বিজ্ঞাপন

ডব্লিউএইচওর ৫২৩টির বিপরীতে বাংলাদেশে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ ১১৭টি

ডব্লিউএইচওর ৫২৩টির বিপরীতে বাংলাদেশে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ ১১৭টি

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় প্রাপ্তবয়স্কদের ৫২৩ ও শিশুদের জন্য ৩৭৪ টি ওষুধ রয়েছে। এর বিপরীতে বাংলাদেশে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় রয়েছে মাত্র ১১৭টি। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি দুই বছর পরপর তালিকা হালনাগাদ করার কথা থাকলেও বাংলাদেশে তা যথাযথভাবে করা হয়নি।

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাবলিক ইন্টিগ্রিটি নেটওয়ার্ক ফর এভিডেন্স অ্যান্ড ট্রান্সপারেন্সি (পাইনেট) আয়োজিত ‘রোগীর নাগালে ওষুধ, উৎপাদকের টেকসইতা : ভারসাম্যপূর্ণ ওষুধনীতির সন্ধানে’ শীর্ষক জাতীয় নীতি সংলাপ ২০২৬-এ এসব বিষয় উঠে আসে।

সংলাপে বিশেষজ্ঞরা বলেন, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা নিয়মিত হালনাগাদের পাশাপাশি রোগীর নাগালে ওষুধের প্রাপ্যতা, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, ওষুধের মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর নীতি ও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকারি ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা এবং দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন তারা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ প্রতিনিধি ও মিশন প্রধান ডা. মামুনুর রহমান মালিক বলেন, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা (ইউএইচসি) বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদ করা গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু তালিকা করলেই মানুষের ওষুধ প্রাপ্তি নিশ্চিত হবে না। দেশের সর্বত্র ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে কি না, তা মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রয়েছে কি না এবং নিরাপদ ও কার্যকরভাবে সরবরাহ করা হচ্ছে কি না, সেসব বিষয়ও নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২৫ সালে প্রয়োজনীয় ওষুধের তালিকার ৩৪তম সংস্করণ হালনাগাদ করেছে। এতে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ৫২৩টি এবং শিশুদের জন্য প্রায় ৩৭৪টি প্রয়োজনীয় ওষুধ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

ডা. মালিক বলেন, টেকসই ওষুধনীতি গড়ে তুলতে তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে ওষুধের প্রাপ্যতা, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এবং ওষুধের নিরাপত্তা। অনেক সময় বাজারে ওষুধ থাকার পরও দুর্বল স্টক ব্যবস্থাপনা, নকল ও নিম্নমানের ওষুধ এবং সরবরাহব্যবস্থার সমস্যার কারণে রোগীরা প্রয়োজনীয় ওষুধ থেকে বঞ্চিত হন।

ওষুধের নিরাপত্তা ও মান নিশ্চিত করতে দেশের ড্রাগ রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান তিনি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার কথা বলা হলেও ড্রাগ রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষকেও কার্যকর ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে বলে মন্তব্য করেন ডব্লিউএইচওর এই প্রতিনিধি।

একই সঙ্গে ফার্মাকোভিজিল্যান্স বা ওষুধের নিরাপত্তা নজরদারি ব্যবস্থা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। এর মাধ্যমে নকল ও নিম্নমানের ওষুধ শনাক্ত করার পাশাপাশি ওষুধ সেবনের পর বিরূপ প্রতিক্রিয়াও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।

