আজও বিশ্বের বহু শহরের আভিজাত্য ও ঐতিহ্য বহন করছে ট্রাম

বাসের চেয়ে আরামদায়ক যাত্রা আর পাতাল রেলের চেয়ে বেশি দৃশ্যমান শহর—এই দুইয়ের মেলবন্ধনে এক অনন্য অভিজ্ঞতার নাম ট্রাম। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে অনেকের কাছে এটি কেবলই নস্টালজিয়া মনে হলেও, বাস্তবে বিশ্বের অনেক শহরে আজও এই ‘লোহার ঘোড়াই’ দৈনন্দিন যাতায়াতের মূল ভরসা। পর্যটকদের আকর্ষণের পাশাপাশি ট্রাম সেখানে শহরের ছন্দের নিয়ন্ত্রক এবং কর্মজীবী মানুষের বিশ্বস্ত নিত্যসঙ্গী।
বিশ্বের কোন কোন শহরে আজও ট্রাম শহরের জীবনের প্রাণ, চলুন জেনে নেই...
আমস্টারডাম : স্বাভাবিক জীবনধারা নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামে ট্রাম মানেই শহরের প্রাণস্পন্দন। ঐতিহাসিক ভবন, অসংখ্য খাল আর সাইকেলপথের বুক চিরে ট্রামের এই চলাচল এক নান্দনিক আবহ তৈরি করে। ঘনবসতিপূর্ণ এই শহরে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাওয়ার সবচেয়ে সহজ মাধ্যম এটি। এখানকার বাসিন্দাদের কাছে ট্রাম কোনো বিশেষ বাহন নয়, বরং তাদের জীবনযাত্রার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

হংকং : ডাবল ডেকার ট্রামের শহর এশিয়ার বুকে হংকংয়ের ডাবল ডেকার ট্রাম এক অনন্য দৃশ্য। ১৯০৪ সাল থেকে সগৌরবে চলতে থাকা এই ব্যবস্থা আজও সমান জনপ্রিয়। অত্যন্ত সাশ্রয়ী এবং ধীরগতিতে ব্যস্ত শহর দেখার সুযোগ থাকায় কর্মজীবী মানুষের পাশাপাশি পর্যটকরাও এটি বেছে নেন। দোতলা ট্রামের ওপর থেকে হংকংয়ের ব্যস্ত জনজীবন ও বিপণি বিতান দেখার অভিজ্ঞতা সত্যিই অতুলনীয়।
লিসবন : ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি পর্তুগালের লিসবন শহরের চরিত্র আর ট্রাম যেন একে অপরের পরিপূরক। সরু রাস্তা আর খাড়া পাহাড় বেয়ে ঐতিহাসিক হলুদ রঙের ট্রামগুলো যখন অলিগলি পেরিয়ে চলে, তখন মনে হয় যেন সময় থমকে আছে। বিশেষ করে ‘রুট ২৮’ এর মনোরম দৃশ্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এখানকার ট্রাম কেবল যাতায়াতের মাধ্যম নয়, বরং শহরের ইতিহাস ও সংস্কৃতির জীবন্ত প্রতীক।

মেলবোর্ন : বিশ্বের বৃহত্তম নেটওয়ার্ক অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন গর্বের সঙ্গে দাবি করতে পারে বিশ্বের বৃহত্তম ট্রাম নেটওয়ার্কের। শহরের কেন্দ্র থেকে উপশহর পর্যন্ত বিস্তৃত এই ব্যবস্থা প্রতিদিন লাখো মানুষের যাতায়াত সহজ করে দিচ্ছে। সিটির কেন্দ্রস্থলে বিনামূল্যের ট্রাম পরিষেবা মেলবোর্নকে বিশ্বের অন্যতম বাসযোগ্য শহরে পরিণত করেছে। স্থানীয়দের কাছে ট্রামই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও স্বাভাবিক বাহন।

প্রাগ : গণপরিবহনের মেরুদণ্ড ইউরোপের হৃদপিণ্ড খ্যাত প্রাগ শহরে ট্রামকে বলা হয় গণপরিবহনের মেরুদণ্ড। দিন-রাত কিংবা তীব্র তুষারপাত—যেকোনো পরিস্থিতিতেই প্রাগের ট্রাম অবিচল। ট্রামে চড়ে শহরের ঐতিহাসিক স্থাপত্য ও সেতু দেখার অভিজ্ঞতা পর্যটকদের মুগ্ধ করে। চেক প্রজাতন্ত্রের এই রাজধানী শহরের মানুষের কাছে ট্রাম মানেই সময়ের নিশ্চয়তা।
ভিয়েনা : আধুনিক ও সময়নিষ্ঠ অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা শহরের ট্রাম নেটওয়ার্ক ইউরোপের অন্যতম প্রাচীন এবং সময়নিষ্ঠ হিসেবে স্বীকৃত। আবাসিক এলাকা থেকে শুরু করে ঐতিহাসিক স্থানগুলোকে নিপুণভাবে যুক্ত করেছে এই নেটওয়ার্ক। ভিয়েনার ট্রাম কেবল অতীতের স্মৃতি নয়, বরং আধুনিক নগর পরিকল্পনার এক সফল উদাহরণ।

পরিবেশবান্ধব ও প্রাসঙ্গিক এই শহরগুলোর দিকে তাকালে স্পষ্ট বোঝা যায়, ট্রাম মোটেও সেকেলে বাহন নয়। এটি পরিবেশবান্ধব, শব্দদূষণমুক্ত এবং নগরের সঙ্গে গভীরভাবে মিশে থাকা এক পরিবহন ব্যবস্থা। দ্রুতগতির জীবনে যেখানে সবাই সময়ের পেছনে ছুটছে, সেখানে ট্রাম ধীর অথচ স্থির গতিতে শহরের প্রাণস্পন্দন বহন করে চলেছে। তাই আধুনিক নগর পরিকল্পনাতেও ট্রাম আজও সমান প্রাসঙ্গিক।
এমএন