বাংলাদেশে হাম প্রতিরোধ ও এর চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জিত হয়েছে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান নিজস্ব উদ্যোগে প্রণয়ন করেছে কাঠামোবদ্ধ প্রাতিষ্ঠানিক ‘হাম চিকিৎসা নির্দেশিকা’।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) সকাল ৯টায় হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই প্রমাণভিত্তিক নির্দেশিকাটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। এটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে হাম রোগের সুনির্দিষ্ট নির্ণয় ও চিকিৎসা পদ্ধতিকে মানসম্মত ও সমন্বিত করার লক্ষ্যে প্রণীত হয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রোগভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসা নির্দেশিকা দীর্ঘদিনের প্রচলিত নিয়ম হলেও বাংলাদেশে এ ধরনের উদ্যোগ এই প্রথম। স্বাস্থ্যসেবা বিশেষজ্ঞ ও শিশুস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট মহলের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার বাস্তবায়ন ঘটল এই নির্দেশিকার মাধ্যমে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. কে. এম. মজিবুল হক। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী সর্দার মো. শাহাদাত হোসেন, এমপি। তিনি এ উদ্যোগকে জাতীয় স্বাস্থ্যখাতের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ উল্লেখ করে কলেজ ও হাসপাতালের জন্য আরও আবাসন, হোস্টেল ও অবকাঠামোগত সুবিধা সম্প্রসারণের আশ্বাস প্রদান করেন।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)-এর সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন-অর-রশীদ, মহাসচিব ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিল, হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহীন রহমান চৌধুরী এবং কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মেহেরুন নেসা।
অনুষ্ঠানে হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজের কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. ফারহানা হক হাসপাতাল সম্পর্কিত একটি উপস্থাপনা তুলে ধরেন। হাসপাতালটির মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সায়েম মোহাম্মদ দেশের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক হাম চিকিৎসা নির্দেশিকা নিয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। ১৪টি ক্লিনিক্যাল মডিউল নিয়ে প্রণীত ৫০ পৃষ্ঠার এই নির্দেশিকাটির প্রধান সম্পাদক ছিলেন ডা. ফারহানা হক (এমবিবিএস, এমপিএইচ) এবং ডা. সায়েম মোহাম্মদ (এফসিপিএস স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত, এমআরসিপি-ইউকে)। এ পর্যন্ত বাংলাদেশের কোনো হাসপাতাল বা চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে হাম ও এর জটিলতা ব্যবস্থাপনার জন্য এ ধরনের মানসম্মত ও প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা প্রোটোকল ছিল না।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনার শুরুতে কি-নোট স্পিকার ডা. সায়েম মোহাম্মদ বিশ্বব্যাপী হাম রোগের পুনরুত্থান সম্পর্কে আলোকপাত করেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১ কোটি ৩ লাখ হাম রোগীর মধ্যে ১ লাখ ৭ হাজার ৫০০ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের ৯৫ শতাংশই ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ; এর সংক্রমণ হার (R₀) ১২–১৮, যা অধিকাংশ পরিচিত সংক্রামক রোগের তুলনায় অনেক বেশি। গত বছর বিশ্বব্যাপী প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ শিশু তাদের প্রথম ডোজ টিকা পায়নি এবং প্রায় ৪ কোটি ৬০ লাখ শিশু কোনো টিকাই গ্রহণ করেনি।
