়া সুলতানার এই উদ্বেগ যেন দেশের এক নীরব স্বাস্থ্য সংকটের বাস্তব চিত্র।
আপাতদৃষ্টিতে সুস্থ মানুষের মতো জীবনযাপন করলেও একজন বাহক নিজেও জানেন না যে তিনি একটি ত্রুটিপূর্ণ জিন বহন করছেন। এই বিশেষজ্ঞের ভাষায়, বিয়ের আগে সচেতন না হয়ে যদি দুইজন বাহক বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, তবে অনাগত সন্তানের জীবনে নেমে আসতে পারে থ্যালাসেমিয়ার মতো বংশগত ও জটিল রোগের ঝুঁকি।
ঢাকা পোস্টকে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে ডা. রাজিয়া সুলতানা বলেন, আমাদের অজান্তেই শরীরের ভেতরে বয়ে চলা এক নীরব ঘাতকের নাম থ্যালাসেমিয়া। আক্রান্ত ব্যক্তি বা বাহক—কারও চেহারা দেখে বোঝার উপায় নেই যে তিনি একটি ত্রুটিপূর্ণ জিন বহন করছেন। বাহকের শরীরে সাধারণত রোগের কোনো দৃশ্যমান লক্ষণ থাকে না, ফলে অধিকাংশ মানুষই নিজের ঝুঁকি সম্পর্কে অবগত থাকেন না। কিন্তু বিয়ের পর যখন দুইজন বাহকের মিলন ঘটে, তখন সেই অজানা ঝুঁকির সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় তাদের অনাগত সন্তানকে।

বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতি নয়জনের মধ্যে একজন থ্যালাসেমিয়ার বাহক এবং প্রায় ৬০ থেকে ৭০ লাখ মানুষ এই নীরব ঝুঁকি নিয়ে জীবনযাপন করছেন।
তিনি বলেন, অবহেলা, অজ্ঞতা এবং প্রয়োজনীয় সচেতনতার অভাবে প্রতি বছর হাজার হাজার শিশু থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্মগ্রহণ করছে। অথচ এই ভয়াবহ রোগটি শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য। কেবল বিয়ের আগে ‘হিমোগ্লোবিন ইলেক্ট্রোফোরেসিস’ নামক একটি সাধারণ পরীক্ষার মাধ্যমেই একজন মানুষ জেনে নিতে পারেন নিজের ‘ক্যারিয়ার স্ট্যাটাস’। বিয়ের আগে স্ক্রিনিং টেস্টই হতে পারে থ্যালাসেমিয়ামুক্ত এক নতুন প্রজন্ম গড়ে তোলার অন্যতম কার্যকর ভিত্তি।
ডা. রাজিয়া সুলতানার মতে, থ্যালাসেমিয়া কেবল একটি রোগ নয়। এটি সচেতনতার অভাবে এটি বংশপরম্পরায় বয়ে চলা একটি নীরব সংকট। তিনি বলেন, আমরা (বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশন) মূলত থ্যালাসেমিয়া রোগীদের নিয়ে কাজ করি। ডায়াগনোসিস থেকে শুরু করে ব্লাড ট্রান্সফিউশন, ফলোআপ এবং বিভিন্ন জটিলতা নিরসনে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস দেওয়ার চেষ্টা করি। বর্তমানে ফাউন্ডেশনের নিবন্ধিত রোগীর সংখ্যা ৯ হাজারের বেশি। রোগীদের সুবিধার্থে ঢাকার বাইরে থেকে আসা দুস্থ রোগীদের জন্য রয়েছে ‘থ্যালাসেমিয়া নিবাস’, যেখানে বিনামূল্যে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।

তিনি জানান, থ্যালাসেমিয়া একটি জন্মগত ও বংশগত রক্তরোগ। হিমোগ্লোবিনের ত্রুটির কারণে শরীরে স্বাভাবিক রক্ত উৎপাদন ব্যাহত হয়। ফলে রোগীদের দীর্ঘমেয়াদে, অনেক ক্ষেত্রে আজীবন, নিয়মিত রক্ত গ্রহণের প্রয়োজন হয়।
তবে ডা. রাজিয়া সুলতানার মতে, এটি ১০০ শতাংশ প্রতিরোধযোগ্য। তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই আমাদের রক্তের গ্রুপ জানি, কিন্তু ক্যারিয়ার স্ট্যাটাস জানি না। একজন বাহক অন্য একজন বাহককে বিয়ে করলেই কেবল সন্তান থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই বিয়ের আগে হিমোগ্লোবিন ইলেক্ট্রোফোরেসিস টেস্টের মাধ্যমে নিজের স্ট্যাটাস জেনে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।’
অনেকের ধারণা, থ্যালাসেমিয়া হলে রোগী বাঁচে না। ডা. রাজিয়া একে পুরোপুরি ‘মিথ’ বলে উড়িয়ে দেন। তিনি জানান, নিয়মিত রক্ত সঞ্চালন এবং আয়রন চিলেশন থেরাপি গ্রহণ করলে থ্যালাসেমিয়া রোগীরাও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। তাদের ফাউন্ডেশনে এমন রোগীও আছেন, যার বয়স বর্তমানে ৬২ বছর। অর্থাৎ, যথাযথ চিকিৎসা ও নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে এই রোগীরাও দীর্ঘায়ু এবং কর্মক্ষম জীবন কাটাতে সক্ষম।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, বর্তমানে দেশে থ্যালাসেমিয়ার প্রধান চিকিৎসা পদ্ধতি হলো নিয়মিত রক্ত সঞ্চালন। এ ছাড়া বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট বা স্টেম সেল ট্রান্সপ্ল্যান্ট একটি স্থায়ী প্রতিকার হিসেবে বিবেচিত হলেও বাংলাদেশে এর পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা এখনো সীমিত। প্রতি মাসে একজন রোগীর চিকিৎসায় ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। তাই সরকারি হাসপাতাল কিংবা স্বীকৃত ডায়াগনস্টিক সেন্টারে হেমাটোলজিস্টের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

