ট্রাম্পের আদায় করা শুল্কের ১৩৩ বিলিয়ন ডলার এখন কারা পাবেন?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জারি করা জরুরি শুল্ক ব্যবস্থা বাতিল করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট। সুপ্রিম কোর্টের এই সিদ্ধান্ত ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় ধাক্কা তৈরি করেছে। এমনকি সুপ্রিম কোর্টের এমন সিদ্ধান্ত মার্কিন প্রশাসনের অর্থনৈতিক ও পররাষ্ট্রনীতি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্মসূচির গতিপথ বদলে দিতে পারে।
তবে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে একটি প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। সেটি হলো, অবৈধ ঘোষণা করা আমদানি কর হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ইতোমধ্যে যে ১৩৩ বিলিয়ন ডলার আদায় করেছে; সেই অর্থের কী হবে এখন?
সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্টের বহুল প্রচারিত শুল্ক অবৈধ ঘোষণা করার পর যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয়স অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্র্যাট দলীয় গভর্নর জে বি প্রিৎজকার ট্রাম্পের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে তার রাজ্যের পরিবারগুলোর জন্য প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার শুল্ক ফেরতের দাবি জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, আপনার শুল্ক কর কৃষকদের জীবন তছনছ করে দিয়েছে, আমাদের মিত্রদের ক্ষুব্ধ এবং নিত্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী করেছে। ক্ষতিপূরণ না পেলে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন ইলিনয়সের এই গভর্নর।
চিঠিতে ডেমোক্র্যাট দলীয় ওই গভর্নর ইলিনয়সের প্রত্যেক পরিবারের জন্য প্রায় ১ হাজার ৭০০ ডলার দাবি করেছেন। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, গত বছর গড়ে প্রতিটি মার্কিন পরিবারকে ওই পরিমাণ অর্থ শুল্ক হিসেবে দিতে হয়েছে।
ভোক্তাদের ভোগান্তির প্রতিকারে রাজনৈতিক ও বাস্তবিক উভয় অর্থেই শুল্ক ফেরতের প্রিৎজকার কেবল একা জানাননি। বরং দেশটির বিভিন্ন কোম্পানিও শুল্ক ফেরতের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। তবে তাদের সামনে এগোনোর পথ বিশৃঙ্খল হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
• ট্রাম্পের শুল্ক ফেরত নিয়ে সংশয়
সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর যেসব কোম্পানি শুল্কের খরচ ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে বাড়তি দাম নিয়েছেন; তারা ফেরতের আশা করলেও সেটির সম্ভাবনা ক্ষীণ। যদিও ট্রাম্প শিবির আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিকভাবে আদায় করা শুল্ক ফেরতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু প্রশাসন বা সুপ্রিম কোর্ট কেউই বলেনি, প্রক্রিয়াটি কীভাবে চলবে।
সম্ভাব্য শুল্ক ফেরতের পরিমাণ বিপুল হতে পারে। প্রভাবশালী পেন-হোয়ার্টন বাজেট মডেলের হিসাব অনুযায়ী, শুল্ক ফেরতের পরিমাণ ১৭৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। যদিও শেষ পর্যন্ত কারা এই অর্থ পাবেন, সেটি পরিষ্কার নয়। তবে এই অর্থ সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছানোর চেয়ে কোম্পানিগুলোর কাছেই যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সাধারণ আমেরিকানরা সরাসরি ক্ষতিপূরণ পাবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।
ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন, শুল্ক ফেরতের যেকোনও প্রক্রিয়ায় কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। তিনি বলেছেন, আমার মনে হয়, আগামী দুই বছর বিষয়টি মামলা-মোকদ্দমায় চলবে। শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, শেষ পর্যন্ত আমরা আগামী পাঁচ বছর আদালতেই থাকব।
এটি তাদের জন্য কঠিন বাস্তবতা, যারা ৭৯ বছর বয়সী রিপাবলিকান নেতার কথায় শুল্ক থেকে ‘লভ্যাংশ’ পাওয়ার আশা করেছিলেন। গত বছর তিনি বারবার বলেছিলেন, আমাদের কাছে এত টাকা আসছে যে লাখ লাখ আমেরিকান ছাড় পাবেন।
• সামনে জগাখিচুড়ি
সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ভিন্নমত পোষণ করা ট্রাম্প-নিযুক্ত রক্ষণশীল বিচারপতি ব্রেট কাভানাফ বলেছেন, আমদানিকারকদের কাছ থেকে সরকারের আদায় করা বিলিয়ন ডলার কীভাবে ফেরত দেওয়া হবে এবং সরকার আদৌ ফেরত দেবে কি না; সুপ্রিম কোর্টের রায় আজ এই বিষয়ে কিছুই বলেনি।
গত বছরের নভেম্বরে মামলার শুনানিতে সংখ্যাগরিষ্ঠের পক্ষে থাকা বিচারপতি এমি কোনি ব্যারেট যে শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন, সেটিই ধার করে কাভানাফ সতর্ক করে দেন, ফেরত প্রক্রিয়াটি সম্ভবত একেবারে ‘জগাখিচুড়ি’ হয়ে যাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত শুল্ক হিসেবে ইতোমধ্যে ১৩৩ বিলিয়ন ডলার আদায় হয়েছে। তবে আমদানিকারকরা যদি কোনও ধরনের ভুল প্রমাণ করতে পারেন, তাহলে শুল্ক ফেরতের বিকল্প প্রক্রিয়া সংস্থাটির কাছে আছে বলেও জানিয়েছে।
• সমাধান কোন পথে?
