চলতি বছর দেশব্যাপী জটিল আকার ধারণ করেছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি। মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা এক লাফে বেড়েছে প্রায় চার গুণ; একইসঙ্গে ঘটেছে চলতি বছরের মধ্যে এক দিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনাও।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও ২ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং নতুন করে ২২০ জনের শরীরে এই রোগ শনাক্ত হয়েছে, যেখানে এর আগের দিন আক্রান্তের সংখ্যা ছিল মাত্র ৬০ জন। এ নিয়ে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে আজ পর্যন্ত দেশব্যাপী মোট ৪ হাজার ৯০০ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হলেন এবং মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯ জনে।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট আক্রান্ত ও মৃত্যুর একটি বড় অংশই ঘটেছে চলতি জুন মাসে; এই মাসেই এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৭০৩ জন আক্রান্ত হয়েছেন এবং মারা গেছেন ৪ জন।
অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এ বছর ১ জানুয়ারি থেকে ২১ জুন পর্যন্ত দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ইতোমধ্যে ৫৮টি জেলাতেই ডেঙ্গুর প্রকোপ ছড়িয়ে পড়েছে। দেশের যে মাত্র ছয়টি জেলায় এখন পর্যন্ত কোনো ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়নি, সেগুলো হলো, ঢাকা বিভাগের শরীয়তপুর, সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার এবং রংপুর বিভাগের কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় জেলা।
গত ৭ জুন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) আয়োজিত ‘ডেঙ্গুর ক্লিনিক্যাল ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন ডেঙ্গু পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
এ সময় ডেঙ্গু মোকাবিলার কঠিন চ্যালেঞ্জ ও নিজের উদ্বেগ তুলে ধরে তিনি বলেন, আমি একদম আপনাদের কসম কেটে বলছি, আমি খুব নার্ভাস হয়ে গেছি। খুব দুর্বল হয়ে গেছি। আমি কীভাবে এটা ফাইট করব? প্রস্তুতি নিচ্ছি, কিন্তু চিকিৎসায় মৃত্যুর বিষয়ে আমার কোনো হাত নেই।
মন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, ডেঙ্গু এখন আর সাধারণ কোনো রোগ নয়; এটি পুরো জাতির জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। এই সংকট মোকাবিলা করা শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা হাসপাতালের একার দায়িত্ব নয়, বরং দেশের প্রত্যেক নাগরিককে এই প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত হতে হবে।
ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে একটি সমন্বিত যুদ্ধ আখ্যা দিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, দেশের প্রতিটি নালা-নর্দমা, ডোবা, জলাবদ্ধ এলাকা ও কচুরিপানায় ভরা স্থান পরিষ্কার না করলে এই যুদ্ধে জয়ী হওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। একক কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির পক্ষে এই সংকট মোকাবিলা করা অসম্ভব; এর জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ।
একই সঙ্গে তিনি হাসপাতালের চিকিৎসার পাশাপাশি মশক নিধন ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্বারোপ করেন।
এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার দাবি করা হলেও, বাস্তবে এখনো প্রতিদিন সহস্রাধিক শিশু এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আক্রান্তের তুলনায় মৃত্যুর সংখ্যা কিছুটা কমেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং নতুন করে ১ হাজার ৬৩ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
দেশব্যাপী শতভাগ টিকাদান কার্যক্রম ৬ সপ্তাহ আগে সম্পন্ন হওয়ার পরও হামে আক্রান্তের সংখ্যা আশানুরূপ না কমায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুশতাক হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, হাম এখনো দেশব্যাপী নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এর মধ্যে আবার সারা দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ ছড়িয়ে পড়াটা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়।
তিনি বলেন, সাধারণত জুলাই-আগস্ট মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি থাকে এবং বর্ষা শেষ হওয়ার পর আরও এক থেকে দেড় মাস পর্যন্ত এটি বাড়তে পারে। তবে সরকার যদি এখন থেকেই জোরালো কোনো কর্মসূচি গ্রহণ না করে, তাহলে ডেঙ্গুর এই প্রকোপ অক্টোবর মাসের পরও প্রলম্বিত হতে পারে। তাই সরকারকে অতিদ্রুত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে ডেঙ্গু পরীক্ষার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করতে হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা গেলে রোগী সংকটাপন্ন হওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাবে, যা মৃত্যুঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে আনবে।
তিনি আরও বলেন, হাম মোকাবিলায় যেভাবে সরকারের মধ্যে সমন্বয়হীনতা দেখা গেছে, ডেঙ্গুর ক্ষেত্রেও যদি একই পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাহলে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। তাই দ্রুত একটি সমন্বিত অপারেশন সেন্টার বা কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র গঠন করে দেশব্যাপী ডেঙ্গু মোকাবিলায় কাজ করা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও সময়মতো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে রোগনিয়ন্ত্রণ শাখা (সিডিসি), রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর), এমআইএস ও হাসপাতাল শাখার পরিচালকদের নিয়ে একটি সেল গঠন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, হাম পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এরই মধ্যে ডেঙ্গুর প্রকোপ মোকাবিলা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তবে ডেঙ্গু মোকাবিলায় সর্বোচ্চ প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। ইতোমধ্যে এক লাখ ব্যাগ স্যালাইন মজুত করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত ২ জুন সচিবালয়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধ, চিকিৎসা ও গাইডলাইন বিষয়ক এক বৈঠক শেষে গণমাধ্যমকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, দেশের বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোকে তাদের মোট শয্যার ১০ শতাংশ ডেঙ্গু রোগীদের জন্য সংরক্ষণ করতে বলা হয়েছে। এসব শয্যায় ভর্তি রোগীদের বেড ও চিকিৎসা ব্যয় সম্পূর্ণ মওকুফ করা হবে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যয়ের ৮০ শতাংশ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বহন করবে।
এমএল/এমএসএ