পাঠ্যপুস্তকে থ্যালাসেমিয়া বিষয়ে সচেতনতামূলক পাঠ অন্তর্ভুক্তির দাবি
থ্যালাসেমিয়ার নীরব বিস্তার রোধে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। ডা. রাজিয়া সুলতানার মতে, শুধুমাত্র বিয়ের আগে নয়, বরং স্কুলজীবন থেকেই শিক্ষার্থীদের থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে সচেতন করে তোলা উচিত। তিনি বলেন, ‘আমি চাই এটি পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা হোক। শিক্ষার্থীরা যেন খুব ছোটবেলা থেকেই নিজের ক্যারিয়ার স্ট্যাটাস সম্পর্কে সচেতন হয়। তবেই আমরা সুস্থ ও সচেতন পরবর্তী প্রজন্ম গড়ে তুলতে পারব।’
তার মতে, থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে জাতীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, বিয়ের আগে স্ক্রিনিং টেস্টের গুরুত্ব প্রচার এবং শিক্ষাব্যবস্থায় এ বিষয়ে কার্যকর পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই বংশগত রোগের ঝুঁকি থেকে অনেকাংশে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে।
থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য রক্তদান করলেন ইউএস-বাংলা গ্রুপের কর্মীরা
আন্তর্জাতিক রক্তদাতা দিবস উপলক্ষ্যে থ্যালাসেমিয়া রোগীদের পাশে দাঁড়িয়েছে ইউএস-বাংলা গ্রুপ। গত ১৪ জুন রাজধানীর উত্তরায় প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক সচেতনতামূলক সেমিনার ও স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচিতে বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন।
বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় আয়োজিত এ কর্মসূচির উদ্দেশ্য ছিল থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য নিরাপদ রক্তের জোগান নিশ্চিত করা এবং স্বেচ্ছায় রক্তদানের বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। সেমিনারে অংশগ্রহণকারীদের সামনে থ্যালাসেমিয়া কী, কেন হয়, কারা এ রোগের বাহক হতে পারেন এবং কীভাবে এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব—এসব বিষয়ে বিস্তারিত উপস্থাপনা করা হয়। পাশাপাশি বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়া স্ক্রিনিং পরীক্ষার গুরুত্বও তুলে ধরা হয়।
পরে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা স্বেচ্ছায় রক্তদান করেন। অংশগ্রহণকারীরা জানান, থ্যালাসেমিয়া রোগীদের বেঁচে থাকার জন্য নিয়মিত রক্তের প্রয়োজন হয়। তাই সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং মানবিক দায়িত্ববোধ থেকেই তারা এই উদ্যোগে সম্পৃক্ত হয়েছেন।
ইউএস-বাংলা গ্রুপের চিফ অব মেডিক্যাল সার্ভিস ডা. এস এম কাউসার নাহিদ বলেন, করপোরেট প্রতিষ্ঠানে সাধারণত বিনিয়োগ ও মুনাফা বেশি গুরুত্ব পায়। তবে রক্তদান এমন একটি মানবিক উদ্যোগ, যার মাধ্যমে একটি জীবন বাঁচানো সম্ভব।
তিনি বলেন, থ্যালাসেমিয়া রোগীদের প্রতি দুই থেকে চার সপ্তাহ পরপর এক ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হয়। একজন দাতার দেওয়া ৪৫০ মিলিলিটার রক্ত একজন রোগীর জীবনে নতুন আশার সঞ্চার করতে পারে। এ কারণে তিনি সবাইকে নিয়মিত স্বেচ্ছায় রক্তদানে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) মো. কামরুল ইসলাম বলেন, সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে ইউএস-বাংলা গ্রুপ। বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় শুরু হওয়া এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও বৃহৎ পরিসরে অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, কর্মসূচির অংশ হিসেবে সকাল ১০টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত সচেতনতামূলক সেমিনার এবং বেলা ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত স্বেচ্ছায় রক্তদান কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
আরএইচটি/এসএম
