দেশে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিভিন্ন সূচকে দৃশ্যমান অগ্রগতি হলেও বাল্যবিয়ে রোধে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসেনি। জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-এর (বিবিএস) সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, দেশে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের প্রায় ৪৭ দশমিক ২ শতাংশেরই বিয়ে হয়ে যাচ্ছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে।
উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই প্রবণতা কেবল দরিদ্র পরিবারেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং দেশের সবচেয়ে সচ্ছল ও ধনী পরিবারগুলোর মধ্যেও ৪২ শতাংশ মেয়ে বাল্যবিয়ের শিকার হচ্ছে। এর ফলে বিপুলসংখ্যক কিশোরীর শিক্ষাজীবন মাঝপথে থেমে যাওয়ার পাশাপাশি দেশে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে কিশোরী মাতৃত্ব ও স্বাস্থ্যঝুঁকি।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ১৮ বছরের আগে বিয়ে হওয়ার হার ছিল ৫১ দশমিক ৪ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে কিছুটা কমে ৪৭ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে বিপরীত চিত্র দেখা গেছে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে; এই বয়সসীমার বিবাহিত কিশোরীর হার ৩২ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশে। বর্তমানে বাল্যবিয়ের হার গ্রামীণ এলাকায় ৫৯ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলে প্রায় ৫০ শতাংশ।
সরকারি জরিপে এই চিত্র উঠে এলেও এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন বাল্যবিয়ে নিয়ে মাঠপর্যায়ে কর্মরত এনজিওকর্মী ও সমাজবিজ্ঞানীরা। তাদের মতে, বাস্তব পরিস্থিতি এই পরিসংখ্যানের চেয়েও আরও বেশি উদ্বেগজনক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ মাহবুব কায়সার বলেন, আমাদের সমাজে বাল্যবিয়ের হার বেড়েই চলছে। কিছুদিন আগে হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দেশে বাল্যবিয়ের হার ৬৭ শতাংশ পাওয়া গেছে। রিপোর্টে যেটি প্রকাশ করা হয়েছে আমি জানি না তারা কোন মেথডলজি ফলো করেছে, তবে আমাদের দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে বাল্যবিয়ের প্রকৃত চিত্র আরও বেশি হবে।

মেরি স্টোপস বাংলাদেশের ফান্ডরেইজিং অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি পার্টনারশিপের প্রধান মঞ্জুন নাহার বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে বাল্যবিয়ের হার ৫৬ শতাংশের বেশি। মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে আমরা যে বাস্তবতা দেখি, তাতে এই প্রবণতা নীরবে বেড়েই চলেছে।
সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের মধ্যে বাল্যবিয়ের হার ৬৫ শতাংশ। তবে শুধু দরিদ্র পরিবারেই নয়, সবচেয়ে সচ্ছল পরিবারের মধ্যেও ৪২ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই
বাল্যবিয়ের শিকার হওয়া কিশোরীদের শিক্ষাগত অবস্থার বিশ্লেষণে দেখা যায়, তাদের ৬৯ শতাংশের শিক্ষাজীবন বিয়ের কারণে বন্ধ হয়ে যায়। একইসঙ্গে জরিপে দেখা গেছে, উল্লেখযোগ্য অংশের শিক্ষা প্রাথমিক বা মাধ্যমিক স্তরেই থেমে যায়। ফলে বিপুলসংখ্যক মেয়ের শিক্ষাজীবন বিয়ের কারণে মাঝপথে শেষ হয়ে যাচ্ছে।

পরিবারের আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের মধ্যে বাল্যবিয়ের হার ৬৫ শতাংশ। তবে শুধু দরিদ্র পরিবারেই নয়, সবচেয়ে সচ্ছল পরিবারের মধ্যেও ৪২ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই।
জরিপে আরও দেখা যায়, বাল্যবিয়ের হার কিছুটা কমলেও কিশোরী বয়সে সন্তান জন্মদানের হার বেড়েছে। ২০১৯ সালে প্রতি এক হাজার ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোরীর মধ্যে জীবিত সন্তান জন্মদানের হার ছিল ৮৩। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯২-এ।
বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৮ বছরের আগে জীবিত সন্তান জন্মদানের হার সবচেয়ে বেশি রাজশাহী বিভাগে, ২৯ শতাংশ। আর সবচেয়ে কম সিলেট বিভাগে, ৯ শতাংশ।

