বিজ্ঞাপন

‘স্যালাইন পাই, তবে বেশিরভাগ ওষুধ কিনতে হয় বাইরে থেকে’

‘স্যালাইন পাই, তবে বেশিরভাগ ওষুধ কিনতে হয় বাইরে থেকে’
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর চাপ কিছুটা বেড়েছে। চিকিৎসাসেবা নিয়ে রোগীদের কেউ কেউ সন্তুষ্টি প্রকাশ করলেও প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী বাইরে থেকে কেনার অভিযোগ তুলেছেন অনেকে।

গত বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সরেজমিনে হাসপাতালটির বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে এবং রোগীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া যায়। তবে, রোগীর চাপ বাড়লেও চিকিৎসার জন্য আসা কাউকে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান।

হাসপাতালের ৪০২ নম্বর ওয়ার্ডের বাইরে কথা হয় টঙ্গী থেকে আসা ডেঙ্গু রোগী ওমর ফারুকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি ১০ দিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ডেঙ্গুর কারণে আমার ফুসফুসে পানি জমেছে। হাসপাতাল থেকে স্যালাইন দেওয়া হলেও অন্যান্য দামি ইনজেকশন বাইরে থেকে কিনে আনতে হয়। আমরা গরিব মানুষ, প্রতিদিন ১ হাজার ৩০০ টাকার তিনটি ইনজেকশন কিনতে হচ্ছে। পাশাপাশি কলেরা স্যালাইনও বাইরে থেকে কিনতে হয়; হাসপাতাল থেকে কেবল সাধারণ স্যালাইন সরবরাহ করা হচ্ছে।’
 

চাঁদপুর থেকে এসে চার দিন ধরে ঢামেকে ভর্তি আছেন ২১ বছর বয়সি যুবক রিফাত। তিনি জানান, তার প্লাটিলেট কমে ৮০ হাজারে নেমে এসেছিল। হাসপাতাল থেকে স্যালাইন পেলেও অধিকাংশ ওষুধই বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে।

তবে, হাসপাতালে রোগীদের অভিজ্ঞতায় ভিন্নতাও রয়েছে। ৮০২ নম্বর ওয়ার্ডে তিন দিন ধরে চিকিৎসাধীন কুমিল্লার দাউদকান্দির রাবেয়া খাতুন জানান, তার যা চিকিৎসা দরকার সবই হাসপাতাল থেকে পেয়েছেন এবং বাইরে থেকে কোনো ওষুধ কিনতে হয়নি। অন্যদিকে, নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা ১১ বছরের শিশু মিশালের মা শারমিন জানান, চিকিৎসা ভালো পেলেও ওয়ার্ডের পরিবেশ বেশ গরম এবং একেকটি বেডে ২-৩ জন করে রোগী রাখতে হচ্ছে।

 

মশারি, পরিচ্ছন্নতা ও শয্যা সংকট

হাসপাতালের কয়েকজন কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সরকারি সরবরাহে নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ ছাড়া সব ধরনের ওষুধ থাকে না; ফলে রোগীদের প্রয়োজন অনুযায়ী কিছু ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়। এছাড়া, ডেঙ্গু রোগীদের মশারি দেওয়া হলেও প্রচণ্ড গরমের কারণে অনেকেই তা টাঙিয়ে ব্যবহারে আগ্রহ দেখান না।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীরা সাধারণ স্যালাইন পেলেও দামি ইনজেকশন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। নিম্নআয়ের রোগীদের প্রতিদিন গড়ে ১৩০০ টাকা পর্যন্ত ওষুধ কিনতে বাড়তি ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ বাজেটের সীমাবদ্ধতাকে দায়ী করলেও অধিকাংশ ওষুধ সরকারি সরবরাহ তালিকায় না থাকায় ডেঙ্গু রোগীদের অর্থনৈতিক ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করেছে
তবে, মশারি ও হাসপাতালের সার্বিক পরিচ্ছন্নতা নিয়ে রোগীদের রয়েছে ভিন্ন অভিযোগ। চিকিৎসাধীন আলাউদ্দিন বলেন, ‘হাসপাতাল থেকে মশারি দেওয়া হলেও তা অত্যন্ত নোংরা ও ব্যবহারের অনুপযোগী। তা ছাড়া মশারি টাঙানোর জন্য কোনো স্ট্যান্ডও নেই।’
 
