বিজ্ঞাপন

কানের শোঁ শোঁ শব্দের নেপথ্যে রক্তনালির ব্লক, কাটাছেঁড়া ছাড়াই সফল চিকিৎসা

কানের শোঁ শোঁ শব্দের নেপথ্যে রক্তনালির ব্লক, কাটাছেঁড়া ছাড়াই সফল চিকিৎসা

কানে শোঁ শোঁ শব্দ, সঙ্গে মাথায় অস্বস্তি। দীর্ঘদিনের এ সমস্যায় রাতে ঘুমাতে পারতেন না গাইবান্ধার রবিউল ইসলাম। স্বাভাবিক কাজেও ব্যাঘাত ঘটছিল। বিভিন্ন চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় কয়েক লাখ টাকা ব্যয় করেও মিলছিল না সমাধান। একপর্যায়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে কয়েকবার আত্মহত্যার চিন্তাও করেছিলেন তিনি।

শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ধরা পড়ে, কানের এ শব্দের নেপথ্যে রয়েছে মস্তিষ্কের রক্তনালির জটিলতা। ভেনাস সাইনাসে সংকোচন বা ব্লক থাকায় হৃদস্পন্দনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কানে শব্দ শুনছিলেন রবিউল। পরে বড় ধরনের কাটাছেঁড়া ছাড়াই ক্যাথেটারের মাধ্যমে ওই রক্তনালিতে স্ট্যান্ট বসিয়ে সংকুচিত অংশ খুলে দেওয়া হয়। চিকিৎসকের দাবি, স্ট্যান্ট বসানোর পরপরই রবিউলের কানে থাকা শোঁ শোঁ শব্দ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

হৃদস্পন্দনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কানে ক্রমাগত শোঁ শোঁ বা স্পন্দনশীল শব্দ শোনার এ সমস্যাকে পালসেটাইল টিনিটাস বলা হয়। এ রোগের চিকিৎসায় দেশে প্রথমবারের মতো ভেনাস সাইনাস স্ট্যান্টিং করে সফলতা পাওয়ার দাবি করেছেন নিউরোইন্টারভেনশন বিশেষজ্ঞ ও জাতীয় নিউরোসায়েন্সেস ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হুমায়ুন কবীর হিমু।

ডা. হুমায়ুন কবীর হিমু বলেন, পালসেটাইল টিনিটাসের অনেকগুলো কারণ রয়েছে। এর বেশিরভাগই কানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তবে মস্তিষ্কের রক্তনালির বিভিন্ন সমস্যার কারণেও এ ধরনের শব্দ হতে পারে। মস্তিষ্কের রক্তনালিজনিত কারণগুলো তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত হওয়ায় অনেক রোগী দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে থাকেন।

তিনি বলেন, কানে শোঁ শোঁ, ভোঁ ভোঁ বা এ ধরনের অস্বস্তিকর শব্দ যদি হৃদস্পন্দনের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়, কিংবা গলার কাছে রক্তনালিতে চাপ প্রয়োগ করলে কানের শব্দ কমে বা বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে পালসেটাইল টিনিটাসের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হয়। মস্তিষ্কের রক্তনালির সমস্যাজনিত পালসেটাইল টিনিটাস শনাক্ত করতে রক্তনালির এনজিওগ্রাম বা ডিএসএ করা হয়। রোগের কারণ শনাক্ত হওয়ার পর চিকিৎসার পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়।

ভেনাস সাইনাস স্ট্যান্টিংয়ের বিষয়ে ডা. হুমায়ুন কবীর হিমু বলেন, পালসেটাইল টিনিটাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ হলো ভেনাস সাইনাস স্টেনোসিস বা সংকোচন। সংকুচিত অংশে স্ট্যান্ট বসিয়ে রক্তনালি খুলে দেওয়া হলে চাপ কমে যায়। এতে কানের শব্দের সমস্যাও ভালো হতে পারে।

রবিউলের চিকিৎসার বিষয়ে তিনি বলেন, রবিউল অনেক বছর ধরে পালসেটাইল টিনিটাসে ভুগছিলেন। ডিএসএ করার পর তার ভেনাস সাইনাসে ব্লক শনাক্ত হয়। পরে রক্তনালিতে স্ট্যান্ট বসিয়ে ব্লক খুলে দেওয়া হয়। স্ট্যান্ট বসানোর পরপরই তার কানে থাকা শোঁ শোঁ শব্দ চলে যায়।

ডা. হুমায়ুন কবীর হিমু বলেন, বিদেশে নিউরোইন্টারভেনশনের ওপর উচ্চতর প্রশিক্ষণের সময় পালসেটাইল টিনিটাসের এ ধরনের চিকিৎসা দেখেছেন। তখন থেকেই বাংলাদেশে এ রোগের চিকিৎসা নিয়ে কাজ করার আগ্রহ ছিল। প্রায় দেড় বছর আগে রবিউল তার কাছে চিকিৎসার জন্য আসেন। এরপর প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও পূর্বের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তার চিকিৎসার পরিকল্পনা করা হয়।

তিনি বলেন, দেশে পালসেটাইল টিনিটাসের চিকিৎসায় ভেনাস সাইনাস স্ট্যান্টিং আগে করা হয়নি। চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে তিনি তার মেন্টর ডা. শিরাজী শাফিকুল ইসলামের সঙ্গে আলোচনা করেন। তার পরামর্শ ও সহযোগিতায় চিকিৎসাটি করার সিদ্ধান্ত নেন। সফলভাবে চিকিৎসা সম্পন্ন হওয়ায় তিনি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানান।

চিকিৎসার পর রবিউল ইসলাম বলেন, কানের শোঁ শোঁ শব্দের কারণে আমি রাতে ঘুমাতে পারতাম না। কোনো কাজও করতে পারতাম না। কয়েকবার আত্মহত্যার চিন্তাও করেছি। সম্প্রতি মস্তিষ্কের রক্তনালিতে স্ট্যান্ট বসানোর পর থেকে কানে আর কোনো শব্দ হচ্ছে না। আমি এখন পুরোপুরি সুস্থ।

এমএল/আরএফ

বিজ্ঞাপন