বিজ্ঞাপন

জমে থাকা পানিতে মশার রাজত্ব: ঘনবসতি এলাকায় ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকি

জমে থাকা পানিতে মশার রাজত্ব: ঘনবসতি এলাকায় ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকি

রাজধানীর নিম্নআয়ের মানুষের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে ডেঙ্গুর ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এসব এলাকার বিভিন্ন গলি, গ্যারেজ ও বাসাবাড়ির আশপাশে দীর্ঘদিন ধরে পানি জমে রয়েছে। কোথাও নোংরা ড্রেন, কোথাও আবর্জনার সঙ্গে পড়ে আছে পরিত্যক্ত পাত্র। এসব স্থানে এডিস মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হলেও নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধন কার্যক্রম নেই বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের। ফলে মশার উপদ্রবের পাশাপাশি ডেঙ্গু সংক্রমণ নিয়ে বাড়ছে আতঙ্ক।

সম্প্রতি রাজধানীর পূর্ব রামপুরার জামতলা এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, এই এলাকার কিছু কিছু জায়গায় নিম্নআয়ের মানুষের ঘনবসতি রয়েছে। মূলত এখানে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার একাধিক বড় গ্যারেজ কেন্দ্রিক চালক ও তাদের পরিবার নিয়ে এসব ঘনবসতি গড়ে উঠেছে। 

সরেজমিনে দেখা যায়, জামতলা মোড়ের কাছেই খোলা আকাশের নিচে অটোরিকশা ও মাইক্রোবাস পার্কিং এলাকা। এর পাশেই ঘনবসতিপূর্ণ তিনটি বাড়ি। প্রথম বাড়িটির দুই পাশে প্রায় সময়ই পানি জমে থাকতে দেখা যায়, যেখানে মশার লার্ভা বংশবৃদ্ধির ঝুঁকি রয়েছে।

ঢাকার জামতলাসহ নিম্নআয়ের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় নোংরা পানি ও জমে থাকা আবর্জনা এডিস মশার প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। মশক নিধনে সিটি করপোরেশনের উদাসীনতায় ডেঙ্গু ঝুঁকি ও জনআতঙ্ক আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। উপযুক্ত পরিবেশ ও সচেতনতার অভাবে মশার প্রকোপ দিন দিন অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ছে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে

এর কিছু দূরে জামতলা অগ্নিশিখা গলির শহীদ মিনারের সামনের চত্বরটি চারপাশ আবদ্ধ হওয়ায় সেখানে অন্তত এক ইঞ্চি পরিমাণ নোংরা পানি জমে থাকে। বৃষ্টি হলে পানি আরও বাড়ে। পাশাপাশি ফেলে রাখা ময়লা-আবর্জনার কারণে স্থানটি পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। ঠিক পাশেই দুটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার গ্যারেজ রয়েছে, যেখানে রাতে অন্তত ১০০ চালক অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকেন। আশপাশে রয়েছে ছোট-মাঝারি মানের ভবনও।

dhakapost

নাগরিক ভোগান্তি ও মশক নিধনে উদাসীনতার অভিযোগ

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দিনের বেলাতেও ঘরের ভেতর মশার উপদ্রব থাকে এবং সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে। মশার কামড় থেকে বাঁচতে ধূপ বা কয়েলের ধোঁয়া জ্বালিয়ে রাখতে হয়।

নীলফামারী থেকে এসে ঢাকায় অটোরিকশা চালানো মোহাম্মদ গণিউল ইসলাম বলেন, ‘এখানে মশার খুব অত্যাচার। এশার নামাজের পর থেকেই কয়েলের ধোঁয়া জ্বালিয়ে রাখতে হয়, রাতে ঠিকমতো ঘুমানো যায় না। আশপাশের জমে থাকা পচা পানি থেকেই মশা আসে। অথচ গত এক মাসে সিটি করপোরেশন থেকে একবারের জন্যও ওষুধ ছিটাতে দেখিনি। তারা কেবল অভিজাত এলাকায় কাজ করে, আমরা রিকশাচালক বলে আমাদের খোঁজ নেয় না।’

নিম্নআয়ের মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে চিকিৎসা ব্যয়ের পাশাপাশি উপার্জন বন্ধ হওয়ার দ্বৈত সংকটে পড়েন। ফলে প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসা গ্রহণে বিলম্ব ঘটে, যা শারীরিক জটিলতা বহুলাংশে বাড়িয়ে দেয়। এই সংকট এড়াতে বিশেষজ্ঞরা প্রান্তিক ও কমিউনিটি পর্যায়ে দ্রুত বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা চালু করার এবং আক্রান্তদের বিশ্রামে রেখে চিকিৎসা নিশ্চিতের তাগিদ দিয়েছেন

