বিজ্ঞাপন

চন্দ্রবিজয়ের নতুন অধ্যায়

নাসার আর্টেমিস-২ চন্দ্র অভিযান কী, উৎক্ষেপণ কখন?

অ+
অ-
নাসার আর্টেমিস-২ চন্দ্র অভিযান কী, উৎক্ষেপণ কখন?

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি মহাকাশ সেন্টারে আর্টেমিস-২ উৎক্ষেপণের ক্ষণগণনা চলছে। ১৯৭২ সালের পর প্রথম মনুষ্যবাহী এই চন্দ্র অভিযানে চারজন নভোচারীকে চাঁদের চারপাশ ঘুরিয়ে আবার পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনবে।

বিজ্ঞাপন

সোমবার চন্দ্রাভিযানের এই মিশন কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের এক বৈঠকের পর নাসার সহযোগী প্রশাসক অমিত ক্ষত্রিয় বলেছেন, বুধবার উৎক্ষেপণের জন্য আর্টেমিস-২ প্রস্তুত রয়েছে।

বর্তমানে আবহাওয়া ছাড়া বড় ধরনের আর কোনও বাধা নেই। নাসা বলছে, আর্টেমিস-২ উৎক্ষেপণের জন্য অনুকূল আবহাওয়ার সম্ভাবনা ৮০ শতাংশ রয়েছে। তবে মেঘের ঘনঘটা এবং প্রবল বাতাসের গতিবেগ নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ রয়েছে।

• আর্টেমিস-২ উৎক্ষেপণ কখন?

বিজ্ঞাপন

ফ্লোরিডার কেনেডি মহাকাশ সেন্টার থেকে বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ২৪ মিনিটে আর্টেমিস-২ অভিযানের উৎক্ষেপণের জন্য দুই ঘণ্টার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। উৎক্ষেপণের এই সুযোগ আগামী ৬ এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিদিন সূর্যাস্তের পর দুই ঘণ্টা করে চালু থাকবে। চাঁদ, কক্ষপথ, আবহাওয়া এবং পৃথিবীর আবর্তন—সবকিছু নিরাপদ অবস্থানে চলে এলেই কেবল এই অভিযান শুরু করা সম্ভব হবে।

আর্টেমিস-২ উৎক্ষেপণের মূল সময়সীমা চলতি বছরের শুরুর দিকে নির্ধারণ করা হলেও দুই কারণে তা পিছিয়ে দেওয়া হয়। ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে প্রথম চেষ্টার সময় যান্ত্রিক মহড়ায় তরল হাইড্রোজেনের লিক শনাক্ত হওয়ায় তা বাতিল করা হয়। আর মার্চ মাসের শুরুতে দ্বিতীয় চেষ্টার সময় রকেটের ওপরের অংশে হিলিয়াম প্রবাহে সমস্যা ধরা পড়ায় প্রকৌশলীরা সেটিও বাতিল করেন।

• কীভাবে উৎক্ষেপণ দেখবেন?

বিজ্ঞাপন

নাসার ইউটিউব চ্যানেলে আর্টেমিস-২ এর উৎক্ষেপণ সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। সেখানে রকেটটি অ্যাসেম্বলি বিল্ডিং থেকে প্যাড ৩৯-এ নিয়ে আসার দৃশ্যও দেখানো হবে।

• নাসার আর্টেমিস কর্মসূচি কী?

নাসার কয়েক দশকের একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা হলো আর্টেমিস। ১৯৭২ সালের পর আবারও মানুষকে চাঁদে পাঠানো, সেখানে দীর্ঘমেয়াদী ঘাঁটি তৈরি এবং ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহে মানুষের অভিযানের পথ প্রশস্ত করার উদ্দেশে এই প্রকল্প হাতে নিয়ে নাসা।

বর্তমানে পাঁচটি মিশনে এই কর্মসূচিকে বিভক্ত করেছে নাসা। সেগুলো হলো আর্টেমিস ১, ২, ৩, ৪ এবং ৫।

আর্টেমিস-১ ছিল একটি চালকহীন পরীক্ষামূলক ফ্লাইট; যা ২০২২ সালের ১৬ নভেম্বর উৎক্ষেপণ করা হয় এবং ২৫ দিন স্থায়ী হয়েছিল। এটি সফলভাবে ওরিয়ন মহাকাশযানকে পৃথিবীর কক্ষপথে স্থাপন এবং আর্টেমিস-২ এর জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করে।

• আর্টেমিস-২ আসলে কী?

আর্টেমিস প্রোগ্রামের প্রথম মানববাহী মিশন আর্টেমিস-২। আর্টেমিস-১ ছিল সেন্সর ও ম্যানিকুইনবাহী একটি পরীক্ষামূলক মিশন। কিন্তু আর্টেমিস-২ এর মাধ্যমে ১৯৭২ সালের পর প্রথমবারের মতো নভোচারীরা পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথ ছাড়িয়ে আরও দূরে ভ্রমণ করবেন।

• আর্টেমিস-২ কি চাঁদে অবতরণ করবে?

