সুষ্ঠু নির্বাচন, সেনা অভ্যুত্থান, ক্ষমতাচ্যুত, ভোট ডাকাতিসহ যা যা হয়েছে

দেশে এখন নির্বাচনের আমেজ। আর মাত্র চারদিন পর ১২ ফেব্রুয়ারি হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। এরআগে বাংলাদেশে ১২ বার ভোট হয়েছে। সেগুলোতে কারা জিতেছিল, পরে কি হয়েছিল, কারা ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিল, তার সব ঘটনা এক প্রতিবেদনে তুলে এনেছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা।
• ১৯৭৩
পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতার লাভের পর বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালের মার্চে প্রথম নির্বাচন হয়। এটি ছিল বিতর্কিত নির্বাচন। ওই নির্বাচনকে শেখ মুজিবুর রহমানের পরবর্তী স্বৈরশাসন নীতির নির্দেশক হিসেবে দেখা হয়।
৭৩ এর নির্বাচনে ১৪টি দল অংশগ্রহণ করলেও, আওয়ামী লীগ একাই ৭৩ শতাংশ ভোট এবং ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৩টি আসনে জয় পায়।
আল জাজিরা বলেছে, শেখ মুজিব ওই নির্বাচনে জয়ের ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকলেও ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে আলাদা ব্যবস্থা নেন। তিনি আগে থেকেই ব্যালট বাক্স ভরে রাখা এবং বিরোধী দলের নেতাদের গ্রেপ্তার করার মতো কাজ করেন। তৎকালীন বিরোধী জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল এবং জাতীয় লীগ মাত্র একটি করে আসন জিতেছিল।
১৯৭৪ সালে শেখ মুজিব সব বিরোধী রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ এবং এক দলীয় শাসন কায়েম করেন।
• ১৯৭৫ থেকে ১৯৮৬
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিব স্বপরিবারে মধ্যম সারির সেনা কর্মকর্তাদের অভ্যুত্থানে নিহত হন। এতে নেতৃত্ব দেন কর্নেল সৈয়দ ফারুক-উর-রহমান। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী খন্দকার মোস্তাক সেনাবাহিনীর সমর্থনে নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন।
তিনি একনায়কতন্ত্র বাতিল করে বিরোধী দলগুলোকে পুনর্গঠন করার সুযোগ দেন। কিন্তু ওই বছরের নভেম্বরে জেনারেল খালেদ মোশাররফের পাল্টা অভ্যুত্থানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। তখন প্রধান বিচারপতি সাদাত মোহাম্মদ সায়েম সেনাবাহিনীর সমর্থনে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৭৭ সালের এপ্রিলে অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন।
তখন তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ায় ওই সময় তিনি জনপ্রিয় ছিলেন।
আল জাজিরা বলেছে, জিয়াউর রহমানকে সমস্যায় জর্জরিত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কৃতিত্ব দেওয়া হয়। তিনি অর্থনীতিকে উদার করে দিয়েছিলেন। এছাড়া তিনি বাঙালির বদলে বাংলাদেশের মানুষকে বাংলাদেশি হিসেবে পরিচয় করানোর উদ্যোগ নেন। কারণ বাঙালির মাধ্যমে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীকে পরিচয় থেকে বঞ্চিত রাখা হচ্ছিল। তার আমলের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো— তিনি আবারও বহুদলীয় নির্বাচন ফিরিয়ে আনেন।
• ১৯৭৯
১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে আবারও নির্বাচন হয়। ১৯৭৩ সালের পর এটিই ছিল প্রথম নির্বাচন এবং এতে একাধিক দল অংশ গ্রহণ করে। নির্বাচনটি আয়োজন করে জিয়াউর রহমানের সরকার। সদ্য গঠিত বিএনপি ওই নির্বাচনে অংশ নিয়ে ৩০০ আসনের মধ্যে ২০৭ আসনে জয়ী হয়। আওয়ামী লীগ পায় ৩৯টি আসন। কিন্তু তারা নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলেছিল।
• ১৯৮১, ১৯৮৬ ও ১৯৮৮
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালের ৩০ মে সেনা অভ্যুত্থানে নিহত হন। তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দুস সাত্তার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হন এবং ওই বছরের নভেম্বরেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আয়োজন করেন।
