বিজ্ঞাপন

জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা নিতে পদে পদে ভোগান্তি

জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা নিতে পদে পদে ভোগান্তি

ভোর সাড়ে পাঁচটা। রাজধানীর জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের মূল ফটক তখনও খোলেনি, কিন্তু বাইরে ইতোমধ্যে অপেক্ষা করছেন শত শত রোগী ও তাদের স্বজন। দেশের দূর-দূরান্ত থেকে আসা এই মানুষগুলোর কেউ হুইলচেয়ারে, কেউ লাঠিতে ভর দিয়ে, আবার কেউ স্বজনের কাঁধে ভর করে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন। সবার লক্ষ্য একটাই, মাত্র ১০ টাকার টিকিট সংগ্রহ করে চিকিৎসকের কাছে পৌঁছানো।

সকাল সাড়ে সাতটায় ফটক খোলামাত্রই শুরু হয় টিকিট কাউন্টারের দিকে ছোটোছুটি। তবে ভোগান্তির এখানেই শেষ নয়; টিকিট পাওয়ার পর চিকিৎসকের সাক্ষাৎ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং পরবর্তীতে রিপোর্ট সংগ্রহ, প্রতিটি ধাপেই পেরোতে হয় দীর্ঘ অপেক্ষার প্রহর। এমনকি একই দিনে পরীক্ষা করিয়েও রিপোর্ট হাতে না পাওয়ায় একটি চিকিৎসা প্রক্রিয়া শেষ করতে রোগীদের বারবার হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে। 

বুধবার (২৯ জুলাই) হাসপাতালটিতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, টিকিট কাউন্টার থেকে শুরু করে চিকিৎসকের কক্ষ, ইসিজি, রক্ত পরীক্ষা ও রিপোর্ট সংগ্রহের স্থান; প্রায় প্রতিটি সেবাকেন্দ্রেই উপচে পড়া ভিড়। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়া বয়স্ক ও শারীরিকভাবে দুর্বল রোগীরা করিডোর বা মেঝেতেই বসে পড়েছেন। অনেকেই আবার স্বজনদের সহায়তায় এক বিভাগ থেকে অন্য বিভাগে যাচ্ছেন। 

গাজীপুরের টঙ্গী থেকে ৭৫ বছর বয়সী অসুস্থ বাবা আফজালকে নিয়ে বুধবার ভোর সাড়ে পাঁচটার আগেই হাসপাতালে পৌঁছান গার্মেন্টসকর্মী রকিবুল আহসান। তিনি জানান, ভোরে এসেও টিকিট পেতে পেতে সকাল ৯টা ২০ মিনিট বেজে যায়। এরপর চিকিৎসকের সিরিয়াল ও ইসিজি পরীক্ষার দীর্ঘ লাইন পেরোলেও শেষ পর্যন্ত ওই দিন আর রিপোর্ট হাতে পাননি। 

তিনি বলেন, বাবা অনেক অসুস্থ, তাকে নিয়ে বারবার হাসপাতালে আসা খুবই কষ্টের। কাল আবার রিপোর্ট নিতে আসতে হবে, তারপর ডাক্তার দেখাতে হবে।

একই ধরনের ভোগান্তির কথা জানান সাভার থেকে আসা রাবেয়া বেগম। ৭০ বছর বয়সী মা হালিমা খাতুনকে নিয়ে নির্ধারিত তারিখে হাসপাতালে এসেছিলেন তিনি। চিকিৎসক ইসিজি করতে বললে শুধু কাগজ জমা দিতেই পার হয়ে যায় ৪০ মিনিট, আর পরীক্ষা করাতে লাগে আরও তিন ঘণ্টা। কিন্তু দিনশেষে রিপোর্ট না পাওয়ায় তাকে পরদিন আবার রিপোর্ট সংগ্রহ করতে আসতে হবে। এরপর আগামী রোববার ডাক্তারের কাছে রিপোর্ট দেখানোর পর, কপাল ভালো থাকলে মিলবে অপারেশনের তারিখ।

অন্যদিকে, ডেমরা থেকে আসা মাহমুদুল হাসান জানান তার মায়ের ছানি অপারেশনের দীর্ঘ অপেক্ষার কথা। গত সাড়ে তিন মাস ধরে হাসপাতালে আসা-যাওয়া করতে গিয়ে ইতোমধ্যে দুইবার ইসিজি করাতে হয়েছে তাদের। তিনি জানান, আগামী সাত সপ্তাহের মধ্যে নির্ধারিত দিনে যদি ডাক্তার দেখাতে না পারেন, তবে পুরো প্রক্রিয়া আবারও নতুন করে শুরু করতে হবে। 