না। এই চার সদস্যের ক্রু চাঁদে অবতরণ করবেন না। বরং তারা চাঁদের চারপাশ দিয়ে ঘুরে আসবেন এবং পৃথিবীর দিকে ফিরে আসার আগে চাঁদের দূরবর্তী অংশ পর্যবেক্ষণ করবেন।

• আর্টেমিস প্রোগ্রামের লক্ষ্য কী?

আর্টেমিস-২ হলো ব্যবস্থাপনা যাচাইকরণের একটি মিশন। নাসা এই ফ্লাইটের মাধ্যমে ওরিয়ন মহাকাশযানের জীবন রক্ষাকারী ব্যবস্থা, নেভিগেশন, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং গভীর মহাকাশে ক্রুদের উপস্থিতিতে এর কার্যকারিতা পরীক্ষা করবে। যেটি পৃথিবীতে পুরোপুরি কৃত্রিমভাবে তৈরি করা সম্ভব নয়।

আর্টেমিস-২ সফল হলে তা আর্টেমিস-৩ এর পথ খুলে দেবে। এরপর আর্টেমিস-৪ চাঁদে নভোচারী অবতরণএবং ভবিষ্যতে পৃথিবীর বাইরে মানুষের স্থায়ী উপস্থিতি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পরিচালিত হবে।

• অ্যাপোলোর সাথে আর্টেমিসের পার্থক্য কী?

গ্রিক পুরাণে আর্টেমিস হলেন অ্যাপোলোর যমজ বোন এবং চাঁদের দেবী। এই নামটি ১৯৬১ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত চলা মূল অ্যাপোলো চন্দ্র অভিযানের সাথে বর্তমান প্রোগ্রামের সংযোগের প্রতীক।

অ্যাপোলো মিশনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল অ্যাপোলো-১১। ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই নীল আর্মস্ট্রং এবং বাজ অলড্রিন প্রথম মানুষ হিসেবে চাঁদের বুকে অবতরণ করেছিলেন।

সর্বশেষ মিশন ছিল অ্যাপোলো-১৭। ১৯৭২ সালের ১৪ ডিসেম্বর ইউজিন সারনান এবং হ্যারিসন স্মিট চাঁদের বুক ছাড়েন এবং তারা ছিলেন চাঁদে হাঁটা সর্বশেষ মানুষ।

• আর্টেমিস-২ এর নভোচারী কারা?

নাসার এবারের অভিযানে চারজন নভোচারী থাকছেন :

• রিড ওয়াইজম্যান (৫০), কমান্ডার : নাসার এই অভিজ্ঞ নভোচারী এবং আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের সাবেক কমান্ডার আর্টেমিস-২ মিশন পরিচালনা করবেন। তিনি একাধারে টেস্ট পাইলট এবং অভিজ্ঞ মহাকাশচারী।

• ভিক্টর গ্লোভার (৪৯), পাইলট : মার্কিন নৌবাহিনীর এই বৈমানিক প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নভোচারী হিসেবে চন্দ্র অভিযানে যুক্ত হয়েছেন। এর আগে তিনি স্পেসএক্স ক্রু-১ মিশনে ছিলেন।

• ক্রিস্টিনা কোচ (৪৭), মিশন স্পেশালিস্ট : টানা ৩২৮ দিন মহাকাশে থাকার বিশ্বরেকর্ডধারী এই নারী নভোচারী একাধিকবার স্পেসওয়াকে অংশ নিয়েছেন। গভীর মহাকাশ অভিযানে তার বিশেষ দক্ষতা রয়েছে।

• জেরেমি হ্যানসেন (৫০), মিশন স্পেশালিস্ট :  প্রথম কানাডীয় হিসেবে তিনি চাঁদে ভ্রমণ করতে যাচ্ছেন। তিনি সাবেক একজন ফাইটার পাইলট।

• অভিযান চলাকালীন নভোচারীরা কী করবেন?

ফ্লাইট চলাকালীন চার নভোচারী মহাকাশযান পর্যবেক্ষণ এবং বিকিরণ ও মহাকাশযানে আগুন লাগলে নিজেদের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে তা পরীক্ষা করবেন। এছাড়া তারা স্যুটের চাপ পরীক্ষাসহ বিভিন্ন চিকিৎসা ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাবেন এবং চাঁদের পৃষ্ঠ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন।

• নাসা কেন আবার চাঁদে যাচ্ছে?

এই মিশনের সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য রয়েছে। নাসা চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছে মানুষের স্থায়ী উপস্থিতি নিশ্চিত করতে চায়; যেখানে বরফ আকারে পানির অস্তিত্ব রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

নাসার এই অভিযানকে মঙ্গল গ্রহে ভবিষ্যৎ মানব অভিযানের সোপান হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে মহাকাশ গবেষণায় বিশেষ করে চীনের সাথে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতায় নিজেদের নেতৃত্ব বজায় রাখাও যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্য।

সূত্র: আল জাজিরা।

এসএস