ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তার প্রধান মিত্রদের উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মাসব্যাপী এই যুদ্ধে ইউরোপীয় ন্যাটো (NATO) মিত্রদের ‘সহযোগিতা না করার’ সমালোচনা করেছেন। বিশেষ করে ফ্রান্স ও ইতালি কিছু কিছু ক্ষেত্রে মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে বাধা দেওয়ায় দুই পক্ষের মধ্যকার দূরত্ব এখন জনসমক্ষে চলে এসেছে।
বিজ্ঞাপন
চলতি মাসের শুরুতে ট্রাম্প দীর্ঘদিনের ন্যাটো মিত্রদের সমর্থনের অভাবে ‘কাপুরুষ’ বলে অভিহিত করেছিলেন। মঙ্গলবার তিনি পুনরায় সেই দেশগুলোকে আক্রমণ করেন যারা মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় সহায়তা করেনি।
ফ্রান্সের ‘না’ এবং ইসরায়েলের পাল্টা ব্যবস্থা
ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, ইসরায়েলে সামরিক সরঞ্জাম বহনকারী বিমানগুলোকে ফ্রান্স তাদের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দিচ্ছে না। নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ তিনি লিখেছেন, ফ্রান্স এক্ষেত্রে ‘খুবই অসহযোগিতা’ করছে।
বিজ্ঞাপন
ফরাসি প্রেসিডেন্সি এই পোস্টে বিস্ময় প্রকাশ করে জানিয়েছে, তাদের সিদ্ধান্ত যুদ্ধ শুরুর নীতিমালার সঙ্গেই সংগতিপূর্ণ। তবে রয়টার্স জানিয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর এই প্রথম ফ্রান্স কোনো মার্কিন-ইসরায়েলি সমরাস্ত্রবাহী বিমানকে বাধা দিল। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ফ্রান্সের বিরুদ্ধে সরাসরি অসহযোগিতার অভিযোগ এনেছে এবং জানিয়েছে, তারা ফ্রান্সের কাছ থেকে সব ধরনের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনা বন্ধ করবে এবং ফরাসি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কোনো নতুন চুক্তিতে যাবে না।
ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও তার ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। আকাশসীমা ও বিমানঘাঁটি ব্যবহারে ফ্রান্স, ইতালি ও স্পেনের সরাসরি বাধা দেওয়ায় ক্ষুব্ধ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দেশগুলোকে ‘অসহযোগী’ ও ‘কাপুরুষ’ বলে সমালোচনা করেছেন। বিশেষ করে ফ্রান্সের আকাশপথ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল দেশটির সঙ্গে সব ধরনের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছে
ইতালির অনুমতি প্রত্যাখ্যান
বিজ্ঞাপন
সূত্রের খবর অনুযায়ী, গত সপ্তাহে ইতালি সিসিলির সিগোনেলা বিমানঘাঁটিতে মার্কিন সামরিক বিমান অবতরণের অনুমতি দিতে অস্বীকার করেছে। ইতালীয় দৈনিক ‘কোরিয়ার ডেলা সেরা’র মতে, কিছু মার্কিন বোমারু বিমান মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার আগে এই ঘাঁটিতে নামার কথা ছিল।
যদিও দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী গুইডো ক্রোসেত্তো ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো বিরোধের কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি জানান, মার্কিন বিমানঘাঁটিগুলো সক্রিয় রয়েছে, তবে বিদ্যমান চুক্তির বাইরে ব্যবহারের জন্য ওয়াশিংটনের বিশেষ অনুমতির প্রয়োজন ছিল।

যুদ্ধের বিরুদ্ধে সবচেয়ে সোচ্চার স্পেন
এদিকে, ইরান হামলায় অংশ নেওয়া মার্কিন বিমানগুলোর জন্য নিজেদের আকাশপথ পুরোপুরি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্পেন। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ শুরু থেকেই মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার কড়া সমালোচক। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্গারিটা রবেলস জানিয়েছেন, স্পেন কেবল ন্যাটোর সম্মিলিত প্রতিরক্ষা কাজের জন্য তাদের ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেবে।
যুদ্ধের বিস্তার রোধে স্পেনের মতো দেশগুলো মার্কিন সামরিক অভিযানের জন্য তাদের আকাশপথ পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। অন্যদিকে, ব্রিটেনকে ট্রাম্পের পরামর্শ— মার্কিন জ্বালানি কেনা এবং সাহস সঞ্চয় করে হরমুজ প্রণালী দখল করা। মিত্র দেশগুলোর এমন পাল্টাপাল্টি অবস্থানে ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ ফাটল স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলছে
ব্রিটেনকে ট্রাম্পের পরামর্শ
ব্রিটেনকেও ‘অসহযোগী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ট্রাম্প। ব্রিটেনের ওপর ক্ষোভ ঝেড়ে তিনি ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ‘যুক্তরাজ্যের মতো যারা হরমুজ প্রণালীর কারণে জ্বালানি পাচ্ছে না কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যোগ দিচ্ছে না, তাদের জন্য আমার পরামর্শ— এক, আমেরিকার কাছ থেকে জ্বালানি কিনুন, আমাদের প্রচুর আছে। দুই, একটু সাহস সঞ্চয় করে প্রণালীতে গিয়ে তা দখল (TAKE IT) করুন।’
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন এবং ব্রিটেন— সবাই ন্যাটোর সদস্য। অন্যদিকে জার্মানিতে অবস্থিত ইউরোপের বৃহত্তম মার্কিন ঘাঁটি ‘রামস্টেইন’ ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো বিধিনিষেধ নেই বলে জানানো হলেও, জার্মান প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্ক-ভাল্টার স্টেইনমায়ার এই যুদ্ধকে ‘অবৈধ’ বলে মন্তব্য করার পর সেখানেও বিতর্ক শুরু হয়েছে।
তথ্যসূত্র : রয়টার্স ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।
এমএআর/
