বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে

রংপুরে নবজাতক মৃত্যুহার জাতীয় গড়ের চেয়ে ৫০ শতাংশ বেশি

রংপুরে নবজাতক মৃত্যুহার জাতীয় গড়ের চেয়ে ৫০ শতাংশ বেশি

বাংলাদেশে প্রতি ১ হাজার জীবিত জন্মে ২০ নবজাতকের মৃত্যু হলেও রংপুর বিভাগে এ সংখ্যা ৩০। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে (বিডিএইচএস) ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় গড়ের তুলনায় রংপুরে নবজাতক মৃত্যুর হার ৫০ শতাংশ বেশি। একইসঙ্গে এ বিভাগে কিশোরী গর্ভধারণ ও বাল্যবিবাহের হারও জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গর্ভকালীন ও প্রসবকালীন সেবার ঘাটতি, জরুরি প্রসবসেবা ও কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থার দুর্বলতা, দারিদ্র্য এবং দুর্গম জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবায় সীমিত প্রবেশাধিকার এ অঞ্চলে মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে মানসম্মত মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কমিউনিটির অংশগ্রহণ বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছে সেভ দ্য চিলড্রেন ইন বাংলাদেশ।

সোমবার (১৭ আগস্ট) রংপুর সদর উপজেলার চন্দনপাট ইউনিয়নের একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিদর্শন শেষে মহানগরীর একটি বেসরকারি কনভেনশন হলরুমে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। ‘গণমাধ্যম প্রচারণার আওতায় মিডিয়া সেলিব্রিটির মাঠপর্যায়ের পরিদর্শন’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি পরিদর্শন করেন অভিনেত্রী মাসুমা রহমান নাবিলা।

পরিদর্শন শেষে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে নাবিলা বলেন, ইউনিয়ন পর্যায়ের কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এটাই প্রথম যাওয়া। সীমিত জায়গার মধ্যেও স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির সেবাদানের ব্যবস্থা মুগ্ধ করেছে। বিশেষ করে ছোট লেবার রুমে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও সেবার বিভিন্ন ধাপ যেভাবে সাজানো হয়েছে, তা প্রশংসনীয়।

তিনি বলেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির বিভিন্ন দেয়ালে পরিবার পরিকল্পনা, প্রসবকালীন সেবা, ঝুঁকির লক্ষণ এবং কোন পরিস্থিতিতে একজন মাকে উপজেলা বা উচ্চতর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পাঠাতে হবে এসব বিষয়ে ধাপে ধাপে নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে। প্রসব-পরবর্তী কক্ষে নবজাতকের যত্ন, শিশুকে কীভাবে ধরতে হবে এবং কোন অবস্থানে রাখতে হবে, সে বিষয়েও সহজবোধ্য নির্দেশনা রয়েছে।

dhakapost

নাবিলা আরও বলেন, ‘জননী’ প্রকল্পের সেবা সম্পর্কে মানুষের মধ্যে মুখে মুখে প্রচার বাড়ছে। দূরের এলাকা থেকেও অ্যাম্বুলেন্সে করে মানুষ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সেবা নিতে আসছেন বলে তিনি জানতে পেরেছেন। বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়ার সুযোগ থাকায় মানুষের আগ্রহও বাড়ছে।

সংবাদ সম্মেলনে ‘জননী’ প্রকল্পের টেকনিক্যাল স্পেশালিস্ট (কমিউনিকেশন অ্যান্ড ডকুমেন্টেশন) জাহানারা হৃদিতা বলেন, কমিউনিটির বিভিন্ন বয়সী আগ্রহী মানুষকে প্রশিক্ষণ দিয়ে ‘জননী বন্ধু’ হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে তরুণ-তরুণীর পাশাপাশি বিভিন্ন বয়সী নারীরাও রয়েছেন।

তিনি বলেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কর্মরতদের পক্ষে কমিউনিটির প্রত্যেক মানুষের কাছে সরাসরি পৌঁছানো সম্ভব নয়। এ কারণে স্থানীয় সক্রিয় ও আগ্রহী মানুষদের যুক্ত করে একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়েছে। ‘জননী বন্ধুরা’ প্রশিক্ষণ ও নিজেদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে মাতৃস্বাস্থ্য, নবজাতকের যত্ন এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধসহ বিভিন্ন বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করছেন।

বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে থাকা কিশোরীদের দ্রুত সহায়তা নিশ্চিত করতে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা প্রশাসন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থাও গড়ে তোলা হয়েছে বলে জানান তিনি।

সংশ্লিষ্টরা বলেন, রংপুরে মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য, দারিদ্র্য, কিশোরী গর্ভধারণ, দুর্গম জনগোষ্ঠী এবং স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকারের ঘাটতি রয়েছে। এসব কারণে এ অঞ্চলে মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

এই লক্ষ্যেই ‘জননী’ প্রকল্পের আওতায় রংপুর বিভাগের মাতৃমৃত্যুর হার কমানো এবং মা ও নবজাতকের জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০১৩ সালের ১ মার্চ শুরু হওয়া প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। রংপুর ও লালমনিরহাট জেলার নির্বাচিত ৪০টি ইউনিয়নে এর কার্যক্রম চলছে। যার আওতায় গর্ভবতী নারী, ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী প্রজননক্ষম নারী, কিশোরী, নবজাতক, স্বামী এবং শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের লক্ষ্য করে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে সেভ দ্য চিলড্রেন ইন বাংলাদেশের জননী প্রকল্পের ফিল্ড অপারেশন্স ম্যানেজার ডা. গোলাম ফখরুদ্দীন ফাহিম, প্রকল্প পরিচালক ডা. উজ্জ্বল কুমার রায়, প্রকল্প সমন্বয়কারী মোহম্মদ ফরাজদুক ভূঞা, সিনিয়র ম্যানেজার (মিডিয়া এণ্ড ক্যাম্পেইন কমিউনিকেশন্স) আশফাক জামানসহ সরকারি প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য প্রশাসন, স্থানীয় সরকার, কমিউনিটি প্রতিনিধি, প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও স্থানীয় সাংবাদিকেরা উপস্থিত ছিলেন।

প্রসঙ্গত, ‘জননী’ প্রকল্পটি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সার্বিক তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়িত হচ্ছে। কোরিয়ান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (কোইকা) এতে অর্থায়ন করছে। সেভ দ্য চিলড্রেন ইন বাংলাদেশ কারিগরি সহযোগিতা এবং আরডিআরএস বাংলাদেশ বাস্তবায়ন সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি সহযোগী হিসেবে রয়েছে আইসিডিডিআর,বি।

আরএইচটি/জেডএস