সমাজবিজ্ঞানী মাহবুব কায়সার বলেন, একসময় দরিদ্র পরিবারে বাল্যবিয়ের আধিক্য দেখা গেলেও বর্তমানে সচ্ছল পরিবারেও এর হার বেড়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে সচ্ছল পরিবারে এ প্রবণতা বেশি। এর অন্যতম কারণ সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা। পাশাপাশি ধর্মীয় ও সামাজিক ট্যাগিংসহ নতুন আরও কিছু কারণ যুক্ত হয়েছে।
বর্তমান গতিতে বাল্যবিয়ের হার কমতে থাকলে বাংলাদেশে এ প্রথা পুরোপুরি বন্ধ হতে আরও ২০০ বছরের বেশি সময় লাগতে পারে
এমআইসিএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে প্রতি চারজন গ্রামীণ নারীর একজন এবং প্রতি পাঁচজন শহুরে নারীর একজন ১৮ বছর বয়সের আগেই প্রথম সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের ১৮ বছর বয়সের আগে মা হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে সচ্ছল পরিবারের মেয়েদের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি। গ্রামীণ এলাকা, দরিদ্র পরিবার এবং শুধু প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করা নারীদের মধ্যেই কিশোরী মাতৃত্বের হার সবচেয়ে বেশি। এ প্রতিবেদনে, অর্থনৈতিক চাপ, মৌলিক সেবার ঘাটতি এবং সামাজিক রীতিনীতি এখনও দেশে বাল্যবিয়ের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে বলে উল্লেখ করা হয়।
অন্যদিকে জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) মতে, বর্তমান গতিতে বাল্যবিয়ের হার কমতে থাকলে বাংলাদেশে এ প্রথা পুরোপুরি বন্ধ হতে আরও ২০০ বছরের বেশি সময় লাগতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাইনুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, বাল্যবিয়ে ও কিশোরী মাতৃত্ব উভয় ক্ষেত্রেই দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। এর ফলে আমরা জনমিতিক লভ্যাংশ (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) অর্জনের লক্ষ্য থেকে পিছিয়ে যাচ্ছি। পরিবার পরিকল্পনা এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
ড. মাইনুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে বাল্যবিয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া। সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অনেক অভিভাবক অল্প বয়সেই মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন। বাল্যবিয়ের নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে জানার পরও সামাজিক পরিস্থিতির কারণে তারা এ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন।
তিনি বলেন, সরকার বাল্যবিয়ে রোধে যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা যথেষ্ট নয়। জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (২০১৮-২০৩০) অনুযায়ী ২০২১ সালের মধ্যে ১৫ বছরের কম বয়সী কন্যাশিশুর বিয়ে নির্মূল এবং ১৮ বছরের কম বয়সী কন্যাশিশুর বিয়ে এক-তৃতীয়াংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ছিল। কিন্তু কোনো লক্ষ্যই অর্জিত হয়নি। কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৪১ সালের মধ্যে বাল্যবিয়ে শূন্যে নামিয়ে আনার কথা থাকলেও বর্তমান অগ্রগতির ধারা অব্যাহত থাকলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে না।
বাল্যবিয়ের কারণে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়ে বারডেম জেনারেল হাসপাতালের গাইনি ও প্রসূতি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. ফেরদৌসী বেগম বলেন, আমাদের কাছে গর্ভাবস্থায় অনেক অল্প বয়সী মেয়েরা আসে। তাদের অধিকাংশই অপুষ্টিতে ভোগে। মা অপুষ্টিতে থাকলে সন্তানও অপুষ্টি নিয়ে জন্মায়। এ ছাড়া মানসিকভাবে অপ্রস্তুত থাকায় তারা নানা জটিলতায় পড়ে। যে বয়সে তাদের খেলাধুলা করার কথা, সে বয়সেই সন্তান লালন-পালনের দায়িত্ব নিতে হচ্ছে। অনেকের কাছেই জানতে চাইলে তারা বলেন, প্রেম করে বিয়ে হয়েছে অথবা নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে পরিবার অল্প বয়সেই বিয়ে দিয়েছে।
এমএল/এমএসএ
