ইরানের ভেতরে পরিচালিত এক নাটকীয় উদ্ধার অভিযান চলাকালীন যুক্তরাষ্ট্র নিজেই নিজেদের একটি উচ্চমূল্যের সামরিক বিমান ধ্বংস করে দিয়েছে। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বিমানটি আটকা পড়লে সেটি যেন শত্রুপক্ষের হাতে না পড়ে, সেজন্যই এই চরম সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র ও প্রতিবেদনে জানা গেছে।
বিজ্ঞাপন
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই মিশনটিকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের অন্যতম দুঃসাহসিক অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে একটি মার্কিন এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল (F-15E Strike Eagle) ভূপাতিত হওয়ার পর এই অভিযান শুরু হয়। বিমানে থাকা একজন ক্রু সদস্যকে দ্রুত উদ্ধার করা সম্ভব হলেও, দ্বিতীয়জন— সিনিয়র ওয়েপন সিস্টেম অফিসার শত্রু সীমানার ভেতরে প্রায় ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় লুকিয়ে ছিলেন।
পাহাড়ের খাঁজে জীবন-মৃত্যুর লড়াই
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই কর্মকর্তা পাহাড়ের খাঁজে আশ্রয় নিয়ে এবং প্রায় ৭,০০০ ফুট উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ করে ইরানি তল্লাশি দলের চোখ ফাঁকি দিয়ে বেঁচে ছিলেন। তেহরান তাকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করায় মার্কিন ও ইরানি বাহিনীর মধ্যে তাকে আগে খুঁজে পাওয়ার এক রুদ্ধশ্বাস প্রতিযোগিতা শুরু হয়।
বিজ্ঞাপন
মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো অগ্রসরমান ইরানি কনভয়ে হামলা চালায়, আর সেই সুযোগে নেভি সিল টিম সিক্স-এর মতো এলিট স্পেশাল ফোর্স সদস্যরা সেখানে পৌঁছান। এই অভিযানে সিআইএ-র গোয়েন্দা সহায়তাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ, যারা ওই অফিসারের অবস্থান সম্পর্কে ইরানি কর্তৃপক্ষকে বিভ্রান্ত করতে সক্ষম হয়েছিল।

বিজ্ঞাপন
কেন নিজের বিমান ধ্বংস করল যুক্তরাষ্ট্র?
অভিযানের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর মোড় আসে যখন ওই অফিসারকে খুঁজে বের করে উদ্ধার করা হয়। তাকে ইরানের ভেতরে মরুভূমির অস্থায়ী ল্যান্ডিং স্ট্রিপে অপেক্ষমাণ এমসি-১৩০জে কমান্ডো-২ (MC-130J Commando II) বিমানে তোলা হয়।
ইরানের মরুভূমিতে উদ্ধার অভিযান চলাকালীন যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে একটি মার্কিন এমসি-১৩০জে (MC-130J) বিমান আটকা পড়ে। শত্রুসেনারা কাছে চলে আসায় এবং উন্নত সামরিক প্রযুক্তি ও গোপনীয় সরঞ্জাম ইরানের হাতে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হওয়ায়, মার্কিন কমান্ডাররা তড়িঘড়ি করে নিজেদের সেই ১০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের বিমানটি নিজেরাই ধ্বংস করার নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নেন
তবে, অবতরণের পর অন্তত একটি (মতান্তরে দুটি) বিমান অকেজো হয়ে পড়ে। ধারণা করা হচ্ছে, যান্ত্রিক ত্রুটি অথবা মরুভূমির নরম বালিতে চাকা দেবে যাওয়ার কারণে বিমানটি আর উড়তে পারছিল না। ওদিকে ইরানি বাহিনী ক্রমেই কাছে চলে আসছিল এবং বিমানটি মেরামত বা উদ্ধার করার মতো কোনো উপায় ছিল না। এই সংকটময় মুহূর্তে মার্কিন কমান্ডাররা একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নেন।
বিমানের স্পর্শকাতর সামরিক প্রযুক্তি যেন ইরানের হাতে না পড়ে, সেজন্য মার্কিন বাহিনী সেখান থেকে সরে আসার আগে বিমানটি নিজেরাই ধ্বংস করে দেয়। এই ধরনের প্রতিটি বিমানের মূল্য ১০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি এবং এতে অত্যন্ত উন্নত যোগাযোগ, নেভিগেশন ও বিশেষ অপারেশন সিস্টেম থাকে।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে এটিই স্ট্যান্ডার্ড প্রোটোকল: আর্থিক ক্ষতির চেয়ে শত্রুর হাত থেকে অত্যন্ত গোপনীয় সরঞ্জাম রক্ষা করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

একটি অতি-ঝুঁকিপূর্ণ মিশন
এই উদ্ধার অভিযানে শত শত স্পেশাল অপারেশন কর্মী এবং একাধিক যুদ্ধবিমান শত্রু ভূখণ্ডের ওপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা অবস্থান করছিল। ট্রাম্প এই মিশনকে ‘সাহসিকতা ও প্রতিভার এক বিস্ময়কর প্রদর্শনী’ বলে অভিহিত করেছেন।
এফ-১৫ই ভূপাতিত হওয়ার পর একজন উচ্চপদস্থ মার্কিন কর্মকর্তা প্রায় ৭,০০০ ফুট উঁচু পাহাড়ের খাঁজে লুকিয়ে ইরানি বাহিনীর চোখ ফাঁকি দেন। তাকে উদ্ধারে নেভি সিল টিম সিক্স এবং সিআইএ-র সমন্বয়ে একটি জটিল অপারেশন চালানো হয়। ট্রাম্পের মতে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের অন্যতম বিপজ্জনক ও সফল উদ্ধার অভিযান, যা প্রমাণ করে যে কোনো সেনাকেই শত্রুর ডেরায় ফেলে আসা হবে না
তিনি বলেন, ‘মানুষ ও সরঞ্জামের চরম ঝুঁকির কারণে এই ধরনের অভিযান খুব কমই চালানো হয়।’ উদ্ধার করা অফিসারকে তিনি একজন ‘অত্যন্ত সম্মানিত কর্নেল’ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বলেন, ‘তিনি গুরুতর আহত’ হলেও বর্তমানে নিরাপদ আছেন।
ইরাক যুদ্ধের পর এই প্রথম কোনো মার্কিন ফাইটার জেট লড়াই চলাকালীন ভূপাতিত হলো। ওই পাইলট বা অফিসার ইরানের হাতে ধরা পড়লে তা ওয়াশিংটনের জন্য বড় ধরনের কৌশলগত পরাজয় হতে পারত। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সফল উদ্ধার অভিযান কেবল বড় বিপর্যয়ই এড়ায়নি, বরং মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেই চিরন্তন নীতিকেই আবারও প্রমাণ করেছে যে ‘কোনো সেনাকেই পেছনে ফেলে আসা হবে না’—এমনকি যদি তার জন্য নিজেদের বহুমূল্য সম্পদ ধ্বংস করতে হয়, তবুও।
সূত্র : টাইমস অব ইন্ডিয়া।
এমএআর/
