যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লড়তে ইরানের হাতে কী কী অস্ত্র আছে?

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হওয়ার পর তেহরান অত্যন্ত দ্রুততার সাথে পাল্টা জবাব দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। ইরান জানিয়েছে, তাদের এই প্রতিশোধমূলক হামলার লক্ষ্যবস্তু হলো ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলো।
আঞ্চলিক শক্তি ও বিশ্ববাজারের সামনে এখন বড় প্রশ্ন হলো— এটি কি কেবল পাল্টাপাল্টি হামলার একটি চক্র হয়ে থাকবে, না কি এটি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের আওতা, তাদের মিত্র বাহিনী এবং জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর চাপের মাধ্যমে একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে রূপ নেবে?
এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার এবং তাদের হাতে থাকা অন্যান্য মারণাস্ত্রের মধ্যে।
কেন এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন?
২০২৫ সালের জুন মাসে ইরান যে ১২ দিনের যুদ্ধের মুখোমুখি হয়েছিল, এবারের পরিস্থিতি তার চেয়ে আলাদা। খামেনির হত্যাকাণ্ড তেহরানকে বিশ্বাস করতে বাধ্য করেছে যে, এটি এখন ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। তেহরানের ভাষ্যমতে, এখন যদি তারা সংযম দেখায় বা প্রতিশোধ নিতে দেরি করে, তবে তাকে দুর্বলতা হিসেবে দেখা হবে এবং তা আরও বড় হামলার পথ প্রশস্ত করবে।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কৌশল : শক্তি, পাল্লা ও পরিকল্পনা
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং বৈচিত্র্যময়। আধুনিক বিমান বাহিনীর অভাব দূর করতে তারা ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ মিসাইলের ওপর চরমভাবে নির্ভরশীল।
পাল্লা : ইরানের দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ২,০০০ থেকে ২,৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত যেতে পারে। এর মানে হলো, এগুলো দিয়ে ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের যেকোনো মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত করা সম্ভব। তবে ট্রাম্পের দাবি সত্ত্বেও, এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর পক্ষে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র (১৫০–৮০০ কিমি)
এগুলো মূলত নিকটবর্তী লক্ষ্যবস্তু এবং দ্রুত হামলার জন্য তৈরি। ‘ফাত্তাহ’ ভেরিয়েন্ট, ‘জুলফিকার’, ‘কিয়াম-১’ এবং পুরনো ‘শাহাব-১/২’ এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত। ২০২০ সালে কাসেম সোলাইমানি হত্যার পর ইরাকের আইন আল-আসাদ ঘাঁটিতে এই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র দিয়েই ইরান হামলা চালিয়েছিল, যা যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে সক্ষম হয়েছিল।
মধ্যপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র (১,৫০০–২,০০০ কিমি)
এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোই যুদ্ধকে আঞ্চলিক রূপ দেয়। ‘শাহাব-৩’, ‘ইমাদ’, ‘ঘদর-১’, ‘খোররামশাহর’ এবং ‘সেজ্জিল’—এই সিস্টেমগুলো দিয়ে ইরান অনেক দূর পর্যন্ত আঘাত করতে পারে। বিশেষ করে ‘সেজ্জিল’ কঠিন জ্বালানিচালিত হওয়ায় এটি খুব দ্রুত উৎক্ষেপণ করা যায়, যা যুদ্ধের ময়দানে ইরানকে বাড়তি সুবিধা দেয়। এর আওতায় কাতার, বাহরাইন, কুয়েত, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মার্কিন ঘাঁটিগুলো পড়ে।
ক্রুজ মিসাইল ও ড্রোন : রাডারের চোখ ফাঁকি দেওয়ার অস্ত্র
ক্রুজ মিসাইলগুলো মাটির খুব কাছ দিয়ে উড়ে যায় বলে এগুলো শনাক্ত করা কঠিন। ‘সুমার’ (পাল্লা ২,৫০০ কিমি), ‘ইয়া-আলি’, ‘পাভেহ’ এবং ‘রাদ’ ইরানের শক্তিশালী ক্রুজ মিসাইল। এর সাথে যুক্ত হয় ড্রোন। এগুলো ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে ধীরগতির হলেও সস্তা এবং একসাথে শত শত ড্রোন (ঝাঁক বেঁধে) উৎক্ষেপণ করে শত্রুর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যস্ত রাখা যায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বন্দর বা বিমানবন্দর অচল করে রাখতে এটি ইরানের প্রধান হাতিয়ার।
ভূগর্ভস্থ ‘মিসাইল সিটি’ : টিকে থাকার লড়াই
ইরান বছরের পর বছর ধরে তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের একটি বড় অংশ মাটির নিচে সুড়ঙ্গ এবং সুরক্ষিত ঘাঁটিতে লুকিয়ে রেখেছে। একে তারা ‘মিসাইল সিটি’ বলে থাকে। ফলে প্রথম দফার বড় কোনো হামলায় ইরানের সব সক্ষমতা ধ্বংস করা অসম্ভব। এই টিকে থাকার ক্ষমতার কারণেই পশ্চিমা সামরিক পরিকল্পনাকারীরা ইরানের সাথে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের আশঙ্কা করছেন।
