ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র?

Dhaka Post Desk

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

২৯ জুন ২০২১, ০৫:৩৮ পিএম


ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র?

সিরিয়া এবং ইরাকে ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সম্প্রতি যে হামলা চালিয়েছেন তা প্রথমও নয়, আবার তার সদ্য যাত্রা শুরু করা প্রেসিডেন্টের মেয়াদে শেষও নয়। বাইডেনের অনুসারি কিছু ডেমোক্র্যাটের কাছে এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে— এ ধরনের হামলা এবং পাল্টা হামলার যে পরিমাণ সেটি কী অঘোষিত যুদ্ধ নয়?

তারা বলছেন, যদি তাই হয়, তাহলে কংগ্রেসের সংশ্লিষ্টতা ছাড়াই ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি যুদ্ধের ঝুঁকি আছে এবং দুই দশকের ‌‘চিরকালীন যুদ্ধের’ পর এ ধরনের যুদ্ধ রাজনৈতিকভাবে আরও বেশি উদ্বেগজনক হতে পারে।

মার্কিন সিনেটের পররাষ্ট্রবিষয়ক একটি উপকমিটির ডেমোক্র্যাট দলীয় প্রধান সিনেটর ক্রিস মারফি রয়টার্সকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যদের বিরুদ্ধে যে ধরনের হামলা হচ্ছে এবং এখন তার প্রতিক্রিয়ার যে মাত্রা আমরা দেখাচ্ছি তাতে এটিকে যুদ্ধ না বলার পক্ষে যুক্তি দেওয়া কঠিন।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে নিমগ্ন থাকলে তার ভার আমেরিকান জনগণ বহন করতে পারবেন কি-না আমরা সেটি নিয়ে সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকি।

ইরানের সামরিক বাহিনীর শীর্ষ এক জেনারেলকে যুক্তরাষ্ট্র হত্যা করার পর চলতি বছরের জানুয়ারিতে ডেমোক্র্যাটরা যে ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা করেছিল উভয় দেশ তার কাছাকাছি পৌঁছেছিল। জেনারেলকে হত্যার প্রতিশোধ নিতে ইরাকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। এতে ইরাকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর শতাধিক সদস্য মস্তিষ্কের আঘাতজনিত অসুস্থতায় ভোগেন।

সেই সময় ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের সঙ্গেও মার্কিন বাহিনীর পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটে। সর্বশেষ গত রোববার যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান থেকে সিরিয়ায় দু’টি এবং ইরাকে একটি ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের অস্ত্রাগারে হামলা চালানো হয়েছে। পেন্টাগন বলছে, সিরিয়ায় মার্কিন কর্মকর্তা এবং স্থাপনার বিরুদ্ধে মিলিশিয়াদের হামলার সরাসরি জবাবে ওই হামলা হয়।

সোমবার সিরিয়ায় মার্কিন সৈন্যরা রকেট হামলার শিকার হয়েছেন; এই হামলাকে স্পষ্টভাবে প্রতিশোধ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এতে কোনও মার্কিন সৈন্য হতাহত হননি। পরে মার্কিন সামরিক বাহিনী ধেয়ে আসা রকেটের উৎপত্তিস্থল লক্ষ্য করে কামানের গোলাবর্ষণ করেছে।

আটলান্টিক কাউন্সিলের আবাসিক ফেলো এমা অ্যাশফোর্ড এক টুইট বার্তায় বলেছেন, অনেক মানুষ মনে করেন যে, চিরকালীন যুদ্ধ শব্দটি একটি আবেগময় শব্দ। কিন্তু আমরা রোববার যে ধরনের হামলা দেখেছি তার শালীন বর্ণনা তুলে ধরে; যে হামলার কোনও কৌশলগত লক্ষ্য নেই, লড়াইয়ের শেষ নেই, কেবলমাত্র স্থায়ী উপস্থিতি এবং ইটের বদলে পাটকেল মারার নীতি আছে।

সালামি-স্ল্যাইস দৃষ্টিভঙ্গি

হোয়াইট হাউস জোর দিয়ে বলেছে, রোববারের বিমান হামলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল ভবিষ্যতের উত্তেজনা কমিয়ে আনা এবং মার্কিন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মিলিশিয়াদের অভিযান ঠেকানোর লক্ষ্যে। এ ধরনের হামলাকে আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে বৈধ হিসেবে দেখছেন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও।

প্রেসিডেন্টকে সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ হিসেবে মার্কিন সংবিধানে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। রোববার এই নির্বাহী ক্ষমতার বিষয়ে জো বাইডেন বলেছেন, সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২ অনুযায়ী হামলা চালানোর নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা আছে। যারা এটি স্বীকার করতে রাজি নয়, তারাও স্বীকার করবেন।

মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের আইন উপদেষ্টার কার্যালয়ের সাবেক কর্মকর্তা ব্রায়ান ফিনুকেইন বলেছেন, অতীতের প্রশাসনের মতো যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসনও পাল্টাপাল্টি হামলাকে চলমান সংঘাতের অংশ হিসেবে দেখে না। তিনি বাইডেন প্রশাসনের এই দৃষ্টিভঙ্গির নাম দিয়েছেন সালামি-স্ল্যাইস।

বর্তমানে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপে কর্মরত ফিনুকেইন বলেছেন, তারা (বাইডেন প্রশাসন) এটাকে এখন অন্তর্বর্তীকালীন শত্রুতা হিসেবে চিহ্নিত করবেন। আমরা গত ফেব্রুয়ারিতে একটি হামলা-পাল্টা হামলার মুখোমুখি হয়েছিলাম। এজন্য সেই সময় যুদ্ধের ঘড়িটি ৬০ দিনের জন্য পুনরায় সেট করতে হয়েছিল।

চলমান সংঘাতকে ১৯৮০ সালে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ট্যাঙ্কার যুদ্ধের তুলনা করেছেন ফিনুকেইন। সেই সময় রোনাল্ড রিগান প্রশাসন প্রতি দফার লড়াইকে শেষ সংঘাত হিসেবে দেখেছিল। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরাকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর উপস্থিতির বিরুদ্ধে ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়ারা যে একটি টেকসই এবং ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা ছড়াচ্ছে তা বিবেচনায় নেবে না বাইডেন প্রশাসন। 

ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির মাইকেল নাইটস সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, মিলিশিয়ারা যে ধরনের ড্রোনের ব্যবহার করছে তাতে ঝুঁকি বাড়ছে। জিপিএসের মাধ্যমে মিলিশিয়ারা যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জোটের তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি করে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে নিখুঁতভাবে লক্ষ্য বানাচ্ছে।

তিনি বলেছেন, সংখ্যা এবং গুণগত মানের দিক থেকে ইরাকে মার্কিন জোটের ওপর ইরাকি মিলিশিয়াদের হামলা বৃদ্ধি পেয়েছে। এটা প্রতিরোধ করা না গেলে সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের স্থাপনায় আঘাত আরও বাড়বে।

ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির আরেক কর্মকর্তা ফিলিপ স্মিথ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে ওই অঞ্চলের বাইরে চলে যেতে বাধ্য করার পাশাপাশি অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের ব্যবহারে নিজেদের দক্ষতার ব্যাপারে ইরাকি সরকার এবং অন্যান্যদের সতর্কবার্তা দেওয়ায় মিলিশিয়াদের আরেক লক্ষ্য। এই মিলিশিয়ারা গোপন কিছু ক্রিয়াকলাপের সঙ্গে বাস করে; সেটাই এখন তারা করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের কিছু সদস্য এখন প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে যুদ্ধ সম্পর্কিত কিছু ক্ষমতা হ্রাসের বিষয়ে কাজ করছেন। ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিকান— উভয় পার্টির এই সদস্যরাই ইরাক, সিরিয়া এবং অন্যান্য এলাকায় মার্কিন হামলা চালানোর ঘটনাকে অতীতে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।

তবে ক্ষমতা কমে গেলেও তা জো বাইডেন অথবা যুক্তরাষ্ট্রের অন্য যেকোনও প্রেসিডেন্টের প্রতিরক্ষামূলক বিমান হামলা চালানোর এখতিয়ার কেড়ে নিতে পারবে না। জো বাইডেনের জাতীয় নিরাপত্তা দল সিরিয়া এবং ইরাকে মার্কিন বিমান হামলা নিয়ে ব্রিফ করলেও সিনেটর ক্রিস মারফি বলেছেন, ‌‘তিনি এখনও এটি নিয়ে উদ্বিগ্ন। ইরাকে মার্কিন সৈন্যরা ছিলেন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিরুদ্ধে লড়াই করতে, ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে নয়।’

তিনি বলেন, যুদ্ধ ক্ষমতার জন্য কংগ্রেসে যাওয়ার বিষয়ে বাইডেন যদি সতর্ক হন, তাহলে সম্ভবত মধ্যপ্রাচ্যে হস্তক্ষেপ সম্পর্কে মার্কিনিদের সংশয়ের দিকে তার নজর দেওয়া দরকার।

ক্রিস মারফি বলেন, কংগ্রেসে যদি ইরান সমর্থিত মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের অনুমোদন পেতে সমস্যা হয়, তাহলে এর পেছনে বড় কারণ হতে পারে আমাদের ভোটাররা এটি চান না। এবং এই বিষয়টিই সেই বিতর্কে অনুপস্থিত রয়েছে।

সূত্র: রয়টার্স।

এসএস

Link copied