চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুটি জেনারেটর থাকলেও সেগুলোর জন্য সরকারিভাবে জ্বালানি তেলের কোনো বরাদ্দ নেই। ফলে বিদ্যুৎ চলে গেলেই স্থবির হয়ে পড়ছে হাসপাতালের স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা। তীব্র গরম ও ভ্যাপসা আবহাওয়া রোগীদের ভোগান্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে; সুস্থ হতে এসে উল্টো আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন রোগীরা।
পাঁচ বছরের শিশুসন্তান ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হওয়ায় তাকে নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এসেছিলেন জোসনা আক্তার। কিন্তু শয্যায় (বেডে) নেওয়ার কিছুক্ষণ পরই চলে গেল বৈদ্যুতিক, বন্ধ হয়ে গেল মাথার ওপরের ফ্যান। হাসপাতালের অন্ধকারে তীব্র গরমের ভেতর অসুস্থ সন্তানকে কোলে চেপে হাতপাখা ঘোরাতে ঘোরাতে জোসনার আকুতি, ‘সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে যদি এমন নাজুক অবস্থা হয়, তাহলে আমরা সাধারণ গরিব মানুষ কোথায় যাব?’
জোসনা আক্তারের এই আকুতি কেবল একা তার নয়, আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসা প্রতিদিনের শত শত রোগী ও স্বজনের একই চিত্র। ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে উপজেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় এক হাজার মানুষ চিকিৎসার আশায় আসেন। তবে গরমের মধ্যে ঘন ঘন বিদ্যুৎ-বিভ্রাট, সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জেনারেটরের জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট। এর ওপর পুরুষ ওয়ার্ডের একমাত্র আইপিএসটিও সম্প্রতি নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে বিদ্যুৎ চলে গেলেই পুরো হাসপাতাল চত্বর ডুবে যাচ্ছে অন্ধকারে, আর চিকিৎসাসেবা হয়ে পড়ছে স্থবির।
মঙ্গলবার (গতকাল) রাত ও বুধবার (আজ) সকালে আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায় এক বিষাদময় দৃশ্য। পুরো হাসপাতাল চত্বর ঘুটঘুটে অন্ধকারে নিমজ্জিত। জেনারেটর ও আইপিএস বন্ধ। ওয়ার্ডের ভেতরের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা এতটাই বেশি যে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নেওয়াও কঠিন। গরমে কষ্ট পাচ্ছিলেন শয্যা ও মেঝেতে শুয়ে থাকা রোগীরা। শিশু, বৃদ্ধ ও গুরুতর অসুস্থদের স্বজনেরা অনবরত হাতপাখা ও কাগজের ঢাল দিয়ে বাতাস করার চেষ্টা করছেন। অনেকেই একটু খোলা বাতাসের আশায় ওয়ার্ড ছেড়ে করিডর, বারান্দা কিংবা হাসপাতালের বাইরে এসে আশ্রয় নিয়েছেন।
সম্প্রতি তীব্র গরমের কারণে এলাকায় ডেঙ্গু, ডায়রিয়া, জ্বর, সর্দি ও নিউমোনিয়ার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় বহির্বিভাগ ও অন্তর্বিভাগে রোগীর চাপ অনেক বেশি। ডায়রিয়া ও ডেঙ্গু রোগীদের পাশাপাশি শ্বাসকষ্ট নিয়ে আট দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি আছেন ৬০ বছর বয়সী আমির হোসেন। তিনি বলেন, ‘তারা বলছেন জ্বালানি নেই, জেনারেটর চালানো যাচ্ছে না। এমন অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে কষ্ট উল্টো আরও বেড়ে যাচ্ছে।’
তার স্ত্রী মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘দিনে অন্তত পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। মঙ্গলবার রাতে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর সামান্য সময় জেনারেটর চালালেও কিছুক্ষণ পরই তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই তীব্র গরমে সারা রাত হাতপাখা দিয়ে বাতাস করা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই।’
