দেশে চলমান হামের প্রাদুর্ভাবে ভাইরাসটির এমন কোনো নতুন জেনেটিক পরিবর্তনের প্রমাণ মেলেনি, যা বিদ্যমান টিকার সুরক্ষাকে এড়িয়ে যেতে পারে। এছাড়া দুই ডোজ টিকা নেওয়া শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার হার তুলনামূলক অনেক কম, আর সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে টিকার নির্ধারিত বয়স না হওয়া ৯ মাসের কম বয়সী শিশুরা।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) এবং বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের যৌথ এক প্রাথমিক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। চলতি বছরের ২০ এপ্রিল থেকে ২১ মে পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ১৪ বছর বা তার কম বয়সী ৩৪১ শিশুকে নিয়ে গবেষণাটি পরিচালিত হয়।
গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চলমান প্রাদুর্ভাবের তীব্রতার কারণে ভাইরাসের রূপ পরিবর্তন ও ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা কমে যাওয়া নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হলেও গবেষণায় এর কোনো প্রমাণ মেলেনি। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৩৪১ শিশুকে বয়স ও টিকাদানের ভিত্তিতে চারটি দলে ভাগ করে দেখা যায়, টিকা পাওয়ার বয়স না হওয়া ৯ মাসের কম বয়সী ১৪৬ শিশুর মধ্যে ১৪২ জনই (৯৭ শতাংশ) হামে আক্রান্ত হয়েছে।
একইভাবে, টিকার বয়স হলেও এক ডোজও না পাওয়া ১২৬ শিশুর মধ্যে ১২২ জনের (৯৭ শতাংশ) হাম শনাক্ত হয়। অপরদিকে, এক ডোজ টিকা নেওয়া ৪৮ শিশুর মধ্যে ৪৪ জন (৯২ শতাংশ) এবং দুই ডোজ সম্পূর্ণ করা ২১ শিশুর মধ্যে ১৬ জন (৭৬ শতাংশ) আক্রান্ত হয়েছে।
গবেষকরা জানিয়েছেন, দুই ডোজ টিকা নেওয়া শিশুদের আক্রান্তের হার ৭৬ শতাংশে নেমে আসা টিকার সুরক্ষামূলক ক্ষমতারই বড় প্রমাণ।
আইসিডিডিআর,বির সংক্রামক রোগ বিভাগের ভাইরোলজি ল্যাবরেটরির সহযোগী বিজ্ঞানী ডা. নূরজাহান মালিহা বলেন, প্রাদুর্ভাবের বিশাল আকারের কারণে ভ্যাকসিন এখনো কাজ করছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে গবেষণায় ভাইরাসটি ভ্যাকসিনের সুরক্ষা এড়িয়ে গেছে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। দুই ডোজ টিকা পাওয়া শিশুদের মধ্যে আক্রান্তের হার কম দেখা গেছে।
তবে তিনি এও জানিয়েছেন, হাসপাতাল ভিত্তিক এই গবেষণা থেকে পুরো জনগোষ্ঠীর জন্য ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

গবেষকেরা জানিয়েছেন, পূর্ণাঙ্গ টিকা নেওয়ার পরও ১৬ শিশুর আক্রান্ত হওয়ার কারণ অনুসন্ধান প্রয়োজন। সম্ভাব্য কারণের মধ্যে রয়েছে টিকার পর পর্যাপ্ত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি না হওয়া, সময়ের সঙ্গে অ্যান্টিবডির মাত্রা কমে যাওয়া, পুষ্টিহীনতা বা অন্যান্য ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যগত কারণ। তবে এই গবেষণা এসব কারণ নির্ধারণের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়নি।
গবেষণার অংশ হিসেবে আইসিডিডিআর,বি ও রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) যৌথভাবে ৫৫টি হোল-জিনোম সিকোয়েন্স বিশ্লেষণ করেছে। এর মধ্যে ১৮টি আইসিডিডিআর,বি এবং ৩৭টি আইইডিসিআর সম্পন্ন করেছে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সব ভাইরাসই বি৩ সাবক্লেডের অন্তর্ভুক্ত এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশে পাওয়া বি৩ ভাইরাসের সঙ্গে এদের মিল রয়েছে। গবেষকেরা ভাইরাসের ‘এইচ’ প্রোটিনে চারটি মিউটেশন শনাক্ত করেছেন। তবে এসব পরিবর্তন নতুন নয় এবং আগে অন্যান্য দেশেও শনাক্ত হয়েছিল।