হরমুজ প্রণালী : বিশ্ব অর্থনীতিতে আঘাত
ইরানের যুদ্ধের ময়দান কেবল স্থলের লক্ষ্যবস্তুতে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের একটি বিশাল অংশ যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে যায়, তা ইরানের নিয়ন্ত্রণে।
নৌ-যুদ্ধ : ইরান তাদের অ্যান্টি-শিপ মিসাইল, নৌ-মাইন এবং দ্রুতগতির অ্যাটাক ক্রাফটের মাধ্যমে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিতে পারে।
হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র : ইরান দাবি করেছে তাদের ‘ফাত্তাহ’ সিরিজের হাইপারসনিক মিসাইল অত্যন্ত গতিশীল এবং অপরাজেয়। ইতোমধ্যে বিশ্বের বৃহত্তম শিপিং গ্রুপ ‘মায়েরস্ক’ (Maersk) এই প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল স্থগিত করেছে, যা বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।
তেহরানের বার্তা : কোনো ‘সীমিত’ যুদ্ধ নয়
ইরানি কর্মকর্তারা দীর্ঘকাল ধরে হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছেন যে, তাদের মাটিতে কোনো হামলা হলে তাকে কেবল একটি ‘অপারেশন’ হিসেবে দেখা হবে না, বরং একে ‘পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ’ হিসেবে গণ্য করা হবে। খামেনির মৃত্যুর পর এই অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে। ইরান এখন কেবল একটি বড় হামলা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী প্রচারণার (Campaign) ইঙ্গিত দিচ্ছে। এতে লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরাও যোগ দিতে পারে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে ঠেলে দেবে।
প্রক্সি গ্রুপগুলোর ভূমিকা
ইরানের সামরিক কৌশলের অন্যতম শক্তিশালী স্তম্ভ হলো তাদের ‘প্রক্সি নেটওয়ার্ক’ অর্থাৎ আঞ্চলিক মিত্র বাহিনী। ইরান একে ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ (Axis of Resistance) বলে অভিহিত করে। খামেনির মৃত্যুর পর এই গোষ্ঠীগুলো কেবল ইরানের হয়ে লড়াই করছে না, বরং তারা এই যুদ্ধকে তাদের নিজেদের অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে দেখছে।
লেবাননের হিজবুল্লাহ : ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হিজবুল্লাহ কেবল একটি গোষ্ঠী নয়, এটি বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অ-রাষ্ট্রীয় সামরিক বাহিনী। তাদের ভাণ্ডারে প্রায় ১.৫ লক্ষ থেকে ২ লক্ষ রকেট ও মিসাইল রয়েছে, যা ইসরায়েলের যেকোনো প্রান্তে আঘাত হানতে সক্ষম। খামেনির মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে তারা উত্তর ইসরায়েলে নিয়মিত হামলা চালাচ্ছে। এর ফলে ইসরায়েলকে তাদের বিশাল একটি সৈন্যদল উত্তর সীমান্তে আটকে রাখতে হচ্ছে, যা ইরানের ওপর সরাসরি হামলা চালানোর ক্ষেত্রে ইসরায়েলি সক্ষমতাকে কিছুটা কমিয়ে দেয়। হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা সিরিয়া যুদ্ধে সরাসরি অভিজ্ঞ। তারা ইরানের হয়ে আঞ্চলিক সমন্বয়কের কাজ করে।
ইয়েমেনের হুথি (আনসারুল্লাহ) : লোহিত সাগরের ত্রাস হুথিরা ইরানের দূরপাল্লার ড্রোন এবং অ্যান্টি-শিপ মিসাইল প্রযুক্তির প্রধান ব্যবহারকারী। তারা লোহিত সাগর এবং এডেন উপসাগরে ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালাচ্ছে। এর ফলে বিশ্ব বাণিজ্যের একটি বড় অংশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। হুথিরা সরাসরি ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর শহর ‘এইলাত’ (Eilat) এবং এমনকি তেল আবিব লক্ষ্য করে ড্রোন ও মিসাইল ছুড়ছে। তারা মূলত পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করতে ইরানকে সাহায্য করছে।
ইরাক ও সিরিয়ার শিয়া মিলিশিয়া : ইরাকের ‘কাতায়িব হিজবুল্লাহ’ এবং ‘হরকত আল-নুজাবা’-র মতো গোষ্ঠীগুলো ইরানের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। ইরাক ও সিরিয়ায় অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে (যেমন- আইন আল-আসাদ, আল-তানফ) তারা নিয়মিত ড্রোন ও রকেট হামলা চালাচ্ছে। সোমবার কুয়েতে যে মার্কিন দূতাবাসের কাছে ধোঁয়া দেখা গেছে বা জর্ডানে মার্কিন বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার খবর এসেছে, তাতে এই গোষ্ঠীগুলোর হাত থাকার সম্ভাবনা প্রবল। তারা যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তাড়ানোর জন্য এই সুযোগকে ব্যবহার করছে।
ফিলিস্তিনের হামাস ও ইসলামি জিহাদ : গাজা যুদ্ধে হামাস অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তবুও তারা গাজার ভেতর থেকে ইসরায়েলি সৈন্যদের ব্যস্ত রাখছে। এটি ইসরায়েলকে দ্বি-মুখী বা ত্রি-মুখী যুদ্ধের চাপে ফেলে দিচ্ছে।
লেখক : এনেস আবুওমর, আল-জাজিরা।
এমএআর/