একই দুর্ভোগের শিকার ডেঙ্গু ও জ্বর নিয়ে ভর্তি হওয়া ১৭ বছর বয়সী মেরিন একাডেমি স্কুলের শিক্ষার্থী প্রিয়ান্তর দাশ। সে বলে, ‘জ্বরে শরীর পুড়ে যাচ্ছে, তার ওপর চারপাশের এই গরম। ভর্তি হওয়ার পর থেকেই দেখছি ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না, জেনারেটরও চালানো হয় না। চিকিৎসাসেবার এমন অবস্থায় আমাদের কষ্ট আরও বেড়ে যাচ্ছে।’
স্থানীয় বাসিন্দা আরিফ হোসেন বলেন, চিকিৎসকের উপস্থিতি থাকলেও হাসপাতালের সার্বিক সেবার মান নিয়ে মানুষের অভিযোগ রয়েছে। হাসপাতালের চারপাশের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও দুর্গন্ধের পাশাপাশি এখন বিদ্যুৎ-বিভ্রাটের ভোগান্তিও যুক্ত হয়েছে। তেলের অজুহাতে জেনারেটর বন্ধ রাখা কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা ছাড়া আর কিছু নয়।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে ২০১৮ সালে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০ কেভি ক্ষমতার একটি জেনারেটর এবং ২০২৪ সালে ৩০ কেভি ক্ষমতার আরও একটি জেনারেটর যুক্ত করা হয়। তবে দুটি জেনারেটর থাকলেও রোগীরা এর কোনো সুফল পাচ্ছেন না। জেনারেটর পরিচালনার জন্য সরকারিভাবে ডিজেলের কোনো বাজেট বরাদ্দ নেই। ফলে হাসপাতালের নিজস্ব সীমিত তহবিল থেকে সাময়িক তেল কিনে জরুরি প্রয়োজন মেটাতে হয়। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে এই ব্যয় বহন করা হাসপাতালের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে।
এ বিষয়ে আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘হাসপাতালে দুটি জেনারেটর থাকলেও সরকারিভাবে নির্দিষ্ট কোনো জ্বালানি তেল বা বাজেট বরাদ্দ নেই। দৈনিক তিন ঘণ্টা লোডশেডিং হলে জেনারেটর চালাতে প্রায় ২০ লিটার তেল প্রয়োজন হয়, যা মেটানো আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। বাধ্য হয়ে অপারেশন থিয়েটার বা অতি সংকটাপন্ন রোগী ছাড়া অন্য সময় জেনারেটর বন্ধ রাখতে হয়।’
তিনি আরও জানান, পুরুষ ওয়ার্ডে থাকা আইপিএসটিও নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সমস্যা আরও তীব্র হয়েছে। তবে বিকল্প উপায়ে পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা চলছে বলে দাবি করেন তিনি।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান মোবাইল ফোনে ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘বরাদ্দ মূলত মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া হয়। মন্ত্রণালয় থেকে তো প্রত্যেকটা আলাদা আলাদা উপজেলায়, আলাদা আলাদা কোডে দেয়। ফলে আমাদের হাতেও নেই।’
তিনি বলেন, ‘আমরা কথা বলেছি, বরাদ্দগুলো যাতে দ্রুত দিয়ে দেয়। সেটার জন্য আমরা ইতোমধ্যে চিঠিও দিয়েছি। এরপরও এটা কোন পর্যায়ে আছে, সেটা জেনে আপনাকে জানাব।’
হাসপাতালে বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রসঙ্গে আনোয়ারা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মোরশেদুল আলম ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘হাসপাতালকে কেন্দ্র করে আলাদা কোনো লোডশেডিং করা হচ্ছে না। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় জাতীয় লোডশেডিংয়ের অংশ হিসেবেই বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। বর্তমানে ২০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে প্রায় ১৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।’
এমআর/বিআরইউ
