দেশে দিনদিন বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকদের মধ্যে। বিশেষ করে দেরিতে ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ায় অনেক রোগী ‘শক সিন্ড্রোম’সহ জটিল অবস্থায় চলে যাচ্ছেন; এতে বাড়ছে মৃত্যুর ঝুঁকি। এমন পরিস্থিতিতে চলতি ডেঙ্গু মৌসুমে জ্বর হলেই দ্রুত পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যত দ্রুত ডেঙ্গু শনাক্ত করা সম্ভব হবে, রোগীর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনাও তত বাড়বে। আক্রান্ত হওয়ার পর পরীক্ষা না করালে রোগীর শরীরে মারাত্মক জটিলতা দেখা দিতে পারে এবং সময়ের সঙ্গে শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘আমরা ডেঙ্গুর পিক-টাইমে (চূড়ান্ত রূপ) কেবল প্রবেশ করেছি। সেপ্টেম্বরে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে এবং নভেম্বরের শেষ পর্যন্ত এই পরিস্থিতি বজায় থাকবে বলে ধারণা করছি। বর্তমানে আমাদের একই সঙ্গে হাম ও ডেঙ্গু— দুটোই মোকাবিলা করতে হচ্ছে। তা সত্ত্বেও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সব ধরনের প্রস্তুতি রাখা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, সরকারি হাসপাতালগুলোতে জ্বর নিয়ে আসা রোগীদের ডেঙ্গু পরীক্ষা বিনামূল্যে করা হচ্ছে। ডেঙ্গু থেকে পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত কোনো রোগী যেন হাসপাতাল ত্যাগ না করেন, সে বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জাতীয় গাইডলাইন মেনেই সব হাসপাতালে রোগীদের চিকিৎসা চলছে।
প্রান্তিক পর্যায়ে ডেঙ্গু পরীক্ষা ও আঞ্চলিক হাসপাতাল সচল করা জরুরি
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন জানান, জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বিদ্যমান পরিস্থিতি বিবেচনায় সেপ্টেম্বরে এই সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে; আর আক্রান্ত বৃদ্ধি পেলে আনুপাতিক হারে মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়তে পারে। ডেঙ্গুর এই ভয়াবহ রূপ আগামী নভেম্বর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে বলে তারা ধারণা করছেন।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত স্থায়ী কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না, বরং অনেকটা ঢিলেঢালাভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে। সরকারের এখন মূলত কমিউনিটি বা প্রান্তিক পর্যায়ে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষার ওপর জোর দেওয়া দরকার। শুরুতেই রোগ শনাক্ত হলে প্রান্তিক মানুষ অন্তত কয়েক দিন বিশ্রামে থাকতে পারবেন, যা বড় ধরনের শারীরিক জটিলতা প্রতিরোধে সহায়তা করবে।’

ডেঙ্গুর লক্ষণ পরিবর্তন হওয়ায় এখন ১-২ দিনের মধ্যেই রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক হচ্ছে। তাই জ্বর আসার প্রথম ২-৩ দিনের মধ্যে এনএস-১ পরীক্ষা করে দ্রুত ডেঙ্গু শনাক্ত করা জরুরি। প্রান্তিক ও কমিউনিটি পর্যায়ে বিনা মূল্যে পরীক্ষা নিশ্চিত করলে এবং জটিল রোগী ছাড়া অন্যদের জেলা বা উপজেলা হাসপাতালে চিকিৎসা দিলে ঢাকামুখী চাপ কমার পাশাপাশি মৃত্যুঝুঁকি অনেকাংশে হ্রাস পাবে
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দেশের নিম্ন আয়ের মানুষ শরীরে জ্বর নিয়েও কঠোর পরিশ্রম চালিয়ে যান। হাতের কাছে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা করানো গেলে তারা শুরুতেই সচেতন হওয়ার সুযোগ পাবেন, যা সার্বিক ক্ষতি কমিয়ে আনবে।’
চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা বিকেন্দ্রীকরণের তাগিদ দিয়ে এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ পরামর্শ দেন, কেবল বিশেষায়িত হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা সদর হাসপাতাল, রেলওয়ে ও সিটি করপোরেশনের হাসপাতালগুলোকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে হবে। জটিল রোগী ছাড়া অন্যরা এসব হাসপাতালেই চিকিৎসা পেয়ে সুস্থ হতে পারেন। এতে ঢাকার বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোর ওপর রোগীর বাড়তি চাপ কমবে এবং ঢাকার বাইরে থেকে রোগী নিয়ে আসার প্রবণতাও উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে।
আরও পড়ুন
১-২ দিনের মধ্যেই খারাপ হচ্ছে পরিস্থিতি, দ্রুত এনএস-১ পরীক্ষার পরামর্শ
বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ জানান, যত দ্রুত রোগ নির্ণয় করা সম্ভব হবে, রোগীর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনাও তত বেশি থাকে। প্রাথমিক পর্যায়ে ডেঙ্গু শনাক্ত করা গেলে রোগীকে আশঙ্কাজনক জটিলতা থেকে রক্ষা করা সম্ভব।

ডেঙ্গুর বর্তমান লক্ষণ পরিবর্তনের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আগে কয়েক দিন টানা উচ্চমাত্রার জ্বর থাকার পর শারীরিক জটিলতা দেখা দিত। কিন্তু এখন মাত্র এক-দুই দিনের মধ্যেই রোগীর অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটছে; এমনকি অনেক সময় উচ্চমাত্রার জ্বরও থাকছে না। তাই ডেঙ্গু মৌসুমে জ্বর আসামাত্রই কোনো অবহেলা না করে দ্রুত পরীক্ষা করানো জরুরি।’
তিনি আরও পরামর্শ দেন, জ্বর শুরুর দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে ‘এনএস-১’ (NS1) অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করালে দ্রুত ডেঙ্গু শনাক্ত করা সম্ভব। এভাবে শুরুতেই রোগ নির্ণয় করে সঠিক চিকিৎসা শুরু করা গেলে মৃত্যুঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে আনা যায়।