গবেষকদের মতে, এসব মিউটেশন থাকলেই ভাইরাস ভ্যাকসিন-প্রতিরোধী হয়ে গেছে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। কারণ হাম এখনো একটি একক সেরোটাইপের ভাইরাস এবং ভ্যাকসিনের মাধ্যমে তৈরি অ্যান্টিবডি ভাইরাসের একাধিক অংশ শনাক্ত করতে সক্ষম। এসব পরিবর্তনের কার্যকর প্রভাব রয়েছে কি না, তা জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ৯ মাস বয়সের আগে শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। বাংলাদেশে হাম-রুবেলা টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হয় ৯ মাসে এবং দ্বিতীয় ডোজ ১৫ মাসে। এর আগে শিশুরা মূলত মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডি এবং সমাজে বিদ্যমান সমষ্টিগত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল থাকে।
আইসিডিডিআর,বির আগের একটি জন্ম-কোহর্ট গবেষণার সংরক্ষিত নমুনার প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জীবনের প্রথম কয়েক মাসেই মায়ের কাছ থেকে পাওয়া হামের অ্যান্টিবডি দ্রুত কমে যায়। বিশ্লেষণে অন্তর্ভুক্ত ১৬ জোড়া মা-শিশুর মধ্যে ৩ থেকে ৮ মাস বয়সী শিশুদের কারও শরীরে সুরক্ষামূলক অ্যান্টিবডি পাওয়া যায়নি। তবে নমুনা ছোট হওয়ায় এ বিষয়ে আরও বড় পরিসরে গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
আইসিডিডিআর,বির সংক্রামক রোগ বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরিচালক ডা. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, হাম প্রতিরোধে এবং জটিল রোগের ঝুঁকি কমাতে টিকাদানই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। তবে জাতীয়ভাবে টিকাদানের হার তুলনামূলক বেশি থাকা সত্ত্বেও কেন এত বড় প্রাদুর্ভাব দেখা দিল, সেটি খুঁজে বের করা জরুরি।

ভাইরোলজি ল্যাবরেটরির সহকারী বিজ্ঞানী ডা. কামরুন নাহার বলেন, কোন শিশুরা টিকা থেকে বাদ পড়ছে এবং জাতীয় কভারেজের আড়ালে কোনো জনগোষ্ঠীতে বড় ধরনের রোগপ্রতিরোধ ঘাটতি রয়েছে কি না, তা অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। এসব তথ্য ভবিষ্যতে টিকাদান কৌশল আরও কার্যকর করতে সহায়তা করবে।
বর্তমান প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় আইসিডিডিআর,বি চারটি বিভাগীয় হাসপাতালে ক্লিনিক্যাল কোহর্ট গবেষণা শুরু করেছে। পাশাপাশি ল্যাবরেটরি ও জিনোমিক নজরদারি, সম্প্রসারিত জন্ম-কোহর্ট ইমিউনোলজি গবেষণা, হামের চিকিৎসায় জিংকের ব্যবহার নিয়ে পাইলট গবেষণা এবং শিশুরা কেন টিকা থেকে বাদ পড়ছে, সে বিষয়ে মাঠপর্যায়ের গবেষণাও চলছে।
গবেষকেরা অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, শিশুদের টিকাদানে কোনো ধরনের বিলম্ব বা অনীহা দেখানো উচিত নয়। নির্ধারিত বয়স অনুযায়ী হাম-রুবেলা টিকার সব ডোজ নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রাদুর্ভাবের সময় সরকারের টিকাদান–সংক্রান্ত নির্দেশনা মেনে চলা প্রয়োজন।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত দেশে ১ লাখ ২২ হাজার ৭৬৩ জন সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ১৫ হাজার ২৭২ জনের সংক্রমণ পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া গেছে। একই সময়ে হামে আক্রান্ত হয়ে ৯৫ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করার পাশাপাশি আরও ৭২১টি সন্দেহভাজন মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে।
এমএল/এমএসএ
