গ্রহগুলোর কৈশোরের ‘ধকল’ কাটানোর সময়ের খোঁজ পেলেন বিজ্ঞানীরা

গ্রহগুলো যখন তৈরি হতে শুরু করে, অর্থাৎ শুরুর দিকে, যখনও তাদের কক্ষপথ সুশৃঙ্খল হয়ে ওঠে না, তখন বিভিন্ন আকারের মহাজাগতিক বস্তুর সঙ্গে এগুলোর সংঘর্ষ ঘটে; ঠিক যেমন পৃথিবীর সঙ্গে বিশাল এক বস্তুর ধাক্কায় তৈরি হয়েছিল চাঁদ।
এখন বিশ্বের বৃহত্তম রেডিও টেলিস্কোপ প্রকল্প ‘অ্যাটাকামা লার্জ মিলিমিটার/সাবমিলিমিটার অ্যারে’ (অ্যালমা) ব্যবহার করে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা নবজাতক নক্ষত্রকে ঘিরে গ্রহ তৈরির সেই বিশৃঙ্খল ‘কৈশোর’ সময়ের সন্ধান পেয়েছেন।
অ্যালমার অধীনে পরিচালিত ‘রিজলভ এক্সোকুইপার বেল্ট সাবস্ট্রাকচার্সের’ (আর্কস) অংশ হিসেবে পাওয়া এই সাফল্য বিজ্ঞানীদের কেবল গ্রহগুলোর বিবর্তন প্রক্রিয়া বুঝতে সাহায্য করবে না, বরং সৌরজগতের ইতিহাসের এক উত্তাল সময় সম্পর্কেও ধারণা দেবে; যার খোঁজ এতদিন ছিল না।
যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাটের ওয়েসলিয়ান ইউনিভার্সিটির গবেষক ও দলটির সহ-নেতা মেরেডিথ হিউজ এক বিবৃতিতে বলেছেন, “আমরা গ্রহ তৈরির ‘শৈশবের ছবি’ দেখেছি, কিন্তু এখন পর্যন্ত তাদের ‘কৈশোরের সময়টি’ ছিল এক রহস্যময় সূত্র। এই প্রকল্পটি আমাদের চাঁদের গর্ত, কুইপার বেল্টের গতিশীলতা এবং ছোট-বড় গ্রহের বেড়ে ওঠার বিষয়টি ব্যাখ্যা করার জন্য এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে দিয়েছে। এটা অনেকটা আমাদের সৌরজগতের পারিবারিক অ্যালবামে হারিয়ে যাওয়া পাতাগুলো নতুন করে জুড়ে দেওয়ার মতো।”
উত্তর চিলির আতাকামা মরুভূমিতে অবস্থিত ৬৬টি রেডিও টেলিস্কোপের সমন্বয়ে গঠিত ‘অ্যালমা’ ব্যবহার করে হিউজ ও তার সহকর্মীরা নবজাতক নক্ষত্রকে ঘিরে থাকা ধূলিকণার ২৪টি চাকতি (ডিস্ক) পর্যবেক্ষণ করেছেন। গ্রহ তৈরির পর অবশিষ্ট থাকা এসব ধ্বংসাবশেষ বা ডেব্রিস থেকেই মূলত এই পর্যবেক্ষণ চালানো হয়।
আর্কস দলের সদস্য এবং ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর অ্যাস্ট্রোনমির গবেষক থমাস হেনিং বলেন, ‘‘এই ধ্বংসাবশেষের চাকতিগুলো মূলত গ্রহ গঠন প্রক্রিয়ার সেই পর্যায়কে নির্দেশ করে যেখানে সংঘর্ষের আধিপত্য থাকে। অ্যালমার সাহায্যে আমরা ডিস্কগুলোর গঠন বিশ্লেষণ করতে পারছি, যা সেখানে গ্রহের উপস্থিতির ইঙ্গিত দেয়। পাশাপাশি ডিরেক্ট ইমেজিং এবং রেডিয়াল ভেলোসিটি পরীক্ষার মাধ্যমে আমরা এই সিস্টেমগুলোতে নতুন গ্রহের সন্ধান করছি।
