বাংলাদেশে হেপাটাইটিস বা লিভারের নানা জটিলতা বর্তমানে জনস্বাস্থ্য খাতের অন্যতম বড় উদ্বেগের বিষয়। বিশেষ করে হেপাটাইটিস বি ও সি-কে চিকিৎসা বিজ্ঞানে নীরব ঘাতক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
দেশের সার্বিক হেপাটাইটিস পরিস্থিতি, এটি ছড়ানোর কারণ, কুসংস্কার এবং এর প্রতিকার নিয়ে সম্প্রতি ঢাকা পোস্টের সঙ্গে আলাপ করেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় লিভার রোগ বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের হেপাটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ও হেপাটোলজি সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক মো. শাহিনুল আলম। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ঢাকা পোস্টের নিজস্ব প্রতিবেদক মাহতাব লিমন।
ঢাকা পোস্ট : বাংলাদেশে বর্তমানে হেপাটাইটিস রোগীদের সংখ্যা কেমন, এটা কি ধীরে ধীরে বাড়ছে? হেপাটাইটিসকে কেন নীরব ঘাতক বা সাইলেন্ট কিলার বলা হয়?
ডা. শাহিনুল আলম : আন্তর্জাতিক হেপাটাইটিস দিবস বা অন্যান্য সচেতনতামূলক কার্যক্রমে হেপাটাইটিস বি ও সি-কে প্রধান লাইমলাইটে রাখা হলেও এর পাশাপাশি এ, ই ও ডি ভাইরাস নিয়েও আমাদের কাজ করতে হয়। তবে মূলত বি ও সি ভাইরাসের পরিধিটাই সবচেয়ে বড়। বর্তমানে বাংলাদেশে হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি। এর মধ্যে প্রায় ৮৫ লাখ হেপাটাইটিস বি এবং হেপাটাইটিস সি ভাইরাসে ১৫ লাখ মানুষ আক্রান্ত। হেপাটাইটিস বি আক্রান্তদের বড় একটি অংশ পুরুষ। আক্রান্তের এই সংখ্যাটি কিন্তু আমাদের দেশে ক্রমান্বয়ে কমছে।

অতীতে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, আমাদের দেশে এর প্রাদুর্ভাব প্রায় ৯% ছিল, যা পরবর্তীতে ২০১৮ সালের দেশব্যাপী স্টাডিতে কমে ৫.১%-এ নেমে আসে। বর্তমানে শিশুদের মধ্যে প্রায় ৪ লাখ শিশু এই ভাইরাসে আক্রান্ত। আমাদের ইম্প্যাক্টফুল টিকাদান কর্মসূচির (EPI) কাভারেজ প্রায় ৯৫% হওয়ায় প্রায় সব শিশুই এখন টিকার আওতায় আসছে। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, এই হার ৫.১% থেকে আরও কমে বর্তমানে ৩ বা ৪ শতাংশের কাছাকাছি নেমে এসেছে এবং ভবিষ্যতে এটি আরও কমবে বলে আমরা আশাবাদী।
আর এটিকে নীরব ঘাতক বলার মূল কারণ হলো- এই রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো দৃশ্যমান লক্ষণ বা শারীরিক কষ্ট থাকে না। সারা পৃথিবীতে এবং আমাদের দেশেও আক্রান্তদের প্রায় ৯০% মানুষই জানে না যে তাদের শরীরে হেপাটাইটিস ভাইরাস রয়েছে। রোগটি যখন বহু বছর ধরে নীরবে লিভারের ক্ষতি করতে করতে শেষ পর্যায়ে পৌঁছে, তখন লিভার সিরোসিস বা লিভার ক্যান্সারের লক্ষণ প্রকাশ পায়। তার আগে রোগীরা বুঝতেই পারেন না। এই কারণেই সচেতনতা তৈরি, পরীক্ষা এবং সময়মতো টিকা দেওয়ার ওপর বারবার জোর দেওয়া হয়।
ঢাকা পোস্ট : হেপাটাইটিস বি ও সি মূলত কীভাবে ছড়ায়? সমাজে তো এ নিয়ে নানা কথা শোনা যায়।
ডা. শাহিনুল আলম : হেপাটাইটিস বি আমাদের দেশে মূলত প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে মায়ের কাছ থেকে শিশুদের মধ্যে সংক্রমিত হয়। যেহেতু এটি মায়ের মাধ্যমে ছড়ায়, সে কারণে দেখা যায় একটি পরিবারের একাধিক সদস্য যেমন ভাই, বোন, মা, খালা বা নানির শরীরে এই ভাইরাস রয়েছে। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে তাই অনেক সময় এটিকে পারিবারিক বা বংশগত রোগের মতো মনে হয়। অন্যদিকে, হেপাটাইটিস সি ভাইরাস ছড়ানোর প্রধান মাধ্যম হলো রক্ত বা রক্তজাত দ্রব্য গ্রহণ, ডায়ালাইসিস এবং ঝুঁকিপূর্ণ চিকিৎসা বা অপারেশন। অতীতে সেলুনে একই ক্ষুর বা ব্লেড দিয়ে সবার দাড়ি ও চুল কাটাকেও এর একটি অন্যতম উৎস বলে ধরা হতো। এছাড়া বর্তমানে ডায়ালাইসিস সেন্টার এবং ইনজেকশনের মাধ্যমে যারা ড্রাগ বা নেশা নেন, তাদের মধ্যেও হেপাটাইটিস সি-এর ক্লাস্টার বা প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করা যায়।
ঢাকা পোস্ট : এই রোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় কী এবং কাদের পরীক্ষা করা উচিত?
