২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্বাস্থ্যখাতে বাজেটের পরিমাণ গত অর্থবছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা। যা জিডিপির আকারে ১ দশমিক ০১ শতাংশ। গত অর্থবছরে অর্থাৎ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৩৫ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা, যা জিডিপির দশমিক ৫৮ শতাংশ। তবে অতীতে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দকৃত অর্থ পুরোপুরি ব্যয় করতে না পারার সক্ষমতার বিষয়টি সামনে রেখে এবারের বাজেটের অর্থ বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদরা।
এবারের স্বাস্থ্য বাজেটে বড় পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে ৪৬৩টি উপজেলা সদর হাসপাতালকে ৫০ শয্যা থেকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা এবং জনবল সংকটে থাকা হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেওয়া। এছাড়া প্রস্তাবিত বাজেটে খুলনা, বরিশাল, রংপুর, রাজশাহী ও কুমিল্লায় পাঁচটি শিশু হাসপাতাল চালুর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। পাশাপাশি আটটি ক্যানসার ইনস্টিটিউট, দুটি বিশেষায়িত হাসপাতাল এবং ১৮টি এক হাজার শয্যার সাধারণ হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী ও পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দিতে পারলে দেশের স্বাস্থ্যসেবার মান বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, পরিকল্পিতভাবে যদি বাজেটের অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়, তাহলে দেশের চিকিৎসাসেবায় আমূল পরিবর্তন সম্ভব। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বিবেচনায় বাস্তবায়ন সম্পন্ন হওয়ার আগে পুরোপুরি আস্থা রাখা কঠিন। তারপরও সরকার জিডিপির এক শতাংশের বেশি স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ দিয়ে যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা আশাব্যঞ্জক।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, অতীতেও স্বাস্থ্যখাতে বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হলেও পরবর্তী সময়ে সংশোধিত বাজেটে অনেক সময় বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় করতে না পারার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। তবে অর্থ ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা স্বাস্থ্যখাতের অনেক প্রতিষ্ঠানের রয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের আয় ও সরকারি বরাদ্দের সমন্বয়ে কার্যকরভাবে অর্থ ব্যয় করতে সক্ষম হচ্ছে। দেশের বড় বড় মেডিকেল কলেজ ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বায়ত্তশাসিত কাঠামোর আওতায় আনা গেলে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দের অর্থ ফেরত যাওয়ার প্রবণতা কমবে। বাজেট বাস্তবায়নে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন স্বাস্থ্য কমিশন গঠন করা প্রয়োজন। বিভাগীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যখাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে অধিকতর স্বায়ত্তশাসন দেওয়া গেলে বরাদ্দের অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি অর্থ ছাড়ে বিলম্বের কারণেও অনেক সময় বরাদ্দের অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হয় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানানো হচ্ছিল। এবারের বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ জিডিপির এক শতাংশ অতিক্রম করেছে, যা ইতিবাচক দিক। এবারের বাজেটে পরিচালন ব্যয়ের পাশাপাশি উন্নয়ন বাজেটে বড় ধরনের বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে এর একটি বড় অংশ থোক বরাদ্দ হিসেবে রাখা হয়েছে। এই অর্থ ব্যয় করতে হলে প্রকল্প গ্রহণ ও অনুমোদনের প্রয়োজন হবে। প্রকল্প গ্রহণ থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপ থাকায় দ্রুত অর্থ ব্যয় করা চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, দেশের চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ এখনো জনগণকে নিজস্ব অর্থ থেকে বহন করতে হয়। মানুষের ব্যক্তিগত চিকিৎসা ব্যয় কমাতে বাজেটে আরও সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ প্রয়োজন ছিল। ই-হেলথ কার্ডের মতো উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও এটি সরাসরি চিকিৎসা ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। হাসপাতালের ওষুধ ও ডায়াগনস্টিক সেবার মান উন্নয়নে আরও বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন তাহলে চিকিৎসায় জনগণকে নিজস্ব অর্থব্যয় কিছুটা হলেও হ্রাস পেতো।