এতে বিএনপি ৬৫ শতাংশ ভোট পায়। কিন্তু কয়েক মাস পর ১৯৮২ সালের মার্চে তৎকালীন সেনাপ্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ বিনা রক্তপাতের অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা দখল এবং সামরিক শাসন জারি করেন।
এরশাদ পরবর্তী চার বছর দেশ শাসন করেন এবং ১৯৮৬ সালে নির্বাচন দেন। তার গঠিত জাতীয় পার্টি ১৮৩টি আসনে জয়ী হয় এবং সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। বিএনপির মতো বিরোধী দলগুলো এটি বর্জন করে।
এরপর ১৯৮৮ সালের মার্চে আবারও নির্বাচন আয়োজন করেন এরশাদ। এতে জাতীয় পার্টি ২৫৯টি আসনে জয়ী হয়। ওই নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি ও হেরফের হয়েছিল। তখন এরশাদের পদত্যাগের দাবিতে দেশজুড়ে আন্দোলন শুরু হয়ে যায়।
• ১৯৯১
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে যৌথভাবে এরশাদবিরোধী আন্দোলন শুরু করে। এতে করে এরশাদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
তার পদত্যাগের পর একটি কেয়ারটেকার সরকার গঠিত হয়। এটির নেতৃত্ব দেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ। তিনি ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি নতুন নির্বাচন আয়োজন করেন। ওই নির্বাচনকে বেশিরভাগ দল বৈধতা দিয়েছিল।
এ নির্বাচনে বিএনপি ১৪০ আসন, আওয়ামী লীগ ৮৮ আসন এবং জাতীয় পার্টি ৩৫টি আসনে জয় পায়। খালেদা জিয়া তখন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন।
• ১৯৯৬
ওই বছর মাগুরা-২ আসনের উপনির্বাচন নিয়ে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হতে থাকে। উপনির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী জেতার পর আওয়ামী লীগ ভোট কারচুপির অভিযোগ তোলে এবং খালেদা জিয়াকে আগামী নির্বাচন আয়োজনের জন্য কেয়ারটেকার সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চাপ দেওয়া শুরু করে।
কিন্তু খালেদা জিয়া চাপ উপেক্ষা করে ক্ষমতাসীন অবস্থায় ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন আয়োজন করেন। কিন্তু এ নির্বাচন প্রায় সব বিরোধী দল বয়কট করে। সেটিতে মাত্র ২১ শতাংশ ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। অন্য দলগুলো নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় বিএনপি প্রায় সব আসনে জয়ী হয়।
কিন্তু অব্যাহত ধর্মঘটের কারণে নির্বাচনের মাত্র ১২ দিনের মাথায় বিএনপি সরকার কেয়ারটেকার সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। এরপর ওই বছরের মার্চে সংবিধানে পরিবর্তন এনে নির্বাচন আয়োজনের জন্য কেয়ারটেকার সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর বাধ্যতামূলক করা হয়।
এরপর সে বছরের ১২ জুন নির্বাচন হয়। এতে প্রায় ৭৫ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি ছিল। ওই নির্বাচনকে সুষ্ঠু হিসেবে দেখা হয়। সেবার শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৪৬টি আর বিএনপি ১১৬টি আসনে জয় পায়।
• ২০০১
২০০১ সালের অক্টোবরে কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে আরেকটি জাতীয় নির্বাচন হয়। ওই বছর বিএনপির জনপ্রিয়তা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পায়। দলটি একাই ১৯৩ আসনে জয় পায়। ভরাডুবি হয় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের। তারা মাত্র ৬২টি আসনে জিতেছিল।
নির্বাচন শান্ত পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু ওই সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর নির্যাতনের খবরও পাওয়া যায়। বিএনপি এত আসনে জেতার পর খালেদা জিয়া দ্বিতীয়বারের মতো সরকার গঠন করেন।