ডা. শাহিনুল আলম : প্রতিরোধের প্রধান উপায়গুলো হলো- শিশুদের জন্য নির্ধারিত ইপিআই টিকার আওতায় বি ভাইরাসের টিকা শতভাগ নিশ্চিত করা। পরিবারের কোনো একজনের হেপাটাইটিস বি ধরা পড়লে স্বামী-স্ত্রী, ভাই-বোন, মামা ও খালার মতো পরিবারের সব ঘনিষ্ঠ সদস্যকে অবশ্যই পরীক্ষা করাতে হবে। বাংলাদেশে প্রায় ১৫ লাখ এমন পরিবার রয়েছে। যাদের অতীতে অপারেশন হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে লিভারের প্রদাহের কারণে এসজিপিটি (SGPT) বেশি রয়েছে, কখনো রক্ত বা রক্তজাত দ্রব্য নেওয়া হয়েছে কিংবা ডেন্টাল প্রসিডিউর বা দন্তচিকিৎসা করেছেন তাদের প্রত্যেকেরই হেপাটাইটিস বি ও সি পরীক্ষা করা উচিত।
ঢাকা পোস্ট : হেপাটাইটিস নিয়ে আমাদের সমাজে কী ধরনের ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে?
ডা. শাহিনুল আলম : আমাদের সমাজে এ নিয়ে প্রচুর কুসংস্কার ও ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। এমনকি বাংলায় ‘লিভার’ শব্দের সঠিক পরিভাষা নিয়ে এখনো মানুষের মধ্যে ধোঁয়াশা আছে। ‘কলিজার টুকরা’ বলতে আমরা হার্ট বা হৃদয়কে বুঝলেও খাওয়ার সময় ‘কলিজা’ বলতে লিভারকেই বুঝি। সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে, জন্ডিস বা লিভারের রোগের কোনো বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা নেই; এর জন্য অবৈজ্ঞানিক উপায়, গলায় মালা পরা কিংবা লতাপাতা খাওয়ার প্রয়োজন হয়। জ্ঞানের অভাবেই মূলত এসব কুসংস্কারের জন্ম হয়। অথচ লিভার রোগীর সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা রয়েছে। হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস প্রতিরোধযোগ্য, এটি নিরাময়যোগ্য এবং এর সমস্ত আধুনিক চিকিৎসা আজ বাংলাদেশে পুরোপুরি বিদ্যমান।
আরও পড়ুন
ঢাকা পোস্ট : হেপাটাইটিস-এ ও ই যেটি মূলত দূষিত পানি ও স্ট্রিট ফুডের মাধ্যমে ছড়ায়, সেটির বর্তমান পরিস্থিতি কেমন?
ডা. শাহিনুল আলম : হেপাটাইটিস-এ ও ই হলো আমাদের দেশের সেই ঐতিহাসিক জন্ডিস, যাকে আমরা বৈজ্ঞানিক ভাষায় ‘এক্যুট ভাইরাল হেপাটাইটিস’ বলে থাকি। বি ও সি নিয়ে বেশি আলোচনা হলেও-এ ও ই ভাইরাসের মাধ্যমে দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর মাসে অর্থাৎ বর্ষাকালে সুয়ারেজ লাইন ও পানির পাইপ লিক হয়ে পানি দূষিত হওয়ার কারণে এর প্রকোপ বহুগুণ বেড়ে যায়। চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশন এলাকায় অতীতে এর বড় প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বড়দের মধ্যেও অনাকঙ্ক্ষিতভাবে ‘এ’ ভাইরাসের প্রবণতা এবং এর ফলে মৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়া আমাদের জন্য উদ্বেগের। এমনকি সেলিব্রিটি বা পরিচিত মুখও এর শিকার হয়ে লিভার ফেইলিওরে মারা গেছেন। এটি থেকে বাঁচতে ব্যক্তিগত পর্যায়ে বিশুদ্ধ পানি পান ও খাবার গ্রহণের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সুপেয় পানির সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং কড়া নজরদারি বা সার্ভিলেন্স অত্যন্ত জরুরি।

ঢাকা পোস্ট : শিশুরা টিকা পাওয়ার পরেও কেন লিভারের জটিলতায় আক্রান্ত হতে পারে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা এক্ষেত্রে কী?