সপ্তাহে ছয় দিন বহির্বিভাগে রোগী সেবা দেওয়া হয়। মাত্র ১০ টাকার টিকিটে একজন রোগী পুরো এক বছর চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ পান। এই সুযোগের কারণে প্রতিদিন গড়ে তিন হাজারের বেশি নতুন এবং প্রায় দুই হাজার পুরোনো রোগীর ঢল নামে হাসপাতালটিতে

ক্ষোভের সঙ্গে তিনি বলেন, এখানে চিকিৎসা নিতে হলে অনেক ধৈর্য লাগে। একটি সাধারণ ছানি অপারেশন করাতেই মাসের পর মাস পার হয়ে যাচ্ছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, সপ্তাহে ছয় দিন বহির্বিভাগে রোগী সেবা দেওয়া হয়। মাত্র ১০ টাকার টিকিটে একজন রোগী পুরো এক বছর চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ পান। এই সুযোগের কারণে প্রতিদিন গড়ে তিন হাজারের বেশি নতুন এবং প্রায় দুই হাজার পুরোনো রোগীর ঢল নামে হাসপাতালটিতে। বিপুল পরিমাণ এই রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে একেকজন চিকিৎসককে দৈনিক গড়ে ১২০ থেকে ১৫০ জন পর্যন্ত রোগী দেখতে হয়।

দীর্ঘ অপেক্ষার দুর্ভোগের পাশাপাশি হাসপাতালের সিরিয়াল ব্যবস্থাপনা নিয়েও রোগীদের ক্ষোভ রয়েছে। মোহাম্মদ ইউনূস আলী নামে এক রোগী অভিযোগ করেন, দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলেও প্রায়ই নিয়ম ভেঙে অন্য রোগীদের ফাইল চিকিৎসকের কক্ষে আগে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আনসার সদস্য কিংবা হাসপাতালের কর্মচারীদের পরিচয়ে অনেকেই দ্রুত সেবা পান বলেও অভিযোগ তার। তবে এ ধরনের স্বজনপ্রীতির অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. রেজওয়ানুর রহমান সোহেল বলেন, এটি দেশের একমাত্র ২৫০ শয্যার তৃতীয় স্তরের বিশেষায়িত চক্ষু হাসপাতাল। এখানে ২৪ ঘণ্টা জরুরি সেবার পাশাপাশি প্রতিদিন কয়েক হাজার রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসেন। কিন্তু হাসপাতালের জনবল ও অবকাঠামো এখনো ২৫০ শয্যার উপযোগী। ফলে নির্ধারিত সক্ষমতার তুলনায় ১০ থেকে ১৫ গুণ বেশি রোগীর চাপ সামাল দিতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, মাত্র ১০ টাকার টিকিটে রোগীরা সারা বছর চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারেন। প্রয়োজনীয় ওষুধ, বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ছানি অপারেশনের লেন্স এবং ব্যয়বহুল রেটিনার অ্যান্টি-ভিইজিএফ ইনজেকশনও বিনামূল্যে দেওয়া হয়। এসব কারণে এখানে রোগীদের ভিড় মাত্রাতিরিক্ত।

ইসিজি রিপোর্ট পেতে বিলম্বের বিষয়ে ডা. রেজওয়ানুর রহমান সোহেল বলেন, প্রতিদিন প্রায় ২০০টি ইসিজি করা হয়। অধিকাংশ রোগী বয়স্ক হওয়ায় তাদের অনেকের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ কিংবা রক্ত পাতলা করার ওষুধ সেবনের ইতিহাস থাকে। রোগীর নিরাপত্তার স্বার্থে অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত পরীক্ষা বা নির্দিষ্ট সময় পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হয়। সে কারণেই কিছু রিপোর্ট দিতে সময় লাগে।

সিরিয়াল ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের জন্য সীমিতসংখ্যক রোগী দেখার একটি অনুমোদিত ব্যবস্থা রয়েছে। এটি অনেক সময় সাধারণ রোগীদের কাছে সিরিয়াল ভঙ্গের মতো মনে হতে পারে। তবে কোনো ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের জিরো টলারেন্স নীতি রয়েছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

উপ-পরিচালক আরও বলেন, সাধারণ চোখের সমস্যার রোগীরাও সরাসরি এই বিশেষায়িত হাসপাতালে চলে আসেন। জেলা হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজে কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা চালু হলে এ হাসপাতালের ওপর চাপ অনেকটাই কমবে। একইসঙ্গে রোগীর ক্রমবর্ধমান চাপ সামাল দিতে হাসপাতালটিকে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করার লক্ষ্যে ১০ তলা নতুন ভবন নির্মাণের কাজ চলছে।

এ বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালকের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তিনি কথা বলতে রাজি হননি।

এমএল/এমএসএ