অপারেশন এপিক ফিউরি: ইরান যুদ্ধের ব্যয় বহনে যুক্তরাষ্ট্র কতটা প্রস্তুত?

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দীর্ঘদিনের স্নায়ুযুদ্ধ গত শনিবার এক নতুন ও ভয়াবহ মোড় নিয়েছে। এদিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে বিমান হামলা শুরু করার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাতের সূচনা হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, এই অভিযান অন্তত চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে। এমতাবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, মধ্যপ্রাচ্যে এই নতুন যুদ্ধের ব্যয়ভার বহন করার সক্ষমতা ওয়াশিংটনের আছে কি না এবং এর শেষ কোথায়?
অপারেশন এপিক ফিউরি কী?
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিশ্চিত করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অভ্যন্তরে একটি ‘বড় ধরনের সামরিক অভিযান’ শুরু করেছে। পেন্টাগন পরবর্তীতে এই মিশনের নাম দেয় ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’।
ট্রাম্পের ভাষ্যমতে, এই অভিযানের মূল লক্ষ্য হলো ইরান যাতে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে তা নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের ক্ষেপণাস্ত্র শিল্পকে গুঁড়িয়ে দেব এবং মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেব।’
মার্কিন সামরিক বাহিনীর তথ্যমতে, শনিবার থেকে এখন পর্যন্ত ইরানে ১,২৫০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে। সেন্টকম (CENTCOM) জানিয়েছে, তারা ইরানের ১১টি জাহাজ ধ্বংস করেছে। এই অভিযানে বিমান হামলা, সমুদ্র থেকে উৎক্ষিপ্ত ক্রুজ মিসাইল এবং ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে সমন্বিত আক্রমণ চালানো হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্পের ঘোষিত ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র মূল লক্ষ্য ইরানের পারমাণবিক স্বপ্ন ও ক্ষেপণাস্ত্র শিল্পকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া। সেন্টকমের তথ্যমতে, এই অভিযানে ইতিমধ্যে তেহরানে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ পাঁচ শতাধিক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। ১,২৫০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনে ইরানকে সামরিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়াই এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রধান লক্ষ্য
উল্লেখ্য, যুদ্ধের প্রথম ধাপেই তেহরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হয়েছেন। সোমবার পর্যন্ত পাওয়া তথ্যমতে, ইরানের ১৩০টি স্থানে হামলায় অন্তত ৫৫৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ব্যয়ের খতিয়ান
ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ‘কস্টস অব ওয়ার’ রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে প্রায় ২১.৭ বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা দিয়েছে। এছাড়া ইয়েমেন, ইরান এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের সমর্থনে মার্কিন অভিযানে আরও ৯.৬৫ থেকে ১২.০৭ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। ফলে গত দেড় বছরে এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩১.৩৫ থেকে ৩৩.৭৭ বিলিয়ন ডলারে।
ব্যবহৃত সমরাস্ত্র ও প্রযুক্তির বহর
সেন্টকম (CENTCOM)-এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ অভিযানে আকাশ, জল, স্থল এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ২০টিরও বেশি সমরাস্ত্র প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।
সেন্টকম আরও জানিয়েছে, এই অভিযানে ইরানের অভ্যন্তরে এখন পর্যন্ত ১,০০০-এরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে সফলভাবে আঘাত হানা হয়েছে। এই হামলায় আকাশপথের বোমারু বিমান, সমুদ্র থেকে উৎক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র এবং স্থলভিত্তিক বিভিন্ন আধুনিক প্রতিরক্ষা সরঞ্জামসহ বৈচিত্র্যময় সব মারণাস্ত্র মোতায়েন করা হয়েছে।
