আজকের সর্বশেষ

করোনায় চিকিৎসা নেই, মোদির আসনে বাড়ছে ক্ষোভ

Dhaka Post Desk

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

০৪ মে ২০২১, ১৭:৩১

করোনায় চিকিৎসা নেই, মোদির আসনে বাড়ছে ক্ষোভ

হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান বারানসি শহর ও আশপাশের এলাকায় তীব্র হয়ে উঠেছে করোনার সংক্রমণ। হাসপাতাল ও চিকিৎসা কেন্দ্রের অভাবে চিকিৎসা পাচ্ছেন না সেখানকার অনেক মানুষ; এর ফলে ক্ষোভ মাথাচাড়া দিচ্ছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সংসদীয় আসনে।

উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর করোনা সংক্রমণ শুরুর পর থেকে বারানসি জেলায় করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন মোট ৭০ হাজার ৬১২ জন, মারা গেছেন ৬৯০ জন। এর মধ্যে ৪৬ হাজার ২৮০ জন (৬৫ শতাংশ) আক্রান্ত হয়েছেন গত এপ্রিল মাসে। সরকারি তথ্য বলছে, এপ্রিলের ১ তারিখ থেকে প্রতিদিন বারানসি ও এর আশপাশের এলাকায় ১৫-১৬ জন মারা যাচ্ছেন।

তবে স্থানীয় লোকজন ও জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, আক্রান্ত ও মৃত্যুর যে হিসাব সরকার দিয়েছে, সেটি কেবল বারনসির নগর অঞ্চল এবং যেসব এলাকায় হাসপাতাল রয়েছে সেখানকার তথ্য। বাস্তবে এই সংখ্যা আরো কয়েকগুণ বেশি।

উত্তরপ্রদেশের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকরা বারানসিতে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে বলেছেন— প্রথমত, এমনিতেই বারানসির স্বাস্থ্য পরিষেবা কাঠামো নড়বড়ে, তার ওপর দিল্লি ও মহারাষ্ট্রে লকডাউন আরোপ হওয়ায় সেখান থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শ্রমিক বাড়ি ফিরে এসেছেন, ফলে আক্রান্ত ও মৃত্যুর তালিকা প্রতিদিনই বাড়ছে সেখানে।

বারানসি শহর সংলগ্ন চিরাইগাঁ পঞ্চায়েতের প্রধান সুধির সিং পাপ্পু ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যম বিবিসিকে জানান, তার পঞ্চায়েতে ১১০টি গ্রাম আছে। সম্প্রতি এই গ্রামগুলোর প্রতিটিতে প্রতিদিন ৫-১০ জন মানুষ মারা যাচ্ছেন। কোনো কোনো দিন দৈনিক মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় ১৫-৩০ পর্যন্ত।

সুধির সিং পাপ্পু বলেন, ‘এই পঞ্চায়েতে কোনো সরকারি হাসপাতাল নেই। প্রত্যন্ত গ্রামগুলোর বাসিন্দাদের পক্ষে বারানসির সরকারি হাসপাতালগুলোতে গিয়ে রোগী ভর্তি করা সম্ভব নয়। আমরা একেবারেই নিরুপায় অবস্থার মধ্যে পড়েছি, কোথাও আমাদের যাওয়ার জায়গা নেই।’  

চিরাইগাঁ পঞ্চায়েতের অন্তর্ভুক্ত এধি গ্রামের বাসিন্দা কমল কান্ত পান্ডে বিবিসিকে বলেন, ‘আপনি যদি এই মুহূর্তে আমাদের গ্রামের সব বাসিন্দার করোনা টেস্ট করেন, অন্তত অর্ধেকই পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত হবেন। গ্রামের প্রচুর মানুষ কাশি, জ্বর, গা ব্যথা, দুর্বলতাসহ করোনার যাবতীয় লক্ষণে ভুগছেন।’

‘কিন্তু হাসপাতাল বা চিকিৎসা কেন্দ্র না থাকায় এ গ্রামের অধিকাংশ লোকজন টেস্ট করাতে পারছেন না। কোনো মেডিকেল টিমও এ পর্যন্ত এখানে আসেনি।’

‘এটা আমাদের প্রধানমন্ত্রীর আসন আর এখানেই আমরা করোনায় দমবন্ধ হয়ে মরছি। অন্যান্য অঞ্চলের অবস্থা আরো ভয়াবহ।’