আরেক রিকশাচালক আফজাল হোসেন জানান, চলতি মাসের শুরুতে তাদের গ্যারেজের দুজন চালক ভীষণ জ্বরে আক্রান্ত হন। তিন দিন পর জ্বর কিছুটা কমলে তারা গ্রামে চলে যান। এরপর থেকেই রাতে কয়েল বা ধোঁয়া জ্বালানোর পাশাপাশি মশারি ব্যবহার করে থাকতে হচ্ছে।

চিকিৎসা ব্যয় ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় নিম্নআয়ের মানুষ

এলাকার বাসিন্দাদের বড় অংশই দিনমজুর, রিকশাচালক ও পরিবহন শ্রমিকসহ বিভিন্ন নিম্নআয়ের পেশায় যুক্ত। পরিবারের কোনো সদস্য ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে চিকিৎসার বাড়তি খরচের পাশাপাশি উপার্জনক্ষম ব্যক্তির আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া তাদের জন্য চরম অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করে। ফলে জ্বর হলে অনেকেই শুরুতে স্থানীয় ফার্মেসি বা কম খরচের ওপর নির্ভর করেন, যা পরবর্তীতে রোগ শনাক্ত ও সঠিক চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা বাড়ায়।

dhakapost

বাসাবাড়ির গৃহকর্মী বেদেনা বেগম জানান, তার স্বামী অটোরিকশা চালান। একটি টিনশেড বাড়ির ছোট ঘরে আরও ২০টি পরিবারের সঙ্গে বাস করেন তারা। অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বেদেনা বলেন, ‘আমার স্বামীর কয়েক দিন আগে মারাত্মক জ্বর হয়েছিল। প্রথমে ফার্মেসি থেকে দুই দিন ওষুধ এনে খাইয়েছি। সুস্থ না হওয়ায় মুগদা হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা ডেঙ্গু শনাক্ত করেন। সেখানে পাঁচ দিন ভর্তি রাখতে প্রচুর টাকা খরচ হয়েছে, আর রোগীর পরিচর্যার কারণে ১০ দিন আমিও কাজে যেতে পারিনি।’

স্থানীয় ফার্মেসি বিক্রেতা জামান জানান, চিকিৎসকের পরামর্শপত্র (প্রেসক্রিপশন) ছাড়াই অনেকে সরাসরি জ্বরের ওষুধ নিতে আসেন। তাদের সবার ডেঙ্গু না হলেও, চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন নিয়ে ওষুধ নিতে আসা দেখলেই বোঝা যায় ডেঙ্গু সংক্রমণের হার কতটা বেড়েছে।

এদিকে, রামপুরার জামতলা মোড় এলাকার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম আক্ষেপ করে বলেন, ‘এলাকার বেশ কয়েকটি স্থানে দীর্ঘদিন ধরে নোংরা পানি জমে আছে, যার কোনো ড্রেনেজ সংযোগ নেই। নিয়মিত পরিষ্কার না করায় এসব স্থানে এডিস মশার প্রজনন ঝুঁকি তৈরি হলেও কর্তৃপক্ষের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। নিয়মিত কর দিয়েও সিটি করপোরেশনের ন্যূনতম সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি আমরা।’

পরিসংখ্যান ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২৭ আগস্ট পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে ৮৬৮ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন; তবে এই সময়ে নতুন করে কারও মৃত্যু হয়নি। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ২৪৮ জনে, যার মধ্যে ৮৮ জন মারা গেছেন। হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৩০ হাজার ৭৭ জন এবং বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ২ হাজার ৮৩ জন।

dhakapost

সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন জানান, জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে এবং সেপ্টেম্বরে তা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আক্রান্ত বৃদ্ধি পেলে আনুপাতিক হারে মৃত্যুও বাড়তে পারে; আর এই ভয়াবহ রূপ আগামী নভেম্বর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত স্থায়ী কোনো উদ্যোগ না দেখে মনে হচ্ছে অনেকটা ঢিলেঢালাভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে। সরকারের এখন মূলত কমিউনিটি পর্যায়ে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষার ওপর জোর দেওয়া দরকার। শুরুতেই রোগ শনাক্ত হলে নিম্ন আয়ের মানুষেরা অন্তত কয়েক দিন বিশ্রামে থাকার সুযোগ পাবেন, যা বড় ধরনের শারীরিক জটিলতা প্রতিরোধে সহায়তা করবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দেশের প্রান্তিক মানুষ শরীরে জ্বর নিয়েও পরিবার চালাতে কঠোর পরিশ্রম করে যান। হাতের কাছে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা করানো গেলে তারা শুরুতেই সচেতন হওয়ার সুযোগ পাবেন, যা সার্বিক ঝুঁকি ও প্রাণহানি অনেকাংশে কমিয়ে আনবে।’

এমএইচএন/এমএআর/