সেন্টকম-এর সাবেক অপারেশন ডিরেক্টর কেভিন ডনেগান আল-জাজিরাকে এই অভিযানের কৌশলগত উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের মূল লক্ষ্য হলো ইরানের আক্রমণাত্মক সক্ষমতাকে যত দ্রুত সম্ভব ভোঁতা বা দুর্বল করে দেওয়া, যাতে তারা আর ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে না পারে। মূল উদ্দেশ্য হলো— এই হামলাগুলো পুরোপুরি বন্ধ করা, অথবা অন্ততপক্ষে যতটা সম্ভব ইরানকে কোণঠাসা করে ফেলা।’
যুক্তরাষ্ট্র এই অভিযানে তার ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক বহর মোতায়েন করেছে। বি-২ স্টিলথ বোমারু বিমান, এফ-৩৫ ফাইটার জেট এবং সমুদ্রের বুক থেকে ‘ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড’ ও ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ বিমানবাহী রণতরীর মাধ্যমে বহুমুখী হামলা চালানো হচ্ছে। রাডার অকেজো করার প্রযুক্তি থেকে শুরু করে টমাহক ক্রুজ মিসাইল— প্রতিটি পদক্ষেপে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে আকাশ ও জলপথের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়েছে
আকাশ, জল ও স্থলে অপ্রতিরোধ্য শক্তি
ইরানের সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত অভিযানে পেন্টাগন তার ইতিহাসের অন্যতম অত্যাধুনিক এবং শক্তিশালী সমরসম্ভার মোতায়েন করেছে। আকাশপথের একচ্ছত্র আধিপত্য থেকে শুরু করে সমুদ্রের গভীর থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ— প্রতিটি পদক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহার করছে তাদের সর্বশেষ প্রযুক্তির যুদ্ধবিমান, ড্রোন এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
বিমান বাহিনীর শক্তি (Air Power) : এই অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপকভাবে তাদের আকাশপথের শক্তির ওপর নির্ভর করছে। অভিযানে ব্যবহৃত প্রধান বিমান ও প্রযুক্তিগুলো হলো—
• বি-১ (B-1) বোমারু বিমান : দূরপাল্লার ভারী বোমারু বিমান হিসেবে এটি ব্যবহৃত হচ্ছে।
• বি-২ (B-2) স্টিলথ বোমারু বিমান : ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানার জন্য এগুলো মোতায়েন করা হয়েছে।
• এফ-৩৫ (F-35) লাইটনিং ২ ও এফ-২২ (F-22) র্যাপ্টর : আকাশপথের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে এই উন্নত প্রযুক্তির রাডার-ফাঁকি দিতে সক্ষম (স্টিলথ) যুদ্ধবিমানগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে।
• এফ-১৫ (F-15) ফাইটার জেট : এগুলো ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে; তবে ১ মার্চ কুয়েতের আকাশে এক দুর্ঘটনায় তিনটি এফ-১৫ বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে।
• এফ-১৬ (F-16) ফাইটিং ফ্যালকন, এফ/এ-১৮ (F/A-18) সুপার হর্নেট এবং এ-১০ (A-10) অ্যাটাকার জেট : সরাসরি আক্রমণ এবং সম্মুখ সমরে সহায়তার জন্য এই বিমানগুলোর উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে।
• ইএ-১৮জি (EA-18G) গ্রাউলার : শত্রুপক্ষের রাডার ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অকেজো করে দিতে এবং ইলেকট্রনিক হামলার জন্য এগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে।
• আওয়াকস (AWACS) : এটি মূলত আকাশে একটি নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে, যা পুরো যুদ্ধক্ষেত্রের ব্যবস্থাপনা এবং কমান্ড ও কন্ট্রোল নিয়ন্ত্রণ করছে।
ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ‘কস্টস অব ওয়ার’ রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে প্রায় ২১.৭ বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা দিয়েছে। এছাড়া ইয়েমেন, ইরান এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের সমর্থনে মার্কিন অভিযানে আরও ৯.৬৫ থেকে ১২.০৭ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। ফলে গত দেড় বছরে এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩১.৩৫ থেকে ৩৩.৭৭ বিলিয়ন ডলারে
ড্রোন এবং দূরপাল্লার আক্রমণ ব্যবস্থা : এই অভিযানে চালকবিহীন বিমান (ড্রোন) এবং রকেট আর্টিলারির আধুনিক সমন্বয় লক্ষ্য করা গেছে। সেগুলো হলো—
• লুকাস (LUCAS) ড্রোন : ইরান অভিযানের মাধ্যমেই প্রথমবারের মতো ‘লুকাস’ ড্রোনের রণক্ষেত্রে ব্যবহার শুরু হলো। এটি মূলত একটি সাশ্রয়ী মূল্যের ‘ওয়ান-ওয়ে’ (একবার ব্যবহারযোগ্য) আক্রমণকারী ড্রোন। মজার ব্যাপার হলো, ইরানের নিজস্ব ড্রোনের নকশাকে ‘রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা অনুকরণ করেই এটি তৈরি করা হয়েছে।