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ‘হাসপাতালের অধিকাংশ বেডশিট এতটাই অপরিষ্কার ও দুর্গন্ধযুক্ত যে রোগীরা ব্যক্তিগত বেডশিট ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন। এমনকি মালামাল রাখার ড্রয়ারগুলোতে বিভিন্ন পোকামাকড়ের উপদ্রব থাকায় খাবার বা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিরাপদে রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
ওয়াশরুম ব্যবস্থাপনাকে সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে চিহ্নিত করে আলাউদ্দিন বলেন, ‘একেকটি ইউনিটে ৪০ জনের বেশি রোগীর সঙ্গে সমানসংখ্যক স্বজন থাকেন। অর্থাৎ প্রায় ৮০ জন মানুষের জন্য ব্যবহারযোগ্য ওয়াশরুম রয়েছে মাত্র দুটি, যা স্বাস্থ্যকর পরিবেশের জন্য একেবারেই অপর্যাপ্ত।’
 
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও ডেঙ্গু চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা
 
সার্বিক অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান জানান, সম্প্রতি ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়লেও চিকিৎসাসেবা নিতে আসা কাউকে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে না। ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনার জন্য হাসপাতালে পুরুষ ও নারীদের জন্য পৃথক ৪০ বেডের ডেডিকেটেড ওয়ার্ড রয়েছে এবং রোগীর সংখ্যা বাড়লে অতিরিক্ত শয্যারও ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
 
 

ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রীর সংকট প্রসঙ্গে ঢামেক পরিচালক বলেন, ‘হাসপাতালে পর্যাপ্ত পরিমাণ স্যালাইন, নাপা ও অন্যান্য সহায়ক চিকিৎসাসামগ্রীর মজুত রয়েছে। ডেঙ্গু চিকিৎসায় সাধারণত অ্যান্টিবায়োটিকের বিশেষ ভূমিকা নেই। তবে, মেরোপেনেমসহ প্রয়োজনীয় কিছু ইনজেকশন সরবরাহে রয়েছে। মূল বিষয় হলো, বাজেটের সীমাবদ্ধতার কারণে ঢালাওভাবে সব রোগীকে সব ধরনের ওষুধ দেওয়া সম্ভব হয় না; ফলে ক্ষেত্রবিশেষে রোগীদের কিছু ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হতে পারে।’

তিনি নিশ্চিত করেন যে, ডেঙ্গু রোগীদের নিবিড় পর্যবেক্ষণের জন্য একটি বিশেষায়িত চিকিৎসক দল কাজ করছে। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং কোনো রোগীর জরুরি আইসিইউ (ICU) সহায়তার প্রয়োজন হলে তাকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সেই সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান / ছবি- ঢাকা পোস্ট

ঢামেকে ভর্তি ও মৃত্যুর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৭ আগস্ট পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৩৯৯ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষ ৮৬৭ জন এবং নারী ৫৩২ জন। এ সময় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
 
ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে ১ হাজার ১২ জন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন, যার মধ্যে ৬৬৯ জন পুরুষ ও ৩৪৩ জন নারী। এছাড়া, ২২৮ জন রোগী চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় নিজ দায়িত্বে হাসপাতাল ত্যাগ করেছেন।
রোগীর অতিরিক্ত চাপের কারণে এক বেডে ২-৩ জন রোগীকে গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে। ওয়াশরুম সংকটের পাশাপাশি অপরিষ্কার বেডশিট ও ড্রয়ারে পোকামাকড়ের উপদ্রবে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। তা ছাড়া, সরকারি মশারিগুলো নোংরা ও টাঙানোর স্ট্যান্ড না থাকায় রোগীরা তা ব্যবহারে অনীহা দেখাচ্ছেন। একই সঙ্গে প্রতিটি ইউনিটে ৮০ জনের জন্য মাত্র দুটি ওয়াশরুম থাকায় চরম অসন্তোষ তৈরি হয়েছে
 
হাসপাতালের গত তিন বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৪ সালে ভর্তি হয়েছিলেন ৩ হাজার ৪০৯ জন এবং মারা যান ৯৫ জন। ২০২৫ সালে আক্রান্তের সংখ্যা কমে ৩৮৮ জনে দাঁড়ালেও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে হয়েছিল ১১৮। আর চলতি বছরের ২৭ আগস্ট পর্যন্ত ১ হাজার ৩৯৯ জন রোগী ভর্তি হওয়ার বিপরীতে ২৫ জনের মৃত্যুর তথ্য রেকর্ড করা হয়েছে।

এসএএ/এমএআর