২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয় বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল ধাক্কা ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ইরান যুদ্ধ, অর্থনীতি, মুদ্রাস্ফীতি এবং অন্যান্য ইস্যুতে ট্রাম্পের নীতি ও কার্যকলাপে ভোটারদের মধ্যে অসন্তুষ্টি ও অনুশোচনা বাড়ছে। ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস অ্যামহার্স্ট-এর সাম্প্রতিক ইউগভ (YouGov) জরিপ অনুযায়ী, ট্রাম্পকে ভোট দেওয়া ভোটারদের ৩৮ শতাংশই এখন তার ওপর আগের মতো ভরসা রাখতে পারছেন না। কমলা হ্যারিস ভোটারদের তুলনায় এই সংখ্যা দ্বিগুণ। এছাড়া, ট্রাম্পের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ভোটব্যাংক ‘শ্রমজীবী শ্বেতাঙ্গ ভোটার’দের মধ্যেও তার জনপ্রিয়তা কমেছে। এই ভোটাররা ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৬৩ শতাংশ ট্রাম্পের পাশে থাকলেও নতুন জরিপে এই সংখ্যা ৪৯ শতাংশে নেমে এসেছে। এই পরিবর্তন আগামী নির্বাচনে ট্রাম্পের জন্য বড় ধাক্কা হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
সিএনএন-এ প্রকাশিত জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক অ্যারন ব্লেক-এর বিশ্লেষণে ট্রাম্পের ভোটারদের অসন্তুষ্টির আসল চিত্র এবং এর পেছনের কারণগুলো ঢাকা পোস্টের পাঠকদের জন্য বিস্তারিত তুলে ধরা হলো—
ইরান যুদ্ধের আবহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা এখন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি খবর বেশ জোরেশোরে শোনা যাচ্ছে— ২০২৪ সালের নির্বাচনে যারা ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই এখন পস্তাচ্ছেন! সাম্প্রতিক একাধিক জরিপে এর স্পষ্ট প্রমাণও মিলছে।
ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস অ্যামহার্স্টের জরিপ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ট্রাম্পকে ভোট দেওয়া ৩৮ শতাংশ ভোটার এখন আর তাঁর ওপর আগের মতো ভরসা রাখতে পারছেন না, যা কমলা হ্যারিসের ভোটারদের তুলনায় দ্বিগুণ। এমনকি ৫ শতাংশ ভোটার সরাসরি ট্রাম্পকে ভোট দেওয়া ভুল হয়েছে বলে মনে করেন। হ্যারিসের ভোটারদের তুলনায় ট্রাম্পের ভোটারদের মধ্যে অনুশোচনা প্রকাশের হার দ্বিগুণ
বিজ্ঞাপন
ট্রাম্পের নীতি ও কার্যকলাপে অনেক ভোটারের মনে আগে থেকেই খটকা ছিল। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহের নানারকম জরিপের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেই খটকা এখন বড় দুশ্চিন্তা ও মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই বিষয়ে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে শক্ত প্রমাণ দিয়েছে ইউনিভার্সিটি অফ ম্যাসাচুসেটস অ্যামহার্স্ট-এর সাম্প্রতিক ইউগভ (YouGov) জরিপটি। এই জরিপে ভোটারদের সরাসরি ‘আপনি কি অনুতপ্ত?’—এমন প্রশ্ন করা হয়নি। বরং তাদের মনোভাবের সূক্ষ্ম পার্থক্য বোঝার জন্য একটি স্কেল ব্যবহার করা হয়েছে। যেখানে ‘পুরোপুরি নিশ্চিত’ থেকে শুরু করে ‘কিছু উদ্বেগ’, ‘মিশ্র অনুভূতি’ এবং ‘কিছু অনুশোচনা’—এমন নানা বিকল্প রাখা হয়েছিল।
বিজ্ঞাপন
জরিপের ফল বলছে, ২০২৫ সালের এপ্রিলে যেখানে ৭৪ শতাংশ ট্রাম্প ভোটার দৃঢ়ভাবে বলেছিলেন যে তারা তাদের ভোটের বিষয়ে ‘পুরোপুরি নিশ্চিত’, আজ সেই সংখ্যা কমে ৬২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ, ট্রাম্পের প্রতি তাদের আগের সেই অন্ধবিশ্বাস এখন আর নেই।