• এমকিউ-৯ (MQ-9) রিপার ড্রোন : এটি মূলত নজরদারি এবং নিখুঁত নিশানায় সুনির্দিষ্ট হামলার জন্য (Precision Strike) সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
• এম-১৪২ (M-142) হিমার্স (HIMARS) : এটি ভূমি থেকে নিক্ষেপণযোগ্য অত্যন্ত গতিশীল ও শক্তিশালী রকেট আর্টিলারি ব্যবস্থা।
• টমাহক ক্রুজ মিসাইল : নৌবাহিনীর জাহাজ ও সাবমেরিন থেকে এই শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্রগুলো লক্ষ্যবস্তুতে নিক্ষেপ করা হচ্ছে।
ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা : ইরানের দিক থেকে ধেয়ে আসা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনগুলো রুখে দিতে যুক্তরাষ্ট্র অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা ঢাল ব্যবহার করছে। সেগুলো হলো—
• প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর মিসাইল সিস্টেম ও থাড (THAAD) : এই শক্তিশালী ব্যবস্থাগুলো মূলত ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনগুলোকে মাঝ আকাশেই ধ্বংস বা প্রতিহত করার জন্য মোতায়েন করা হয়েছে। ‘থাড’ (Terminal High Altitude Area Defense) অত্যন্ত উঁচুতে থাকা লক্ষ্যবস্তু নির্ভুলভাবে ধ্বংস করতে সক্ষম।
• কাউন্টার-ড্রোন সিস্টেম : ছোট এবং মাঝারি পাল্লার ড্রোন হামলা মোকাবিলায় বিশেষায়িত ড্রোন-বিরোধী প্রযুক্তিও এই অভিযানে সক্রিয় রাখা হয়েছে।
নৌ-শক্তির প্রদর্শন ও কৌশলগত অবস্থান : মার্কিন সামরিক বাহিনী এই অভিযানে তাদের নৌ-শক্তির বিশাল বহর মোতায়েন করেছে, যার মূল লক্ষ্য হলো সমুদ্রসীমা থেকে ইরানের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা। এর প্রধান অংশগুলো হলো—
• দুটি ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ : এই নৌ-বহরের নেতৃত্বে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দুটি বিমানবাহী রণতরী— ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড এবং ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন। এই বিশাল রণতরীগুলো মূলত সমুদ্রের বুকে ভাসমান এক একটি সামরিক ঘাঁটি, যা যুক্তরাষ্ট্রকে আকাশপথে বিধ্বংসী হামলা চালানোর ব্যাপক সক্ষমতা দিচ্ছে।
• পি-৮ পসাইডন (P-8 Poseidon) : এটি একটি অত্যাধুনিক নজরদারি বিমান। সমুদ্রে শত্রুপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করা, সাবমেরিন বিরোধী অভিযান পরিচালনা এবং সার্বক্ষণিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের কাজে এটি ব্যবহৃত হচ্ছে।
• কার্গো ও ট্যাঙ্কার বিমান : যুদ্ধের রসদ ও লজিস্টিকস সচল রাখতে ব্যবহার করা হচ্ছে সি-১৭ গ্লোবমাস্টার এবং সি-১৩০ হারকিউলিস-এর মতো শক্তিশালী মালবাহী বিমান। এছাড়া যুদ্ধবিমানগুলো যাতে দীর্ঘক্ষণ আকাশে থেকে মিশন পরিচালনা করতে পারে, সেজন্য বিভিন্ন ধরনের এরিয়াল রিফুয়েলিং ট্যাঙ্কার (আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান) নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ব্যয় কত?
একটি চলমান সামরিক অভিযানের মোট ব্যয় সুনির্দিষ্টভাবে বলা বেশ কঠিন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নতুন যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত মার্কিন কোষাগারের ওপর কতটা চাপ সৃষ্টি করবে, তা বলার সময় এখনও আসেনি।
স্টিমসন সেন্টারের সিনিয়র ফেলো ক্রিস্টোফার প্রিবল আল-জাজিরাকে বলেন, ‘পেন্টাগন এখনও এই সংক্রান্ত কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি, তাই আমরা কেবল অনুমানই করতে পারি। এখানে অনেকগুলো বিষয় জড়িত; আমরা একেকটি অস্ত্রের দাম বা নৌ-অপারেশনের মতো নির্দিষ্ট কার্যক্রমের খরচের ওপর ভিত্তি করে একটি ধারণা পেতে পারি।’
• প্রথম ২৪ ঘণ্টার খরচ : আনাদোলু নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র প্রথম ২৪ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের খরচ হয়েছে প্রায় ৭৭৯ মিলিয়ন ডলার।
• পূর্বপ্রস্তুতির ব্যয় : বিমানগুলোর অবস্থান পরিবর্তন, এক ডজনেরও বেশি নৌ-যান মোতায়েন এবং আঞ্চলিক সম্পদ ব্যবহারের মাধ্যমে হামলার আগের যে সামরিক প্রস্তুতি (Build-up), তার জন্য অতিরিক্ত আরও ৬৩০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