ডা. শাহিনুল আলম : বি ভাইরাসের টিকার কার্যকারিতা প্রায় ৯০% বা তার বেশি। তবে আমাদের দেশে টিকাদানের ক্ষেত্রে একটি বৈজ্ঞানিক গ্যাপ রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং অধিকাংশ দেশ জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই বা প্রথম ৭ দিনের মধ্যে টিকা দেওয়ার সুপারিশ করে, কারণ মায়ের শরীর থেকে শিশুর দেহে জন্মের পরপরই ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। আমাদের দেশে ইপিআই টিকা ৬, ১০ ও ১৪ সপ্তাহে দেওয়া হয়। তবে যেসব মায়ের হেপাটাইটিস বি পজিটিভ রয়েছে, তাদের সন্তানদের জন্মলগ্নে টিকা দেওয়ার পাশাপাশি তা সফলভাবে কাজ করেছে কি না, তা পরীক্ষা করা এবং প্রয়োজনে গাইডলাইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আমাদের পলিসিতেও এই জন্মলগ্নের টিকাদানকে সার্বজনীনভাবে যুক্ত করার প্রচেষ্টা চলছে।
ঢাকা পোস্ট : অনেক সময় দেখা যায় রোগীরা জন্ডিস ভালো হওয়ার পরেও দীর্ঘদিন দুর্বলতা বা ক্লান্তি অনুভব করেন। এ বিষয়ে আপনার পরামর্শ কী থাকবে?
ডা. শাহিনুল আলম : জন্ডিস বা এক্যুট ভাইরাল হেপাটাইটিস থেকে সেরে ওঠার পর কিছুদিন শারীরিক দুর্বলতা থাকাটা খুব স্বাভাবিক। কারণ লিভার আমাদের শরীরের মূল মেটাবলিক অর্গান বা বিপাকীয় অঙ্গ। লিভার যখন নিজেই অসুস্থ থাকে এবং পরবর্তীতে রিকভার করতে থাকে, তখন শরীরে এনার্জি বা শক্তির ঘাটতি দেখা দেয়। এর জন্য কোনো অতিরিক্ত ওষুধ সেবনের প্রয়োজন নেই। রোগীকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে, সুষম ও সহজে হজম হয় এমন পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। এছাড়া চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পর লিভারের এনজাইম বা ফাংশন পরীক্ষা করে দেখতে হবে যে লিভার পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরেছে কি না।
ঢাকা পোস্ট : ইপিআই টিকার বাইরে থাকা ২০-২৫ বছরের বেশি বয়সের মানুষের জন্য করণীয় কী এবং ২০৩০ সালের মধ্যে এটি নির্মূলের রূপরেখা কেমন হওয়া দরকার?
ডা. শাহিনুল আলম : টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে আমরা হেপাটাইটিস বি ও সি নির্মূল করতে চাই। এর জন্য প্রয়োজন মাস টেস্টিং এবং মাস অ্যাওয়ারনেস। মিশর ও তাইওয়ান যেভাবে জাতীয় পর্যায়ে ন্যাশনাল আইডি কার্ডের মাধ্যমে প্রত্যেক নাগরিকের পরীক্ষা নিশ্চিত করে সফলতা পেয়েছে, আমাদের দেশেও ঠিক সেভাবে কাজ করা সম্ভব। বিশেষ করে ২৫ বছরের বেশি বয়সের নাগরিকদের প্রায়োরিটি বেসিসে ন্যাশনাল আইডি ভিত্তিক বি ও সি ভাইরাসের পরীক্ষা এবং আক্রান্তদের চিকিৎসায় নিয়ে আসার ব্যবস্থা করতে পারলে খুব অল্প খরচে ২০৩০ সালের মধ্যেই বাংলাদেশ থেকে এই ভাইরাস নির্মূল করা সম্ভব।
ঢাকা পোস্ট : মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
ডা. শাহিনুল আলম : আপনাকে এবং আপনার সংবাদমাধ্যমকেও ধন্যবাদ।
এমএল/এমএন
