কপার-টি হলো একটি দীর্ঘমেয়াদি ও অস্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি। তবে এটি থাকা মানেই গর্ভধারণের সম্ভাবনা শূন্য, এমনটা নয়। সম্ভাবনা অত্যন্ত কম হলেও কখনো কখনো কপার-টি ব্যবহারকারীরও প্রেগন্যান্সি টেস্ট পজিটিভ হতে পারে। আর তখন ভয় পাওয়ার চেয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াটাই সবচেয়ে জরুরি।
কপার-টি অত্যন্ত কার্যকর একটি গর্ভনিরোধক। প্রতিদিন পিল খাওয়ার ঝামেলা নেই, বছরের পর বছর সুরক্ষা মেলে। তাই অনেকেই মনে করেন, কপার-টি থাকলে গর্ভধারণ কার্যত অসম্ভব। কিন্তু বাস্তবে কোনো গর্ভনিরোধকই ১০০ শতাংশ নিশ্চয়তা দেয় না।
কপার-টি থাকা অবস্থায় গর্ভধারণ হলে প্রথম প্রশ্ন ওঠে, গর্ভের শিশুটি কি নিরাপদ? কপার-টি কি শিশুর জন্মগত ত্রুটি ঘটাতে পারে? গর্ভাবস্থা কি চালিয়ে যাওয়া সম্ভব?
প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন অবস্থায় আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে দ্রুত পরীক্ষা করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
কতটা বিরল এ গর্ভধারণ?
কপার-টি সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য গর্ভনিরোধকগুলির একটি। বছরে ১০০ জন ব্যবহারকারীর মধ্যে এক জনেরও কমের গর্ভধারণ হতে পারে। কপার-টি থাকা অবস্থায় গর্ভধারণের অন্যতম কারণ হল সেটি সঠিক জায়গা থেকে সরে যাওয়া। কখনও সেটি জরায়ুমুখের দিকে নেমে আসে, কখনও অজান্তেই শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। আবার কোনও কোনও ক্ষেত্রে জরায়ুর দেওয়ালে আটকে যেতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কপার-টির মেয়াদ। যেমন, ‘সিইউ টি ৩৮০এ’ সাধারণত ১০ বছর পর্যন্ত ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত। নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে গেলে সেটি পরিবর্তন করা প্রয়োজন।
সন্তান প্রসবের পরপর কপার-টি বসানো হলেও নিয়মিত ফলো-আপ জরুরি। কারণ এ সময়ে কপার-টি শরীর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে এবং অনেক নারী তা বুঝতে পারেন না।
টেস্ট পজিটিভ হলে সময় নষ্ট না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া
কপার-টি থাকা অবস্থায় প্রেগন্যান্সি টেস্ট পজিটিভ হলে কয়েক সপ্তাহ অপেক্ষা করা ঠিক নয়। যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। চিকিৎসকের কাছে গেলে প্রথমে ট্রান্সভ্যাজাইনাল আল্ট্রাসাউন্ড করা হয়। এর মাধ্যমে দেখা হয় গর্ভটি জরায়ুর ভিতরে রয়েছে কি না এবং কপার-টি ঠিক কোথায় রয়েছে। এ দু’টি তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পরবর্তী চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নির্ভর করে গর্ভের অবস্থান এবং কপার-টির অবস্থানের উপর।
এক্টোপিক প্রেগন্যান্সির ভয়
কপার-টি থাকা অবস্থায় গর্ভধারণ হলে চিকিৎসকরা প্রথমেই এক্টোপিক প্রেগন্যান্সির সম্ভাবনা বাদ দিতে চান। জরায়ুর বদলে ফ্যালোপিয়ান টিউবের মতো অন্য জায়গায় গর্ভধারণ হলে তাকে এক্টোপিক প্রেগন্যান্সি বলা হয়। সময়মতো চিকিৎসা না হলে এটি গুরুতর, এমনকি প্রাণঘাতীও হতে পারে।
তবে মনে রাখতে হবে, কপার-টি নিজে এক্টোপিক প্রেগন্যান্সির সামগ্রিক ঝুঁকি বাড়ায় না। কিন্তু কপার-টি থাকা অবস্থায় যদি গর্ভধারণ হয়, সেই গর্ভধারণের মধ্যে এক্টোপিক হওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি।
একইসঙ্গে তীব্র পেটব্যথা, মাথা ঘুরে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা বেশি রক্তপাত হলে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।
কপার-টি কি খুলে ফেলতে হয়?
গর্ভটি যদি জরায়ুর ভিতরে থাকে এবং কপার-টি নিরাপদে বের করা সম্ভব হয়, সাধারণত যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সেটি সরিয়ে ফেলার পরামর্শ দেওয়া হয়। কপার-টি খুলতে গিয়ে সামান্য গর্ভপাতের ঝুঁকি থাকে। কিন্তু সেটি জরায়ুর ভিতরে রেখে দিলে গর্ভপাত, জরায়ুতে সংক্রমণ, সময়ের আগেই গর্ভস্থ পানি বেরিয়ে যাওয়া এবং অপরিণত শিশুর জন্মের মতো জটিলতার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
তবে কপার-টির সুতা যদি দেখা না যায়, তখন জোর করে সেটি বের করার চেষ্টা করা হয় না। কারণ তাতে গর্ভের ক্ষতি হতে পারে। পরিস্থিতি বুঝে চিকিৎসকই সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি ঠিক করেন।
শিশুর কি জন্মগত ত্রুটি হতে পারে?
মায়েদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা এটি নিয়েই। চিকিৎসকদের মতে, শিশুর জন্মগত ত্রুটির কারণ কপার টি নিজে নয়। কপার-টি অ্যামনিয়োটিক স্যাকের বাইরে থাকে এবং সাধারণত গর্ভস্থ শিশুর সরাসরি সংস্পর্শে আসে না।
গর্ভাবস্থা বাড়ার সঙ্গে জরায়ুও প্রসারিত হয়। ফলে কপার-টি অনেক সময় একদিকে সরে যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেটি গর্ভের আবরণীর মধ্যে থাকতে পারে বা প্রসবের সময় বেরিয়ে আসতে পারে।
অর্থাৎ, শিশুর গঠনগত সমস্যা নয়; বরং কপার-টি রেখে দিলে গর্ভাবস্থায় বিভিন্ন জটিলতার ঝুঁকি বেড়ে যাওয়া নিয়েই আশঙ্কা বেশি হয়।
কপার-টি ব্যবহার করলে এ বিষয়গুলি মনে রাখুন
প্রতি মাসে ঋতুস্রাবের পর কপার-টি ঠিক জায়গায় আছে কি না খেয়াল করুন। কবে কপার-টি পরিবর্তন করতে হবে, সেটিও মনে রাখুন।
কপার-টি ঠিক জায়গায় না থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ না পাওয়া পর্যন্ত বিকল্প গর্ভনিরোধক ব্যবহার করুন। ঋতুস্রাব বন্ধ হলে দ্রুত প্রেগন্যান্সি টেস্ট করুন।
আর কপার-টি থাকা অবস্থায় গর্ভধারণের পাশাপাশি যদি জ্বর, দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব, রক্তপাত, তীব্র পেটব্যথা, ক্র্যাম্প বা গর্ভস্থ পানি বেরিয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
কপার-টি থাকা অবস্থায় গর্ভধারণ বিরল, কিন্তু অসম্ভব নয়। এমন পরিস্থিতিতে ভয় না পেয়ে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আরএফ