দেশে বহু বছর ধরে ‘র‍্যাশনাল ইউজ অব ড্রাগস’ বা যুক্তিসংগত ওষুধ ব্যবহারের কথা বলা হলেও এর বাস্তব প্রয়োগ এখনো দুর্বল বলে মন্তব্য করে ডা. মালিক বলেন, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) ভবিষ্যতে বিশ্বের অন্যতম বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে। তাই অ্যান্টিবায়োটিকসহ সব ধরনের ওষুধ যুক্তিসঙ্গতভাবে ব্যবহারের বিষয়টি এখনই কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শিশির মনির বলেন, ২০২৩ সালের ঔষধ ও কসমেটিকস আইনের ১৩ ধারা অনুযায়ী প্রতি দুই বছর অন্তর অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদ এবং এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখার কথা থাকলেও তা সঠিকভাবে কার্যকর হয়নি। আইন অনুযায়ী ‘জাতীয় ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদ’ গঠনের কথা থাকলেও তা না করে উপদেষ্টা পরিষদ ছাড়াই টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। এতে বিভিন্ন আইনি জটিলতা ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

শিশির মনির বলেন, হাইকোর্টের পূর্বের রায় অনুযায়ী, ওষুধের প্রাপ্যতা সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে থাকা ‘জীবনের অধিকার’-এর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ৭৩৯টি ওষুধের তালিকা কমিয়ে ১১৭টিতে রূপান্তর এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন টাস্কফোর্স বা কমিটির মাধ্যমে তালিকা পরিবর্তন বা বাতিলের বিষয়টি হাইকোর্টের রায়ের পরিপন্থি ও অসাংবিধানিক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তিনি বলেন, জীবন রক্ষাকারী ও অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে মুনাফা অর্জনের চেয়ে জনস্বাস্থ্য ও মানুষের জীবনের অধিকারের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। হাইকোর্টের সুনির্দিষ্ট রায় ও ৭৩৯টি ওষুধের মূল তালিকা বহাল না রেখে কোনো টাস্কফোর্স বা উপদেষ্টা পরিষদের পক্ষ থেকে হঠাৎ তালিকা বাতিল বা পরিবর্তন করা আইনসম্মত নয়।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলেন, ২০২৬ সালের এসেনশিয়াল মেডিসিন লিস্ট বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশের তুলনায় অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের বিষয়। ওষুধ কোম্পানিগুলোর স্বার্থের সংঘাত এড়াতে তালিকা প্রণয়নে তাদের সরাসরি ভূমিকা না থাকলেও নীতি নির্ধারণে স্বচ্ছতা ও ভারসাম্য নিশ্চিত করা জরুরি।

তিনি বলেন, সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ওষুধের পাশাপাশি অন্যান্য ওষুধের দামও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে হবে। মুক্তবাজার অর্থনীতির চাপ ও ট্রিপস বা মেধাস্বত্ব নীতির কারণে দেশীয় ওষুধশিল্প যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও বিশেষ নজর দিতে হবে।

মুশতাক হোসেন বলেন, এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডকে (ইডিসিএল) আরও শক্তিশালী করতে হবে। সরকারি উদ্যোগে সাশ্রয়ী মূল্যে ওষুধ উৎপাদন নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। বিশেষ করে গোপালগঞ্জ ভ্যাকসিন প্ল্যান্টের মতো জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক কারণে বন্ধ না রেখে পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

তিনি বলেন, করোনাকালীন সংকটের পর দেশের ওষুধ ও ভ্যাকসিন খাতকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে হলে বিদেশি নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে হবে। মুক্তবাজারের অসম প্রতিযোগিতায় সাধারণ মানুষ যাতে ভুক্তভোগী না হয়, সে জন্য সরকারের ওষুধনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন আরও কার্যকর করা প্রয়োজন।

সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ। তিনি বলেন, রোগীর জন্য ওষুধ সাশ্রয়ী রাখা এবং ওষুধশিল্পের টেকসইতা নিশ্চিত করা পরস্পরবিরোধী লক্ষ্য নয়; বরং একই জনস্বাস্থ্যনীতির দুটি অপরিহার্য উদ্দেশ্য। ওষুধনীতির লক্ষ্য সর্বনিম্ন সম্ভাব্য মূল্য নির্ধারণ নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি টেকসই মূল্য, যা রোগী বহন করতে পারেন এবং উৎপাদকও টেকসইভাবে মানসম্মত ওষুধ উৎপাদন করতে পারেন।

এমএল/এসএএস