• রণতরীর দৈনিক খরচ : সেন্টার ফর নিউ আমেরিকান সিকিউরিটি-র তথ্যমতে, ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড-এর মতো একেকটি বিশাল ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ পরিচালনা করতে প্রতিদিন প্রায় ৬৫ লাখ (৬.৫ মিলিয়ন) ডলার খরচ হয়।
অপারেশন শুরুর প্রথম ২৪ ঘণ্টাতেই যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭৭৯ মিলিয়ন ডলার। এর বাইরে সামরিক প্রস্তুতির জন্য খরচ হয়েছে আরও ৬৩০ মিলিয়ন ডলার। একেকটি ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ পরিচালনা করতে প্রতিদিন গুনতে হচ্ছে ৬৫ লাখ ডলার। গত দেড় বছরে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৩.৭৭ বিলিয়ন ডলারে, যা মার্কিন অর্থনীতির দীর্ঘমেয়দে স্থিতিশীলতার ওপর বড় ধরনের চাপের সৃষ্টি করছে
সামরিক সরঞ্জামের ক্ষয়ক্ষতি ও মজুত নিয়ে উদ্বেগ
কেবল অভিযানের খরচই নয়, সামরিক সরঞ্জামের ক্ষয়ক্ষতিও এই যুদ্ধের ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। যেমন, কুয়েতে মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষায় একটি ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’ বা নিজেদের ভুল বোঝাবুঝির ঘটনায় অন্তত তিনটি মার্কিন যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আর্থিক সক্ষমতার চেয়েও বড় উদ্বেগের বিষয় হলো সমরাস্ত্রের মজুত (Inventory)।
প্রখ্যাত মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ এবং স্টিমসন সেন্টারের জ্যেষ্ঠ ফেলো ক্রিস্টোফার প্রিবল বলেন, ‘খরচের দিক থেকে এটি সামলানো সম্ভব। যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের এক ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেট রয়েছে এবং এটি ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার পরিকল্পনা চলছে। তাই এক ট্রিলিয়ন ডলার দিয়ে অনেক কিছুই করা সম্ভব। আসল প্রশ্ন হলো মার্কিন অস্ত্রাগারে থাকা অস্ত্রের প্রকৃত মজুত নিয়ে, বিশেষ করে ব্যালিস্টিক মিসাইল ঠেকানোর জন্য ব্যবহৃত প্যাট্রিয়ট (Patriot) বা এসএম-৬ (SM-6) এর মতো ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কতটুকু আছে।’
প্রিবল সতর্ক করে বলেন, আকাশপথে ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার এই উচ্চ হার অনির্দিষ্টকাল ধরে বজায় রাখা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ‘বর্তমান অভিযানের গতি এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তা বড়জোর কয়েক সপ্তাহ চলতে পারে, এর বেশি নয়।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, গত জুনে ইরানের সাথে ১২ দিনের সংঘাতের সময়ও একই ধরনের উদ্বেগ দেখা দিয়েছিল। তখন জল্পনা উঠেছিল যে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর ইন্টারসেপ্টর মজুত ফুরিয়ে আসছে। যদিও কিছু মজুত নতুন করে পূরণ করা হয়েছে, কিন্তু এই ইন্টারসেপ্টরগুলো বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের জন্যও বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
আর্থিক সক্ষমতার চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে অত্যাধুনিক ‘ইন্টারসেপ্টর’ ক্ষেপণাস্ত্রের সীমিত মজুত। প্যাট্রিয়ট ও এসএম-৬-এর মতো জটিল প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্রগুলো দ্রুত উৎপাদন করা অসম্ভব। ইরান যুদ্ধে এই মজুত ফুরিয়ে গেলে ইউক্রেন ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চমাত্রার এই অভিযান বড়জোর কয়েক সপ্তাহ চালানো সম্ভব, নচেৎ বিশ্বজুড়ে মার্কিন অস্ত্রাগার শূন্য হয়ে পড়বে
প্রিবল বলেন, ‘এই ইন্টারসেপ্টরগুলোর কিছু অংশ রাশিয়ার হামলা মোকাবিলায় ইউক্রেনে পাঠানোর কথা ছিল। আবার কিছু অংশ এশিয়ার ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে মোতায়েন আছে। ফলে ওই অঞ্চলগুলো থেকে সরিয়ে এই যুদ্ধে সব অস্ত্র ব্যবহার করে ফেলাটা বড় উদ্বেগের কারণ হতে পারে।’
সবশেষে তিনি মনে করিয়ে দেন যে, আধুনিক এই সমরাস্ত্রগুলো দ্রুত উৎপাদন করা সম্ভব নয়। তিনি যোগ করেন, ‘একটি প্যাট্রিয়ট মিসাইল বা একটি এসএম-৬ অত্যন্ত জটিল প্রযুক্তির সরঞ্জাম। এটি এমন নয় যে চাইলেই দিনে শত শত বা হাজার হাজার উৎপাদন করা সম্ভব। উৎপাদনের গতি মোটেও তেমন নয়।’
সূত্র : আল জাজিরা ও রয়টার্স।
এমএআর/