এই জরিপে আরও দেখা গেছে, ৩৮ শতাংশ ট্রাম্প ভোটার এখন আর তার ওপর আগের মতো ভরসা রাখতে পারছেন না। কমলা হ্যারিসের (সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পুনরায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ইঙ্গিত দিয়েছেন) ভোটারদের তুলনায় এই সংখ্যা দ্বিগুণ। হ্যারিসের ভোটারদের মধ্যে মাত্র ১৯ শতাংশ তার ওপর ভরসা হারাচ্ছেন।

অন্যদিকে, ২১ শতাংশ ট্রাম্প ভোটার এখনও তার ওপর ‘পুরোপুরি আস্থা’ রাখলেও তাদের মধ্যে কিছু উদ্বেগ কাজ করছে।
গত ২০২৫ সালের এপ্রিলে মাত্র ৮ শতাংশ ট্রাম্প ভোটার তার ওপর ভরসা হারিয়েছিলেন। কিন্তু আজ সেই সংখ্যা বেড়ে ১৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তারা বলছেন, ট্রাম্পের ওপর তাদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে।
জরিপে মাত্র ৫ শতাংশ ট্রাম্প ভোটার সরাসরি বলেছেন যে, তারা ট্রাম্পকে ভোট দিয়ে ভুল করেছেন। সুযোগ পেলে তারা আর ট্রাম্পকে ভোট দিতেন না। তবে জরিপের গভীর বিশ্লেষণ বলছে, ট্রাম্পকে ভোট দিয়ে অনুতপ্ত ভোটারের প্রকৃত সংখ্যা আসলে আরও বেশি।
যদি ২০২৪ সালের ভোট আবারও অনুষ্ঠিত হয়, তবে ৮৪ শতাংশ ট্রাম্প ভোটার ট্রাম্পকে আবারও ভোট দেবেন বলে জানিয়েছেন। অন্যদিকে, ৯১ শতাংশ কমলা হ্যারিস ভোটার হ্যারিসকে আবারও ভোট দেবেন বলে জানিয়েছেন। এই ব্যবধান ট্রাম্পের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ।
এ থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, ট্রাম্পের ভোটারদের একটি বড় অংশই তার ওপর ভরসা হারাচ্ছেন। তারা মনে করছেন, ট্রাম্পকে ভোট দিয়ে তারা ভুল করেছেন। এই জরিপের ফল আগামী নির্বাচনে ট্রাম্পের জন্য বড় ধাক্কা হতে পারে।
অনেকে হয়তো একে সরাসরি ‘অনুশোচনা’ বলতে চাইবেন না। তবে পেছনের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৬ শতাংশ ট্রাম্প ভোটার এখন ভিন্ন কিছু করার কথা ভাবছেন। ঠিক একই সময়ে করা ‘স্ট্রেংথ ইন নাম্বারস-ভেরা সাইট’-এর আরেকটি জরিপ এই অনুশোচনার ছবিটা আরও বেশি ফুটিয়ে তুলেছে।
ট্রাম্পের ভোটারদের এক বিশাল অংশ তাঁর প্রধান নীতিগুলোর বিপক্ষেই অবস্থান নিয়েছে। গ্যাসের দাম নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার জন্য ৪৫%, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতার জন্য ৩৯%, অর্থনৈতিক নীতির জন্য ৩০% এবং ইরান নীতির জন্য ২৮% ভোটার তাঁর বিরোধী। অথচ এসব প্রতিশ্রুতি দিয়েই তিনি ভোট পেয়েছিলেন। এর ফলে ট্রাম্পের নিরাপত্তা দুর্গেও এখন ফাটল ধরেছে
এই জরিপে দেখা গেছে, ১৩ শতাংশ ট্রাম্প ভোটার সরাসরি বলেছেন যে তারা তাদের ভোটের জন্য অনুতপ্ত। এর মধ্যে ৫ শতাংশ ‘খুব বেশি’ এবং ৮ শতাংশ ‘কিছুটা’ অনুশোচনা প্রকাশ করেছেন। এই সংখ্যাও কমলা হ্যারিসের ভোটারদের তুলনায় দ্বিগুণ।
বিশেষ করে ৩০ বছরের কম বয়সী ট্রাম্প ভোটারদের মধ্যে ১৭ শতাংশ এবং হিস্পানিক ভোটারদের মধ্যে ১৬ শতাংশ তাদের ভোটের জন্য আফসোস করছেন।
ট্রাম্পের ভিত্তিমূলে ফাটল: অনুশোচনা ও মতবিরোধ স্পষ্ট
ট্রাম্পের ভোটারদের মধ্যে অনুশোচনা প্রকাশের হার কেবল হ্যারিসের ভোটারদের তুলনায় দ্বিগুণই নয়; এটি গত বছরের এপ্রিল এবং অক্টোবরের জরিপে ৬-৭ শতাংশ ট্রাম্প ভোটারের অনুশোচনা প্রকাশের হারেরও দ্বিগুণ।