বারানসি শহরের প্রধান দুটি শ্মশানের নাম হরিশচন্দ্র ঘাট ও মানিকরানিকা ঘাট। শ্মশান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত মাস থেকে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা চিতা জ্বলছে শ্মশানগুলোতে।

creamation

হরিশচন্দ্র ঘাট শ্মশান সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি বিবিসিকে বলেন, কিছুদিন আগেও যেখানে প্রতিদিন খুব বেশি হলে ৮০ থেকে ৯০টি মৃতদেহের শেষকৃত্য হতো, সেখানে গত মাস থেকে প্রতিদিন ৩০০-৪০০ মৃতদেহের সৎকার হচ্ছে সেখানে। তিনি আরো জানান, মানিকরানিকা ঘাটের অবস্থাও একইরকম।

বারানসির হাসপাতালগুলোর অবস্থাও বর্তমানে সঙ্গীন। অতিরিক্ত রোগীর চাপে প্রায় ভেঙে পড়ার অবস্থায় পৌঁছেছে হাসপাতালগুলো। সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগী ভর্তির আর জায়গা নেই, বেসরকারি হাসাপতালগুলো সেবার চার্জ বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েকগুণ। ফলে গ্রামাঞ্চল ও শহরের দরিদ্র জনগোষ্ঠী তো বটেই, অনেক মধ্যবিত্ত করোনা রোগীর জন্যও দুর্লভ হয়ে উঠেছে চিকিৎসা সেবা।

হাসপাতালগুলোতে শয্যা ও মেডিকেল অক্সিজেন সংকট তীব্র হয়ে উঠেছে। এমনকি অনেক হাসপাতাল ও ওষুধের দোকানে করোনা চিকিৎসায় ব্যবহৃত সাধারণ ওষুধ— ভিটামিন ট্যাবলেট, জিংক ও প্যারাসিটামলও শেষ হয়ে গেছে।

বারানসিরর সরকারি হাসপাতালের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিবিসিকে বলেন, ‘এখানে অধিকাংশ হাসপাতালগুলোতে রোগী ভর্তি করার জন্য কোনো শয্যা অবশিষ্ট নেই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মেডিকেল অক্সিজেন ও অতিরিক্ত শয্যা চেয়ে বারবার প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন, কিন্তু কোনো লাভ হচ্ছে না।’

‘এমনকি চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয় এমন সাধারণ ওষুধগুলোর জোগানও শেষ হয়ে গেছে। অনেক রোগী এ কারণে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ খাচ্ছেন।’

মোদির বিরুদ্ধে ক্ষোভ

২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বারানসি থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সম্প্রতি করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে থাকায় মোদির বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ছে সেখানকার মানুষের।

election
২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচন

তাদের অভিযোগ, এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে তারা একদিকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করতে পারছেন না, অন্যদিকে স্থানীয় বিজেপি নেতারাও তাদের কোনো খোঁজ খবর রাখছেন না। উপরন্তু, স্থানীয় বিজেপি নেতাদের অনেকেই তাদের ফোন নাম্বার বন্ধ রেখেছেন।

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন নরেন্দ্র মোদি। নির্বাচন উপলক্ষ্যে এ পর্যন্ত ১৭ বার পশ্চিমবঙ্গে গিয়েছিলেন তিনি। নিজের এলাকার প্রতি নজর না দিয়ে রাজনৈতিক কর্মসূচিকে গুরুত্ব দেওয়া এই ক্ষোভ সৃষ্টির একটি বড় কারণ বলে মনে করছেন ভারতের রাজনীতি বিশ্লেষকদের একাংশ।

বারনসির এক রেস্তোঁরা মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিবিসিকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ও উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী বারানসির জনগণকে নিজেদের ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিয়ে নিজেরা আত্মগোপনে আছেন। স্থানীয় বিজেপি নেতারাও ফোন বন্ধ রেখেছেন। বারানসিসহ উত্তরপ্রদেশ জুড়ে এখন প্রায় নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি। জনগণ খুবই ক্ষুব্ধ।’

লোকসভায় বিজেপির প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের বারানসি শাখার নেতা গৌরব কাপুর বিবিসিকে বলেন, ‘কর্তৃপক্ষ যদি সময়মতো যথাযথ পদক্ষেপ নিত, তাহলে বারনসিতে আজ এই দিন দেখতে হতো না। শাসক দলের অবহেলার কারণেই আজ এখানে করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর মিছিল শুরু হয়েছে।’

‘এই আসনের জনপ্রতিনিধি হিসেবে এর দায় অবশ্যই নরেন্দ্র মোদিকে নিতে হবে। কোনোভাবেই তিনি এ দায় এড়াতে পারেন না।’

সূত্র: বিবিসি

এসএমডব্লিউ/জেএস

 

Link copied