হটস্পট চিহ্নিত করে লার্ভা ধ্বংস ও জাতীয় গাইডলাইনে চিকিৎসার পরামর্শ
রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী জানান, প্রতিনিয়ত ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া অত্যন্ত দুশ্চিন্তার বিষয়। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের প্রধান উপায়ই হলো এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা; তাই আইইডিসিআরের পক্ষ থেকে জাতীয় পর্যায়ে ডেঙ্গুর ‘হটস্পট’ চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘হটস্পটগুলো শনাক্ত করার পর সরকারি সব সংস্থার জনবল ও সাধারণ মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণে এডিস মশার লার্ভা ধ্বংসের পরামর্শ দেওয়া হবে। এছাড়া, চলতি মৌসুমে জ্বর আসামাত্রই সবাইকে বাধ্যতামূলকভাবে ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে হবে। পরীক্ষায় রেজাল্ট পজিটিভ এলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।’
এদিকে, চলতি বছর ডেঙ্গুর ‘ডেন-৩’ সেরোটাইপের আধিক্য থাকলেও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় কোনো সংশয় নেই বলে জানিয়েছেন বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ। তিনি জানান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রকাশিত ২০২৫ সালের সর্বশেষ জাতীয় গাইডলাইন তৈরির সময়ও ডেন-২-এর পাশাপাশি ডেন-৩ সেরোটাইপের উপস্থিতি ছিল। তাই ওই গাইডলাইন অনুসরণ করেই বর্তমান চিকিৎসা কার্যক্রম সফলভাবে পরিচালনা করা সম্ভব।
আরও পড়ুন
জাতীয় নির্দেশিকা ২০২৫: ডেঙ্গু চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনায় বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড
ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনায় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ‘জাতীয় নির্দেশিকা (পঞ্চম সংস্করণ, ২০২৫)’ প্রকাশ করেছে। ডেঙ্গু রোগীদের মৃত্যুহার সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনতে রোগ নির্ণয় থেকে শুরু করে হাসপাতাল পর্যন্ত চিকিৎসাসেবার সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে এই নির্দেশিকায়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ‘জাতীয় নির্দেশিকা ২০২৫’ অনুযায়ী ডেঙ্গু চিকিৎসায় বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড মেনে চলা আবশ্যক। জ্বরের ৩-৪ দিনের মাথায় সংকটকালীন পর্যায়ে প্লাজমা ক্ষরণের ফলে শক সিন্ড্রোমের ঝুঁকি বাড়ে, তাই তরল বা স্যালাইন প্রয়োগে সর্বোচ্চ সতর্কতা জরুরি। এছাড়া, দৈনিক সর্বোচ্চ ৩ গ্রাম প্যারাসিটামল অনুমোদন থাকলেও ব্যথানাশক বা স্টেরয়েড পুরোপুরি নিষিদ্ধ, কারণ ভুল ওষুধ ব্যবহারে অভ্যন্তরীণ রক্তপাত ও মৃত্যুর ঝুঁকি বহুলাংশে বেড়ে যায়
নির্দেশিকা অনুযায়ী ডেঙ্গুর গতি-প্রকৃতিকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়েছে— জ্বরের পর্যায়, সংকটকালীন বা তরল নিঃসরণের পর্যায় এবং সুস্থ হওয়ার পর্যায়। সাধারণত জ্বরের তৃতীয় থেকে চতুর্থ দিনে শরীরে রক্তরস (প্লাজমা) নিঃসরণের ফলে ‘শক’ হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। এ সময় রোগীকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তবে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত তরল বা স্যালাইন প্রয়োগ করলে ফুসফুসে পানি জমে মারাত্মক জটিলতা তৈরি হতে পারে; তাই তরল ব্যবস্থাপনায় সর্বোচ্চ সতর্কতার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নতুন নির্দেশিকায় ব্যথা ও জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল ব্যবহারের অনুমোদন রয়েছে, যার দৈনিক সর্বোচ্চ মাত্রা ৩ গ্রাম। তবে, ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে প্রদাহ ও ব্যথানাশক নির্দিষ্ট শ্রেণির ওষুধ কিংবা স্টেরয়েড পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কারণ, ভুল ওষুধের ব্যবহারে রোগীর অভ্যন্তরীণ রক্তপাত ও মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে।
আরও পড়ুন
সংক্রমণের প্রথম পাঁচ দিনের মধ্যে রক্তের পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা (CBC), রক্তের ঘনত্ব (Hematocrit) ও এনএস-১ (NS1) অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাঁচ দিন পার হওয়ার পর আইজিএম (IgM) ও আইজিজি (IgG) অ্যান্টিবডি পরীক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রক্তে শ্বেত রক্তকণিকা ও অনুচক্রিকা (প্লাটিলেট) কমে যাওয়া এবং রক্তের ঘনত্ব ২০ শতাংশ বা তার বেশি বৃদ্ধি পাওয়াকে ডেঙ্গুর গুরুতর জটিলতার প্রধান লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
নির্দেশিকাটিতে শুধু হাসপাতালেই নয়, কমিউনিটি পর্যায়ে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা, চারপাশ পরিষ্কার রাখা এবং নিয়মিত মশারি ব্যবহারের প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, শিশু ও গর্ভবতী ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পৃথক ও বিশেষায়িত চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার নির্দেশনা রাখা হয়েছে।
এমএল/এমএআর