মার্কিন আইনি প্রতিষ্ঠান ডরসি অ্যান্ড হুইটনির অংশীদার আইনজীবী ডেভ টাউনসেন্ড বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) বলেছেন, সংস্থাটি বিদ্যমান ব্যবস্থার ওপর ভর করে ট্রাম্পের আইইইপিএ শুল্ক ফেরতের উদ্যোগ নিতে পারে।
অতীতে বাণিজ্য সংক্রান্ত মামলায় আদালত কোম্পানিগুলোকে টাকা ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে; এমন নজির আছে। ১৯৯০-এর দশকে আদালত রপ্তানির ওপর আরোপিত হারবার মেইনটেন্যান্স ফি অসাংবিধানিক ঘোষণা করে রপ্তানিকারকদের ফেরত আবেদনের একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলে।
কিন্তু একসঙ্গে হাজার হাজার আমদানিকারক ও দশ বিলিয়ন ডলারের বেশি অঙ্ক; এমন পরিস্থিতি আগে কখনোই আদালত বা মার্কিন কাস্টমসকে সামলাতে হয়নি।
• ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ
দেশটির বাণিজ্য-সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা বলছেন, শেষ পর্যন্ত আমদানিকারকরা টাকা ফিরে পেতে পারেন। কিছুদিন পরিস্থিতি কিছুটা বিশৃঙ্খল থাকবে।
আইনি প্রতিষ্ঠান ক্লার্ক হিলেরর আইনজীবীদের মতে, ফেরত প্রক্রিয়াটি সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন, নিউইয়র্কের বিশেষায়িত কোর্ট অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড এবং অন্যান্য নিম্ন আদালতের সমন্বয়ে নির্ধারিত হবে।
আইনজীবী অ্যাডেটুটু বলেন, টাকার অঙ্ক বিশাল। আদালতগুলোর জন্যও কঠিন হবে। আমদানিকারকদের জন্যও কঠিন হবে। সুপ্রিম কোর্ট যেভাবে স্পষ্টভাবে ট্রাম্পের শুল্ক প্রত্যাখ্যান করেছে, তাতে কোনও না কোনও ধরনের ফেরতের বিকল্প ব্যবস্থা না রেখে দেওয়া খুবই কঠিন।
তবে আইনি প্রতিষ্ঠান ব্রায়ান কেভ লেইটন পেইসলনালের অংশীদার বাণিজ্য আইনজীবী অ্যালেক্সিস আর্লি বলেন, প্রক্রিয়াটি বাস্তবায়ন করা কঠিন হলেও সরকার অবৈধভাবে আদায় করা ফি রেখে দেওয়ার অধিকার পায় না।
কিং অ্যান্ড স্পাল্ডিংয়ের অংশীদার ও সাবেক মার্কিন বাণিজ্য কর্মকর্তা রায়ান মাজেরাস বলেন, বিপুল পরিমাণ শুল্ক ফেরতের দাবি সরকার কীভাবে মোকাবিলা করবে, তা বলা কঠিন। প্রক্রিয়াটি সহজ করতে তারা হয়তো একটি বিশেষ ওয়েবসাইট চালু করতে পারে; যেখানে আমদানিকারকরা ফেরতের দাবি জানাতে পারবেন।
সূত্র: এপি।
এসএস