করোনার উল্লম্ফনে এশিয়ার আকাশে মেঘের ঘনঘটা

Dhaka Post Desk

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

০৮ এপ্রিল ২০২১, ২২:২৩

করোনার উল্লম্ফনে এশিয়ার আকাশে মেঘের ঘনঘটা

বাংলাদেশ, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড-সহ এশিয়াজুড়ে আবারও করোনাভাইরাস সংক্রমণের উল্লম্ফন শুরু হয়েছে। যে কারণে এই অঞ্চলে করোনাভাইরাস মহামারির ভয়াবহ পরিস্থিতি উতড়ে যাওয়ার সতর্ক প্রত্যাশার আকাশে এখন মেঘের ঘনঘটা। আর এতে নতুন হুমকি তৈরি করেছে করোনাভাইরাসের টিকা সরবরাহে বিলম্ব।

ভারতে বৃহস্পতিবার নতুন করে রেকর্ড এক লাখ ২৬ হাজার ৭৮৯ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। চলতি সপ্তাহে টানা তিন দিন ধরে দেশটিতে এক লাখের বেশি করে করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছেন। করোনার এই ঊর্ধ্বগতিতে বিস্মিত দেশটির কর্তৃপক্ষ জনগণের মাস্ক পরতে অনীহা এবং দোকানপাট ও অন্যান্য অফিস পুনরায় খুলে দেওয়ার ওপর দায় চাপাচ্ছে।

দেশটিতে করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধিতে অতি-সংক্রামক ধরনগুলো ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন স্থানীয় মহামারি বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ব্রিটেন, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ব্রাজিলে প্রথম শনাক্ত হওয়া অতি-সংক্রামক ধরন ভারতে শত শত রোগীর দেহে মিলছে।

উদ্বেগজনক হারে রোগী শনাক্ত হওয়ায় ভারত থেকে যেকোনো মানুষের ভ্রমণের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে নিউজিল্যান্ড। এমনকি প্রথমবারের মতো নিজ নাগরিকদেরও দুই সপ্তাহের জন্য দেশে ফেরায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে নিউজিল্যান্ড।

অকল্যান্ডে এক সংবাদ সম্মেলনে দেশটির প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্ডার্ন বলেছেন, ‌‘আমরা সাময়িকভাবে ভ্রমণকারীদের ভারত থেকে  নিউজিল্যান্ডে প্রবেশ স্থগিত করছি।’ নিউজিল্যান্ড দেশের সীমানার ভেতরে করোনাভাইরাস আক্ষরিকভাবে নির্মূল করতে সক্ষম হলেও বৃহস্পতিবার সেখানে নতুন করে ২৩ জন শনাক্ত হয়েছেন; তাদের মধ্যে ১৭ জন ভারত ফেরত।

মহামারির প্রথম বছরে অন্য দু’টি দেশ— থাইল্যান্ড এবং দক্ষিণ কোরিয়া করোনাভাইরাসকে মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। সম্প্রতি আবারও করোনাভাইরাসের নতুন ঢেউ শুরু হয়েছে; তারপরও এই দুই দেশে আক্রান্তের সংখ্যা ভারতের তুলনায় অনেক কম। 

বৃহস্পতিবার দক্ষিণ কোরিয়ায় নতুন ৭০০ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছেন; যা গত জানুয়ারির শুরুর দিকের পর একদিনে সর্বোচ্চ। দেশটির প্রধানমন্ত্রী করোনার উত্থান ঠেকাতে নতুন সামাজিক দূরত্ব বিধি-বিধান জরুরি বলে সতর্ক করে দিয়েছেন।

অত্যন্ত সতর্কতার সাথে দেশের পর্যটন শিল্প পুনরায় খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা করা থাইল্যান্ডেও সংক্রমণ বাড়ছে। দেশটিতে বৃহস্পতিবার ৪০৫ জন সংক্রমিত হয়েছেন। এ নিয়ে দেশটিতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৩০ হাজার ৩১০ জনে পৌঁছেছে এবং মারা গেছেন ৯৫ জন। নতুন আক্রান্তদের মধ্যে ২৪ জনের শরীরে ব্রিটেনে প্রথম শনাক্ত হওয়া অতি-সংক্রামক করোনার ধরনটি পাওয়া গেছে। এই ধরনটি স্থানীয়ভাবেও ছড়িয়ে পড়ছে; যা দেশটির কর্তৃপক্ষের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।

