বিজ্ঞাপন

আক্রান্তে পুরুষ এগিয়ে, ডেঙ্গুতে মৃত্যু বেশি নারীদের

আক্রান্তে পুরুষ এগিয়ে, ডেঙ্গুতে মৃত্যু বেশি নারীদের

দেশে দিন যত যাচ্ছে, ততই বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ৩২ হাজার ২৪৮ জন। তাদের মধ্যে ১৯ হাজার ৮০৯ জন পুরুষ এবং ১২ হাজার ২৪২ জন নারী। অন্যদিকে, ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ৮৮ জনের মধ্যে ৫১ জন নারী ও ৩৭ জন পুরুষ। অর্থাৎ আক্রান্তের সংখ্যায় নারীদের তুলনায় পুরুষেরা প্রায় ২২ শতাংশ এগিয়ে থাকলেও মৃত্যুর ক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় নারীদের হার প্রায় ১৭ শতাংশ বেশি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক নিয়মিত বুলেটিনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আক্রান্ত ও মৃত্যুর ক্ষেত্রে বয়সের একটি নির্দিষ্ট প্রবণতাও রয়েছে। আক্রান্ত রোগীদের প্রায় ৬০ শতাংশের বয়স ১৬ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। এ বয়সের আক্রান্তদের মধ্যে ৬৩ শতাংশ পুরুষ ও ৩৭ শতাংশ নারী। অন্যদিকে, একই বয়সসীমায় মৃত্যুর ক্ষেত্রে নারীদের অংশ ৬০ শতাংশ এবং পুরুষের ৪০ শতাংশ। অর্থাৎ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর বিচারে ১৬ থেকে ৪০ বছর বয়সীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। তবে, আক্রান্তের ক্ষেত্রে পুরুষের সংখ্যা বেশি হলেও মৃত্যুর ক্ষেত্রে এই বয়সী নারীদের হার বেশি।

নারীদের মৃত্যুর হার বেশি হওয়া প্রসঙ্গে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মির্জা জিয়াউল ইসলাম বলেন, ‘ডেঙ্গুতে মৃত্যুর একটি প্রধান কারণ হচ্ছে স্থূলতা। মানুষের ওজন যত বেশি, ডেঙ্গুর তীব্রতা তার ক্ষেত্রে তত বেশি হতে পারে। বাংলাদেশের নারীদের একটি বয়সের পর শরীরে স্থূলতা ও ওজন বৃদ্ধি পেতে দেখা যায়। ফলে তাদের ডেঙ্গুর তীব্রতা বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকে, যা পরবর্তীতে মৃত্যুর আশঙ্কা বাড়িয়ে দেয়।’

dhakapost

চলতি বছর ডেঙ্গুতে পুরুষ আক্রান্তের সংখ্যা ২২ শতাংশ বেশি হলেও মৃত্যুর হারে নারীদের উপস্থিতি ১৭ শতাংশ বেশি। চিকিৎসকদের মতে, চিকিৎসায় অবহেলা বা লক্ষণ চেপে রাখা, শারীরিক স্থূলতা এবং বিলম্বে হাসপাতালে আসার কারণে নারীরা ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে ১৬ থেকে ৪০ বছর বয়সী নারীরা ডেঙ্গুর চরম ঝুঁকিতে রয়েছেন

মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, “আমাদের দেশের নারীদের মধ্যে রোগের লক্ষণ চেপে রাখার একটি প্রবণতা রয়েছে। প্রাথমিক অবস্থায় তারা বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে চান না। ফলে চিকিৎসায় দেরি হওয়ায় ‘ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম’ ও ‘এক্সপ্যান্ডেড ডেঙ্গু সিন্ড্রোমে’ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুহার বাড়ছে। ডেঙ্গু থেকে উত্তরণের জন্য যত দ্রুত রোগ শনাক্ত করা যাবে, ততই মৃত্যু কমানো সম্ভব।”

