ইরান সরকার পতনের ঝুঁকিতে নেই : মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদন

গত ১২ দিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক হামলা সত্ত্বেও ইরানের ক্ষমতাসীন ইসলামি প্রজাতন্ত্রী সরকারের পতনের কোনো সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছে না ওয়াশিংটন। ইরানে যুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত অন্তত ৪ জন জ্যেষ্ট মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে রয়টার্স।
ইরান যুদ্ধ এবং ক্ষমতাসীন ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতনের সম্ভাবনা নিয়ে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি গোয়েন্দা প্রতিবেদন জমা পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা দপ্তরে। এক মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, হামলা শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ইরানে সরকার পতনের কোনো সম্ভাব্যতা বা সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না ; উপরন্তু সাধারণ জনগণের মধ্যে ক্ষমতাসীন ইসলামি প্রজাতন্ত্রর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে, যা গত ডিসেম্বর-জানুয়ারির সরকারপতন আন্দোলনের সময়ে অনেকাংশ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।
গত ২৮ অক্টোবর তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্যে দিয়ে শুরু হয় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ। ইরানের পরমাণু প্রকল্প নিয়ে গত ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২১ দিন ধরে সংলাপ চলে তেহরান এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে। ২৭ ফেব্রুয়ারি কোনো প্রকার সমঝোতা চুক্তি ছাড়াই শেষ হয় সেই সংলাপ।
তার পরের দিন ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একই সময়ে ইরানে সামরিক অভিযান ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’ শুরু করে ইসরায়েলও।
যুদ্ধের প্রথম দিন ২৮ অক্টোবর নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি-সহ ইরানের অন্তত ৪০ জন সামরিক ও বেসামরিক শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা। নিহত এই কর্মকর্তাদের মধ্যে ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর এলিট শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর কয়েক জন শীর্ষ কমান্ডারও আছেন।
গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে তীব্র সরকারবিরোধী আন্দোলনে কেঁপে উঠেছিল ইরান। প্রায় ১৫ হাজার মানুষকে হত্যার মধ্যে দিয়ে ২০২৬ সালের জানুয়ারির মাঝামাঝি সেই বিক্ষোভ দমন করে তেহরানে ক্ষমতাসীন ইসলামি প্রজাতন্ত্রী সরকার।
ইরানে হামলা শুরুর কয়েক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের জনগণকে ক্ষমতা দখলের আহ্বান জানিয়ে একটি ভিডিওবার্তাও পোস্ট করেছিলেন।
তবে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যুর পর তার ছেলে মোজতবা খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাজিত করে ইরানের প্রভাবাশালী সংস্থা অ্যাসম্বলি অব এক্সপার্ট। আইআরজিসির যেসব শীর্ষ কমান্ডার এবং যেসব জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন— তাদের শূন্যপদও অনেকাংশে পূরণ কারা হয়েছে ইতোমধ্যে।
এক মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ইসরায়েল কোনোভাবেই চায় না যে ইরানে ইসলামি প্রজাতন্ত্রী সরকার টিকে থাকুক। আবার যুদ্ধের এই পর্যায়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানে স্থলবাহিনী পাঠাতে ইচ্ছুক নন। মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্রী সরকারের প্রধান শক্তি আইআরজিসিকে দুর্বল করতে বিদ্রোহী কুর্দ যোদ্ধাদের মাঠে নামানোর চিন্তাভাবনা করছিল যুক্তরাষ্ট্র। ইতোমধ্যে ইরাকে কুর্দ নেতাদের সঙ্গে এ ইস্যুতে মার্কিন কর্মকর্তাদের বৈঠকও হয়েছে।
ইরানের বিদ্রোহী কুর্দ বাহিনীর মূল ঘাঁটি পার্শ্ববর্তী দেশ ইরাকে। সীমান্ত পেরিয়ে এসে ইরানের নিয়মিত প্রতিরক্ষা বাহিনী ও আইআরজিসির ওপর হামলা চালায় কুর্দ বাহিনী।
ইরানের কুর্দি রাজনৈতিক দল কোমালা পার্টি এবং এবং ৬টি কুর্দি রাজনৈতিক দল গঠিত জোটের নেতা আবদুল্লাহ মোহতাবি গতকাল বুধবার রয়টার্স-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “আমাদের লক্ষাধিক কুর্দ সেনা আইআরজিসিকে মোকাবিলা করতে প্রস্তুত। যুক্তরাষ্ট্র একবার সংকেত দিলেই তারা দলে দলে ইরানে প্রবেশ করা শুরু করবে।”
তবে মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন— এ ইস্যুতেও দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগছে যুক্তরাষ্ট্র। কারণ কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সদস্যসংখ্যা, তাদের দক্ষতা এবং তাদের হাতে থাকা গোলাবারুদ আইআরজিসির জন্য কার্যকর হুমকি সৃষ্টি করতে পারবে কি না— তা নিয়ে ব্যাপকভাবে সন্দিহান ওয়াশিংটন।
তাছাড়া প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও এর পক্ষে নন। ইতোমধ্যে তিনি বলেছেন যে তিনি চান না কুর্দি যোদ্ধারা ইরাক থেকে ইরানে প্রবেশ করুক।
এই অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী করণীয় প্রসঙ্গে জানতে হোয়াইট হাউসে যোগাযোগ করেছিল রয়টার্স, কিন্তু হোয়াইট হাউসের কোনো মুখপাত্র এ ব্যাপারে কথা বলতে রাজি হননি।
সূত্র : রয়টার্স
এসএমডব্লিউ