ইউরোপের বেশ কিছু অঞ্চলেও সংক্রমণ বাড়তে শুরু করেছে। তবে সংক্রমণের জন্য দক্ষিণ আমেরিকা বিশ্বে সবচেয়ে উদ্বেগজনক অঞ্চলে হিসেবে শনাক্ত হয়েছে। এই অঞ্চলের প্রায় প্রত্যেক দেশেই সংক্রমণের গতি ঊর্ধ্বমুখী বলে বুধবার প্যান আমেরিকান হেলথ অর্গানাইজেশনের (পিএএইচও) পরিচালক জানিয়েছেন।

স্থগিত হয়ে যাচ্ছে টিকাদান

এশিয়ায় যখন সংক্রমণের লাগাম ছুটছে, তখন এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে অন্যতম একটি ভ্যাকসিনের সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ ক্রমবর্ধমান হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বুধবার ইউরোপীয় মেডিসিন্স অ্যাজেন্সি (ইএমএ) বলছে, অ্যাস্ট্রাজেনেকার কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন নেওয়া কিছু ব্যক্তির ক্ষেত্রে তারা রক্ত জমাট বেঁধে যাওয়ার বিরল ঘটনা খুঁজে পেয়েছে। যদিও সংস্থাটি বলছে, ভ্যাকসিনের উপকারিতার তুলনায় এই ঝুঁকি খুবই নগন্য।

রক্ত জমাট বেঁধে যাওয়ার সঙ্গে ভ্যাকসিনের সম্ভাব্য সম্পর্কের আশঙ্কায় ৬০ বছরের কম বয়সীদের জন্য অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা প্রয়োগ স্থগিত করেছে দক্ষিণ কোরিয়া এবং ফিলিপাইন। অস্ট্রেলিয়াও বৃহস্পতিবার ৫০ বছরের নিচের জনগোষ্ঠীর জন্য এই টিকা প্রয়োগ বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ভ্যাকসিন নিয়ে উদ্বেগের কারণে এশিয়ায় টিকাদান কর্মসূচি বিলম্বিত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই অঞ্চলের কিছু দেশ ইতোমধ্যে ভ্যাকসিন সরবরাহ সঙ্কটের মুখোমুখি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনের তুলনায় এশিয়ার সিংহভাগ অংশ টিকাদানে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। ২ কোটি ৬০ লাখ মানুষের অস্ট্রেলিয়ায় যে লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে টিকাদানের কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে, সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এখনো ৮০ শতাংশ পিছিয়ে আছে দেশটি।

গত মার্চ পর্যন্ত দেশটিতে ৪০ লাখ মানুষকে ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু সেই সময় পর্যন্ত মাত্র ৬ লাখ ৭০ হাজার ভ্যাকসিন ডোজের সরবরাহ পেয়েছে দেশটি। ভ্যাকসিনের সরবরাহ সঙ্কটের জন্য ইউরোপকে দায়ী করছে অস্ট্রেলিয়া সরকার।

ভারতজুড়েই যখন করোনা সংক্রমণ লাগামহীন গতিতে ছুটছে; তখন সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত প্রদেশ মহারাষ্ট্র-সহ অনেক অঞ্চলের ভ্যাকসিন কেন্দ্রে সরবরাহ ফুরিয়ে আসছে। ২০১৯ সালের শেষের দিকে করোনাভাইরাসের উৎপত্তি হওয়া চীনে পুরোদমে টিকাদান কর্মসূচি চলছে। দেশটিতে শুধুমাত্র বুধবারই ৩০ লাখ ৬৮ হাজার ডোজ ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত দেশটিতে ১৪ কোটি ৯০ লাখের বেশি মানুষকে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে।

টিকাদানে বিশ্বের প্রধান অর্থনীতির দেশগুলোর চেয়ে অনেক পিছিয়ে রয়েছে জাপান। দেশটিতে মাত্র একটি ভ্যাকসিনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশটিতে প্রায় ১০ লাখ মানুষ ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ পেয়েছেন। তবে সম্প্রতি দেশটিতে করোনা সংক্রমণ ফের বৃদ্ধি পেয়েছে।

বৃহস্পতিবার রাজধানী টোকিওতে ৫৪৫ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। যা দেশটিতে গত বছর স্থগিত হয়ে যাওয়া অলিম্পিক এবং প্যারা-অলিম্পিক আগামী জুলাইয়ের শেষের দিকে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তাতে শঙ্কা তৈরি করেছে।

সূত্র: রয়টার্স।

এসএস

Link copied