সংক্রমণ ও মৃত্যুর শীর্ষে ঢাকা বিভাগ

বিভাগভিত্তিক হিসাবে ডেঙ্গুর প্রকোপে ঢাকা বিভাগ শীর্ষে রয়েছে। চলতি বছর এ বিভাগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ১২ হাজার ৭৪৫ জন, যা মোট আক্রান্তের প্রায় ৪০ শতাংশ। মৃত্যুর হিসাবেও ঢাকা বিভাগ এগিয়ে, মোট মৃত্যুর ৫১ শতাংশ (৪৫ জন)। এর মধ্যে ৬০ শতাংশ ঘটেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায়। বাকি ৪০ শতাংশ মৃত্যু হয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, ঢাকা জেলা এবং এ বিভাগের অন্যান্য জেলায়।

মোট আক্রান্তের ৪০ শতাংশ এবং মোট মৃত্যুর ৫১ শতাংশ ঘটেছে ঢাকা বিভাগে, যার বড় অংশই উত্তর সিটি করপোরেশনে। আগস্টে আক্রান্তের সংখ্যা জুলাইয়ের চেয়ে ৮০ শতাংশ বাড়লেও গত বছরের তুলনায় এবার সার্বিক মৃত্যুহার তুলনামূলক কম। সেপ্টেম্বরের পিক-সিজন মোকাবিলায় সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষার সুযোগসহ বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে

আক্রান্তের দিক থেকে ঢাকা বিভাগের পর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বরিশাল বিভাগ। চলতি বছর এ বিভাগের ছয় জেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ৫ হাজার ৩৮৬ জন। এরপর চট্টগ্রাম বিভাগে ৫ হাজার ৬ জন, খুলনায় ৪ হাজার ৭৮০, ময়মনসিংহে ১ হাজার ৬৬৮, রাজশাহীতে ১ হাজার ৬৬৮, রংপুরে ৮৩৬ এবং সিলেট বিভাগে সবচেয়ে কম ১৫৯ জন আক্রান্ত হয়েছেন।

dhakapost

মৃত্যুর দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে খুলনা বিভাগ। এ বিভাগে মারা গেছেন ১৬ জন। এ ছাড়া বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগে আটজন করে, রাজশাহীতে চারজন এবং রংপুর ও সিলেট বিভাগে একজন করে মারা গেছেন।

জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে সংক্রমণ বাড়লেও কমেছে মৃত্যু

চলতি মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতির চরম অবনতির চিত্র পাওয়া যায় আক্রান্তের পরিসংখ্যান থেকে। জুলাই মাসে দেশজুড়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন ৯ হাজার ২০৬ জন। অথচ আগস্টের প্রথম ২৭ দিনেই আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ৯৩৮ জনে। অর্থাৎ গত মাসের তুলনায় চলতি মাসে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৮০ শতাংশ।

তবে, আক্রান্তের হার বাড়লেও মৃত্যুর সংখ্যায় কিছুটা স্বস্তি রয়েছে। জুলাই মাসে ডেঙ্গুতে মারা গিয়েছিলেন ৩৬ জন, আর আগস্টের প্রথম ২৭ দিনে মারা গেছেন ৩৪ জন। এতে স্পষ্ট যে সংক্রমণ বাড়লেও তা মৃত্যুর পরিসংখ্যানে একই মাত্রায় প্রতিফলিত হয়নি।

dhakapost

এদিকে, গত বছরের জানুয়ারি থেকে ২৭ আগস্ট পর্যন্ত সারাদেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন ২৯ হাজার ৯৪৪ জন এবং মারা গিয়েছিলেন ১১৮ জন। চলতি বছরের একই সময়ে আক্রান্তের সংখ্যা ২ হাজার ৩০৪ জন বেড়ে ৩২ হাজার ২৪৮ জনে দাঁড়ালেও মৃত্যুর সংখ্যা উল্টো কমে ৮৮ জনে নেমে এসেছে।

dhakapost

সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে বড় চ্যালেঞ্জের শঙ্কা

সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘আমরা কেবল ডেঙ্গুর পিক-সিজনে (চূড়ান্ত রূপ) প্রবেশ করেছি। ধারণা করা হচ্ছে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি থাকবে এবং নভেম্বরের শেষ নাগাদ তা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করবে। এবার ঢাকার পাশাপাশি বরিশাল ও খুলনা অঞ্চলে ডেঙ্গুর দাপট বেশি।’

তিনি আরও বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। জ্বর হলেই রোগীরা যাতে পরীক্ষা করাতে পারেন, সেজন্য সব সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এ সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

এমএল/এমএআর/