সৌরজগতের ইতিহাসের এই সময়ের প্রমাণ পাওয়া যায় নেপচুনের কক্ষপথের বাইরে অবস্থিত ধূমকেতুর বরফ বলয়ে, যা ‘কুইপার বেল্ট’ নামে পরিচিত। কয়েকশো কোটি বছর আগে সূর্যের চারদিকে ঘটা বিশাল সব সংঘর্ষ এবং গ্রহগুলোর স্থান পরিবর্তনের মাধ্যমে এসব বস্তুর সৃষ্টি হয়েছিল; ঠিক সেই সময়েই পৃথিবীর চাঁদ গঠিত হচ্ছিল।
গ্রহের ‘শৈশবের ছবি’ পাওয়া তুলনামূলক সহজ, কারণ যে গ্যাসসমৃদ্ধ চাকতি বা প্রোটোপ্ল্যানেটারি ডিস্ক থেকে এগুলো তৈরি হয়, সেগুলো বেশ উজ্জ্বল থাকে। তবে অ্যালমার দেখা সেই ২৪টি ধ্বংসাবশেষের চাকতি বা ডেব্রিস ডিস্কগুলো এর চেয়ে হাজার গুণ বেশি অস্পষ্ট। আর ঠিক এ কারণেই দীর্ঘ বছর ধরে এগুলো বিজ্ঞানীদের ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল।
এই ডিস্কগুলোর জটিল কাঠামোর চিত্র তৈরির জন্য অ্যালমা সেখানকার ধূলিকণা এবং অন্যান্য অণু থেকে নির্গত রেডিও তরঙ্গ সংগ্রহ করেছে। এতে দেখা গেছে একাধিক বলয়, প্রশস্ত ও মসৃণ বহিঃবলয় (হ্যালো) এবং অপ্রত্যাশিত কিছু বক্ররেখার উপস্থিতি।
আর্কস দলের সদস্য এবং ইউনিভার্সিটি অব এক্সিটারের গবেষক সেবাস্তিয়ান মারিনো বলেন, “আমরা এখানে সত্যিকারের বৈচিত্র্য দেখতে পাচ্ছি। শুধু সাধারণ বলয় নয়, বরং বহু-বলয় বিশিষ্ট বেল্ট, হ্যালো এবং শক্তিশালী অসামঞ্জস্যতা দেখা যাচ্ছে। এটি গ্রহগুলোর ইতিহাসের গতিশীল অধ্যায়কে আমাদের সামনে উন্মোচিত করছে।”
এত সূক্ষ্ম তথ্য পাওয়ার মূল চাবিকাঠি হলো অ্যালমা ৬৬টি অ্যান্টেনা এবং এর ‘রেডিও ইন্টারফেরোমেট্রি’ প্রযুক্তি, যা যেকোনো একক টেলিস্কোপের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত দৃশ্যপট তুলে ধরতে সক্ষম। এর মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, গ্রহগুলোর এই কৈশোরকাল ছিল চরম অস্থিরতার এক সময়।
গবেষক দলের সদস্য এবং আয়ারল্যান্ডের ট্রিনিটি কলেজ ডাবলিনের লুকা মাত্রাঁ বলেন, “এই চাকতিগুলো এমন একটি সময়ের রেকর্ড ধরে রেখেছে যখন গ্রহগুলোর কক্ষপথ এলোমেলো হয়ে ছিল এবং পৃথিবীর চাঁদ তৈরির মতো বিশাল সব সংঘর্ষগুলো নতুন সৌরজগৎকে রূপ দিচ্ছিল।”
গেল ২০ জানুয়ারি ‘অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স’ সাময়িকীতে এই গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে।
সূত্র : স্পেসডটকম।
এনএফ