১৭ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার বাংলাদেশে বিভিন্ন বিভাগে হাম রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে শহুরে বস্তি, অনুন্নত ও কম টিকাদান কভারেজসম্পন্ন এলাকায়। এতদিন দেশে হাম চিকিৎসার জন্য কোনো জাতীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক নির্দেশিকা না থাকায় চিকিৎসকদের অনেক ক্ষেত্রে মানসম্মত দিকনির্দেশনা ছাড়াই চিকিৎসা সিদ্ধান্ত নিতে হতো। ফলে নিউমোনিয়া, এনসেফালাইটিস এবং মারাত্মক পানিশূন্যতার মতো জটিলতার ব্যবস্থাপনায় অসামঞ্জস্য দেখা দিত এবং প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুও ঘটত।
নতুন নির্দেশিকায় তিন-স্তরবিশিষ্ট ক্লিনিক্যাল ট্রায়াজ ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যার মাধ্যমে রোগীদের হাসপাতালে প্রবেশের সময়ই স্পষ্ট মানদণ্ড অনুযায়ী বাড়িতে চিকিৎসা, আইসোলেশন ওয়ার্ড অথবা জরুরি বিভাগ/আইসিইউতে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে। এছাড়া পরীক্ষার ফলাফলের জন্য অপেক্ষা না করে তাৎক্ষণিকভাবে ভিটামিন-এ প্রদানের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নির্দেশিকায় হামজনিত নিউমোনিয়ার জন্য অক্সিজেন ব্যবস্থাপনার ধাপভিত্তিক নির্দেশনা, এনসেফালাইটিস ও খিঁচুনির চিকিৎসা, অন্ধত্ব প্রতিরোধে চোখের জটিলতা ব্যবস্থাপনা, গুরুতর পানিশূন্যতার চিকিৎসা এবং হাসপাতালের আইসোলেশন কক্ষে কঠোর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। হাম বায়ুবাহিত রোগ হওয়ায় স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য সাধারণ সার্জিক্যাল মাস্কের পরিবর্তে বাধ্যতামূলকভাবে N95 রেসপিরেটর ব্যবহারের নির্দেশনাও এতে উল্লেখ করা হয়েছে।
নির্দেশিকায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তাও রয়েছে– হামজনিত নিউমোনিয়ায় কর্টিকোস্টেরয়েড ব্যবহার করা যাবে না, চোখের জটিলতায় স্টেরয়েড ড্রপ ব্যবহার করা যাবে না এবং গুরুতর পানিশূন্যতায় শুধু ডেক্সট্রোজ স্যালাইন ব্যবহার নিষিদ্ধ। এসব ভুল চিকিৎসা অতীতে বহু রোগীর জীবনহানির কারণ হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ডা. ফারহানা এবং ডা. সায়েম মোহাম্মদ এই নির্দেশিকাকে জাতীয় হাম চিকিৎসা প্রোটোকল হিসেবে গ্রহণ করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি হাসপাতাল স্বীকৃতি প্রক্রিয়ায় আইসোলেশন কক্ষ ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ মানদণ্ড বাধ্যতামূলক করারও সুপারিশ করা হয়েছে।
মূল প্রবন্ধে জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে শিশু আইসিইউ সক্ষমতা বৃদ্ধি, সম্মুখসারির স্বাস্থ্যকর্মীদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা যাচাই বাধ্যতামূলক করা এবং রোগের প্রাদুর্ভাব সম্পর্কিত তথ্য দ্রুত কেন্দ্রীয় পর্যায়ে পৌঁছানোর জন্য রিয়েল-টাইম ইলেকট্রনিক রিপোর্টিং ব্যবস্থা চালুর আহ্বান জানানো হয়। ডা. সায়েম মোহাম্মদ বলেন, “বাংলাদেশে হামে প্রতিটি মৃত্যু প্রতিরোধযোগ্য। এই নির্দেশিকা আমাদের প্রতিষ্ঠানের অঙ্গীকার। আমরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই, এটিকে জাতীয় হাম চিকিৎসা নির্দেশিকা হিসেবে গ্রহণ করা হোক।”
রাজধানীর অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিক্ষণ হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ হিসেবে হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা শিক্ষা ও রোগীসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। নতুন এই নির্দেশিকা প্রকাশের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি কেবল রোগীর চিকিৎসাই নয়, বরং বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণেও অগ্রণী ভূমিকা রাখার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।
বিআরইউ