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. রুমানা হক বলেন, এবারের প্রস্তাবিত বাজেট স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বাস্থ্যখাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ। গত সংশোধিত বাজেটের তুলনায় এটি প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা স্বাস্থ্যখাতের জন্য ইতিবাচক বার্তা। তবে শুধু বরাদ্দ বৃদ্ধি করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। অতীতে স্বাস্থ্যখাতে উন্নয়ন বাজেট বা এডিপি বাস্তবায়নে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা দেখা গেছে। প্রকল্প অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা, জটিল ক্রয় প্রক্রিয়া, দক্ষ ব্যবস্থাপনার অভাব এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে অনেক সময় বরাদ্দের অর্থ যথাসময়ে ব্যবহার করা সম্ভব হয় না।
তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নে সুশাসন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও ক্যানসারের মতো অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।
এদিকে বরাদ্দের অর্থ ফেরত না যাওয়ার বিষয়ে ঘোষণা দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. নাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, এবার বরাদ্দের একটি টাকাও ফেরত না যাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার। তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং চিকিৎসাসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া। এটি সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার। উপজেলার সব হাসপাতালে শয্যা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেওয়া হবে। জরুরি রোগী পরিবহনের জন্য আধুনিক অ্যাম্বুলেন্সের পাশাপাশি হেলিকপ্টার সেবাও যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বাজেট ছাড়াও চিকিৎসা সামগ্রীতে প্রণোদনা, কমবে ব্যায়
চিকিৎসা ব্যয় কমাতে স্বাস্থ্যখাতে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জামের ওপর কর ও ভ্যাট কমানোর উদ্যোগ থাকছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে। এর ফলে চোখের ইন্ট্রাওকুলার লেন্স, হার্টের রিং (স্টেন্ট) এবং ডায়ালাইসিস সামগ্রীর দাম কমতে পারে। বাজেটে চোখের ইন্ট্রাওকুলার লেন্সের জোগানদার পর্যায়ে ১০ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহারের ঘোষণা আসতে পারে। এতে প্রতিটি লেন্সের দাম প্রায় ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কমতে পারে বলে জানা গেছে।
একইভাবে হৃদরোগ চিকিৎসায় ব্যবহৃত হার্টের রিংয়ের জোগানদার পর্যায়ে ১০ শতাংশ কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব থাকছে। এতে প্রতিটি রিংয়ের খরচ প্রায় ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমতে পারে। কিডনি রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ৫ শতাংশ অগ্রিম কর প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। এতে একজন রোগীর ডায়ালাইসিস খরচ প্রায় ৮০০ টাকা পর্যন্ত কমতে পারে।
এছাড়া হেমোডায়ালাইসিসের ব্লাড টিউবিং সেট আমদানির ক্ষেত্রেও সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট ও অগ্রিম কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব থাকতে পারে। শারীরিকভাবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ব্যবহারের জন্য আমদানি করা ১৫টি পণ্যের অগ্রিম আয়কর ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হতে পারে। পাশাপাশি মরদেহ সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত মরচুয়ারি আমদানিতে আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করার উদ্যোগ থাকছে।
এদিকে দেশীয় ওষুধ শিল্পকে আরও সক্ষম করতে বাজেটে বিভিন্ন সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানের ও সাশ্রয়ী মূল্যের ক্যানসার প্রতিরোধী ওষুধ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়াতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে বিদ্যমান রেয়াতি শুল্ক সুবিধার তালিকায় নতুন করে আরও ৯টি পণ্য যুক্ত করার প্রস্তাব থাকছে। এছাড়া অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই) তৈরির ৫১টি নতুন কাঁচামালের আমদানি শুল্ক পুরোপুরি প্রত্যাহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ওষুধ রপ্তানির প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে আরও ১৭টি মৌলিক কাঁচামাল রেয়াতি সুবিধার আওতায় আনার প্রস্তাব থাকছে।
এমএল/এমএন
