চট্টগ্রামে দীর্ঘমেয়াদি অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে শুধু ওষুধনির্ভর চিকিৎসা নয়, রোগের মূল কারণ শনাক্ত করে খাদ্যাভ্যাস ও জীবনধারায় পরিবর্তন আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এ লক্ষ্যেই নগরে আমেরিকান ওয়েলনেস সেন্টারের নতুন শাখার উদ্বোধন এবং একটি স্বাস্থ্যবিষয়ক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শনিবার (১৮ জুলাই) নগরের ষোলশহরের এলজিইডি ভবনে আমেরিকান ওয়েলনেস সেন্টারের উদ্যোগে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে দীর্ঘমেয়াদি রোগ প্রতিরোধ, সঠিক খাদ্যাভ্যাস, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং সমন্বিত চিকিৎসার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়।
সেমিনারে প্রধান বক্তা ছিলেন বাংলাদেশি-আমেরিকান চিকিৎসা গবেষক, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির ইন্টিগ্রেটিভ মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক, দ্য সেন্টার অব ইন্টিগ্রেটিভ মেডিসিন, ইউএসএ-এর কনসালট্যান্ট এবং আমেরিকান ওয়েলনেস সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা প্রফেসর ড. মজিবুল হক। বিশেষ অতিথি ছিলেন চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আমেরিকান ওয়েলনেস সেন্টারের চেয়ারম্যান মাহাবুবুর রহমান।
সেমিনারে প্রফেসর ড. মজিবুল হক বলেন, বর্তমানে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি রোগ, স্থূলতাসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগ দ্রুত বাড়ছে। এসব রোগের পেছনে বংশগত কারণের পাশাপাশি অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত চিনি, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, মানসিক চাপ, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তিনি বলেন, রোগকে শুধু একটি উপসর্গ বা একটি অঙ্গের সমস্যা হিসেবে দেখলে কার্যকর সমাধান পাওয়া কঠিন। রোগের পেছনে থাকা খাদ্যাভ্যাস, বিপাকীয় সমস্যা, দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ, অন্ত্রের ভারসাম্যহীনতা, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স এবং জীবনযাপনের ভুল অভ্যাসগুলো চিহ্নিত করে চিকিৎসা দিতে হবে।
খাদ্যাভ্যাস বিষয়ে তিনি অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার, কোমল পানীয়, অতিরিক্ত ভাজাপোড়া, ট্রান্স ফ্যাট ও অতিরিক্ত চিনি পরিহারের পরামর্শ দেন। এর পরিবর্তে মৌসুমি ফল, শাকসবজি, মানসম্মত প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর চর্বি এবং প্রাকৃতিক খাবার গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
ডায়াবেটিস সম্পর্কে তিনি বলেন, টাইপ-২ ডায়াবেটিসকে শুধু রক্তে শর্করার সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি শরীরের বিপাকীয় ব্যবস্থার একটি জটিল পরিবর্তনের ফল। তাই ওষুধের পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম, ওজন নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ কমানোর বিষয়গুলোও চিকিৎসার অংশ হওয়া উচিত।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, ঘুমের ঘাটতি ও অনিয়মিত জীবনযাপন শরীরে প্রদাহ বাড়ায়। এই প্রদাহ দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, হরমোনজনিত সমস্যা, হজমের জটিলতা ও অন্যান্য রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। সুস্থতার জন্য নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত পানি পান, সঠিক ঘুম, শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন এবং মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখা প্রয়োজন।
দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার জন্য পাঁচটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সুষম খাদ্যাভ্যাস, স্বাস্থ্যকর জীবনধারা, বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসা, শরীরের স্বাভাবিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে সহায়তা করা এবং মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখা—এই পাঁচটি বিষয় সুস্থ জীবনের ভিত্তি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, চট্টগ্রামে প্রায় দুই কোটি মানুষের বিপরীতে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে হাসপাতালের শয্যা রয়েছে মাত্র প্রায় ১০ হাজার। তাই চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণের পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) সফল বাস্তবায়নের ফলে সংক্রামক রোগ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে এলেও বর্তমানে অধিকাংশ মানুষ ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও ক্যানসারের মতো অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছেন। এসব রোগের একটি বড় অংশ সচেতনতা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনধারার পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, এ ধরনের স্বাস্থ্যবিষয়ক সেমিনার মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মানুষকে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মাধ্যমে কীভাবে রোগের ঝুঁকি কমিয়ে দীর্ঘদিন সুস্থ থাকা যায়, সে বিষয়ে জানাতে আমেরিকান ওয়েলনেস সেন্টারের মতো প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন।
সেমিনারের উন্মুক্ত প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশগ্রহণকারীরা খাদ্যাভ্যাস, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, অটিজম, অন্ত্রের স্বাস্থ্য, দীর্ঘমেয়াদি রোগ প্রতিরোধ, সমন্বিত চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনধারা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন। জবাবে প্রফেসর ড. মজিবুল হক বৈজ্ঞানিক তথ্য ও গবেষণালব্ধ প্রমাণের আলোকে অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন এবং রোগ প্রতিরোধে সচেতনতা, সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যকর জীবনধারা অনুসরণের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
এমআর/এসএম