পরিষ্কার করে বললে, এই জরিপগুলো ইঙ্গিত দেয় যে ২০২৪ সালের ভোটে ট্রাম্পকে সমর্থন দেওয়া প্রতি ৮ জনের মধ্যে ১ জন এবং প্রতি ৬ জনের মধ্যে ১ জন ভোটার এখন কিছুটা অনুশোচনা প্রকাশ করছেন।

২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে এই ভোটাররা যদি রিপাবলিকান পার্টি ত্যাগ করেন, তবে এটি নিঃসন্দেহে ডেমোক্র্যাটদের জন্য একটি বড় জয় এনে দেবে।
ট্রাম্পের প্রতি তার ভোটারদের এই নমনীয় ভাব বা সমর্থন কমে যাওয়ার এটাই একমাত্র প্রমাণ নয়। যদিও তথাকথিত ম্যাগ (MAGA) সমর্থকরা কীভাবে ইরান যুদ্ধকে সমর্থন করছে তা নিয়ে প্রচুর আলোচনা হয়েছে, এটি স্পষ্ট যে ট্রাম্পের ভোটারদের অনেকেই এই যুদ্ধ সমর্থন করেন না।
চলতি সপ্তাহে সিএনএন-এর করা একটি জরিপ এই ইস্যুতে এবং অন্যান্য অনেক ইস্যুতে ট্রাম্পের প্রতি তার সমর্থকদের অসন্তুষ্টির চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে।
ট্রাম্পের ভোটারদের অসন্তুষ্টির আসল চিত্র
২০২৪ সালে ট্রাম্পকে ভোট দেওয়া ভোটারদের মধ্যে কারা কোন বিষয়ে এখন আর তার ওপর ভরসা রাখতে পারছেন না, তার একটি চিত্র নিচে দেওয়া হলো—
• সামগ্রিকভাবে : ২২% ভোটার ট্রাম্পের প্রতি অসন্তুষ্ট।
• অভিবাসন : ১৫% ভোটার ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির বিরোধী।
• বৈদেশিক বিষয় : ২৫% ভোটার ট্রাম্পের বৈদেশিক নীতির বিরোধী।
• ইরান নীতি : ২৮% ভোটার ট্রাম্পের ইরান নীতির বিরোধী।
• অর্থনীতি : ৩০% ভোটার ট্রাম্পের অর্থনৈতিক নীতির বিরোধী।
• মুদ্রাস্ফীতি : ৩৯% ভোটার ট্রাম্পের মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতার বিরোধী।
• গ্যাসের দাম : ৪৫% ভোটার ট্রাম্পের গ্যাসের দাম নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতার বিরোধী।
ট্রাম্পের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিত ‘শ্রমজীবী শ্বেতাঙ্গ ভোটার’দের মধ্যেও তাঁর জনপ্রিয়তা কমেছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিএনএন-এর জরিপে ৬৩ শতাংশ শ্রমজীবী শ্বেতাঙ্গ ট্রাম্পের পাশেই থাকলেও নতুন জরিপে এই সংখ্যা ৪৯ শতাংশে নেমে এসেছে। এই পরিবর্তন আগামী নির্বাচনে ট্রাম্পের জন্য বড় ধাক্কা হতে পারে

ট্রাম্পের ভোটারদের এক বিশাল অংশ এখন তার প্রধান নীতিগুলোর বিপক্ষেই অবস্থান নিয়েছে। অথচ এসব প্রতিশ্রুতি দিয়েই তিনি ভোট পেয়েছিলেন। এই ভোটাররা এখন মুখে ‘আফসোস’ শব্দটি ব্যবহার করছেন কি না, তা নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নেই; তাদের কাজ ও মনোভাবই সব বলে দিচ্ছে।
আর ট্রাম্পের প্রতি তার কট্টর সমর্থকেরা কতটা বিরক্ত, তা যদি এই তথ্যেও পরিষ্কার না হয়, তবে সিএনএন-এর জরিপের এই অংশটি দেখুন—
‘শ্রমজীবী শ্বেতাঙ্গ ভোটার’—এই গোষ্ঠীটিকে ট্রাম্পের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ভোটব্যাংক মনে করা হয়, যাদের জোরে তিনি রাজনীতিতে বাজিমাত করেছেন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিএনএন-এর জরিপেও ৬৩ শতাংশ শ্রমজীবী শ্বেতাঙ্গ ট্রাম্পের পাশেই ছিলেন।
কিন্তু সিএনএন-এর নতুন জরিপ কী বলছে? এই ভোটব্যাংকের মধ্যে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে এখন মাত্র ৪৯ শতাংশে ঠেকেছে। অর্থাৎ, তার সবচেয়ে নিরাপদ দুর্গেও এখন ফাটল ধরেছে।
সূত্র: সিএনএন।
এমএআর/