• ২০০৬ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা
২০০৬ সালে বিএনপি, বিরোধী দল আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে কেয়ারটেকার সরকারের প্রধান কে হবেন এ নিয়ে ব্যাপক দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল ২০০৭ সালে।
বিএনপি তাদের পক্ষ থেকে অবসরপ্রাপ্ত এক প্রধান বিচারপতিকে কেয়ারটেকার সরকারের প্রধান হিসেবে সমর্থন দেয়। এ নিয়ে শুরু হয় অস্থিরতা।
দলগুলো কেয়ারটেকার সরকার প্রধান নিয়ে ঐক্যে পৌঁছাতে না পারায় তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন আহমেদ নিজেকে কেয়ারটেকার সরকার প্রধান হিসেবে ঘোষণা করেন।
ওই বছরের নির্বাচনে ভোটার তালিকায় ব্যাপক অসঙ্গতি ছিল বলে জানা যায়। এ নিয়ে সারাদেশে ব্যাপক সহিংসতা শুরু হয়। দেশের স্কুল-কলেজ বন্ধ হয়ে যায়।
এমন পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন আহমেদ জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে আওয়ামী লীগ নির্বাচন থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়। ফলে নির্বাচন নির্ধারিত সময়ে হয়নি।
• ২০০৮
বিলম্বিত এ নির্বাচন অবশেষে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয়। এতে ভোট দেন ৮০ শতাংশ ভোটার; যা ইতিহাসে সর্বোচ্চ ছিল। এছাড়া ওই নির্বাচনকে সুষ্ঠু হিসেবেও দেখা হয়।
নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জোট গঠন করে ২৩০ আসনে জয় পায়। বিএনপি জেতে মাত্র ৩০ আসনে। ২০০৯ সালের জানুয়ারি নতুন সরকার গঠিত হয় এবং শেখ হাসিনা আবারও ক্ষমতায় ফেরেন।
• ২০১৪
২০০৭ সালের নির্বাচন বিলম্বের জন্য দেশের নিরাপত্তাবাহিনীকে দোষারোপ করতেন শেখ হাসিনা। তিনি ক্ষমতায় ফিরে সংবিধান পরিবর্তন করে কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দেন। ২০১১ সালের জুনে সংসদে কেয়ারটেকার সরকার নিয়ে হওয়া ভোট বর্জন করে বিএনপি। এটির পক্ষে ২৯১ জন এবং বিপক্ষে একজন ভোট দেন।
শেখ হাসিনা সরকার ওই সময় বিরোধী দলগুলোর ওপর দমন নিপীড়ন শুরু করে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়াকে গৃহবন্দি করা হয়। বিরোধী দলের ওপর ব্যাপক সহিংসতার কারণে বিএনপি ও তার সমর্থকরা ভোট বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়।
আওয়ামী লীগ ওই নির্বাচনে ২৩৪ আসন পায়। যেটি দেশে ও আন্তর্জাতিকভাবে অবৈধ নির্বাচন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
• ২০১৮
পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন হয় ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর। ওই বছর প্রথমবার ভোটে ইভিএম ব্যবহার করা হয়।
কিন্তু এতেও আওয়ামী লীগ কারচুপি করে এবং বিএনপি ও তার জোট দলের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়ন চালায়। এছাড়া আওয়ামী লীগ জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ এবং জামায়াতের একাধিক নেতাকে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ফাঁসি কার্যকর করে।
নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়াকে ১৭ মাসের কারাদণ্ড দিয়ে তাকে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে হাসিনার পতন হলে খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ওই মামলা থেকে খালাস দেওয়া হয়।
আওয়ামী লীগ ২০১৮ সালের নির্বাচনে ৯০ শতাংশের বেশি আসনে জয় পায়। এ নির্বাচন একটি পাতানো নির্বাচন হিসেবে পরিচিতি পায়।
• ২০২৪
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আরেকটি ভুয়া নির্বাচন হয় ২০২৪ সালে। বিএনপি নির্বাচন বয়কট করে এবং জামাত নিষিদ্ধ থাকায় অংশগ্রহণের কোনও সুযোগ পায়নি। সে বছরের ৭ জানুয়ারি নির্বাচন হয়। কিন্তু মাত্র সাত মাস পর গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পতন ঘটে এবং তিনি পালিয়ে ভারতে চলে যান।
সূত্র: আল জাজিরা।
এমটিআই