বৈশ্বিক অর্থনীতির মঞ্চে নতুন অবস্থানে ভারত

২০২৫ সাল শেষ হওয়ার আগেই জাপানকে ছাড়িয়ে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে ভারত। দেশটির সরকারের বছর শেষের অর্থনৈতিক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, আগামী তিন বছরের মধ্যে জার্মানিকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার আশা করছেন নীতিনির্ধারকরা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) বেড়ে ৪ দশমিক ১৮ ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে; যা যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও জার্মানির পর চতুর্থ বৃহত্তম।
তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সরকারি স্বীকৃতি নির্ভর করবে ২০২৬ সালে প্রকাশিত দেশটির বার্ষিক জিডিপির চূড়ান্ত তথ্যের ওপর। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ২০২৬ সালের পূর্বাভাসে ভারতের অর্থনীতির আকার ধরা হয়েছে ৪ দশমিক ৫১ ট্রিলিয়ন ডলার, যেখানে জাপানের জন্য ধরা হয়েছে ৪ দশমিক ৪৬ ট্রিলিয়ন ডলার।
ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার সম্প্রতি প্রকাশিত ‘২০২৫: ভারতের প্রবৃদ্ধির জন্য নির্ধারক এক বছর’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলছে, ‘‘বিশ্বের দ্রুততম প্রবৃদ্ধিশীল প্রধান অর্থনীতির দেশগুলো একটি ভারত এবং এই গতি ধরে রাখার ক্ষেত্রে ভালো অবস্থানে রয়েছে... ৪ দশমিক ১৮ ট্রিলিয়ন ডলারের জিডিপি নিয়ে ভারত জাপানকে ছাড়িয়ে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ৭ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য জিডিপি নিয়ে আগামী আড়াই থেকে তিন বছরের মধ্যে তৃতীয় স্থান থেকে জার্মানিকে সরিয়ে দেওয়ার পথে রয়েছে।’’
রাশিয়া থেকে তেল কেনায় গত আগস্টে নয়াদিল্লির ওপর বড় ধরনের শুল্ক আরোপ করে ওয়াশিংটন। মার্কিন শুল্ক নিয়ে দেশটিতে ব্যাপক অর্থনৈতিক উদ্বেগ তৈরি হলেও ভারতের সরকার অর্থনীতির আকার আরও বাড়তে যাচ্ছে বলে প্রত্যাশা করছে। ভারতের সরকার বলেছে, দেশের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি প্রমাণ করে, দেশ ‘‘স্থিতিশীল বৈশ্বিক বাণিজ্য অনিশ্চয়তার মধ্যেও দৃঢ়তা’’ দেখাতে সক্ষম হয়েছে।
আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ভারত বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়। ওই সময় দেশটির জিডিপি সাবেক ঔপনিবেশিক শাসক ব্রিটেনকে ছাড়িয়ে যায়।
• যেসব ক্ষেত্রে ভারতের আরও কাজ করা প্রয়োজন
জনসংখ্যার দিক থেকে ভারত ২০২৩ সালে প্রতিবেশী চীনকে ছাড়িয়ে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশে পরিণত হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এখনও বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি, দ্বিতীয় স্থানে চীন এবং তৃতীয় স্থানে রয়েছে জার্মানি।
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি ছিল ২ হাজার ৬৯৪ ডলার; যা জাপানের ৩২ হাজার ৪৮৭ ডলারের তুলনায় ১২ গুণ কম এবং জার্মানির ৫৬ হাজার ১০৩ ডলারের তুলনায় ২০ গুণ কম।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভারতের ১৪০ কোটি মানুষের মধ্যে এক-চতুর্থাংশেরও বেশি মানুষের বয়স ১০ থেকে ২৬ বছরের মধ্যে। ফলে দেশটিকে লাখ লাখ তরুণ স্নাতকের জন্য ভালো বেতনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে।
গত বছরের ডিসেম্বরের শুরুর দিকে ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির মূল্য রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যায়। এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি না হওয়া এবং দেশের পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্কের প্রভাব নিয়ে চলা উদ্বেগ কাজ করে।
• প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস
ভারতের সরকার বলেছে, বিশ্বের অন্যতম নবীন দেশগুলোর একটি হিসেবে ভারতের প্রবৃদ্ধির গল্প নির্ভর করছে এমন মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরির সক্ষমতার ওপর; যা সম্প্রসারিত শ্রমশক্তিকে উৎপাদনশীলভাবে অন্তর্ভুক্ত এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করবে।
বিশ্বব্যাংক ২০২৬ সালে ভারতের প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। মার্কিন রেটিং এজেন্সি মুডিস বলছে, ভারত ২০২৬ সালে ৬ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে জি-২০ দেশগুলোর মধ্যে দ্রুততম প্রবৃদ্ধিশীল অর্থনীতিতে পরিণত হবে।
আইএমএফ ২০২৫ সালে দেশটির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়িয়ে ৬ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ২০২৬ সালের জন্য ৬ দশমিক ২ শতাংশ করেছে। ওইসিডি ২০২৫ সালে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ২০২৬ সালে ৬ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে।
এ ছাড়া এসঅ্যান্ডপি চলতি অর্থবছরে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং পরবর্তী অর্থবছরে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আশা করছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ২০২৫ সালের পূর্বাভাস বাড়িয়ে ৭ দশমিক ২ শতাংশ করেছে। শক্তিশালী ভোক্তা চাহিদার কারণে ফিচ ২০২৬ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়িয়ে ৭ দশমিক ৪ শতাংশে উন্নীত করেছে।
বিজেপি সরকার বলেছে, ভারত বিশ্বের দ্রুততম প্রবৃদ্ধিশীল প্রধান অর্থনীতির দেশগুলোর একটি এবং এই গতি ধরে রাখার ক্ষেত্রে ভালো অবস্থানে রয়েছে। স্বাধীনতার শতবর্ষে ২০৪৭ সালে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা অর্জনের লক্ষ্যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কাঠামোগত সংস্কার ও সামাজিক অগ্রগতির শক্ত ভিত্তির ওপর এগোচ্ছে ভারত।
সূত্র: এনডিটিভি।
এসএস