গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনাদের সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এবং যুদ্ধের স্থায়ী অবসানের গ্যারান্টি ছাড়া নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে কোনো কথা হবে না— সাফ জানিয়ে দিয়েছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস।
বিজ্ঞাপন
হামাসের সশস্ত্র উইং, ইজ্জাদিন আল-কাসাম ব্রিগেডসের মুখপাত্র আবু উবাইদা রোববার একটি টেলিভিশন বিবৃতিতে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ‘তারা অস্ত্র ছাড়বে না।’ যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, ‘হামাসকে নিরস্ত্র করার দাবি আসলে ইসরায়েলের গণহত্যা চালিয়ে যাওয়ার একটি কৌশল।’
যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ‘বোর্ড অব পিস’ পরিকল্পনার আওতায় হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের বিষয়টি আলোচনায় আনা হয়। সম্প্রতি কায়রোতে মিসর, কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়। হামাসের দাবি, যুদ্ধবিরতির সব শর্ত বাস্তবায়ন, ইসরাইলি হামলা বন্ধ এবং গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহারের স্পষ্ট রূপরেখা থাকতে হবে। হামাস বলেছে, যুদ্ধবিরতির পরও ইসরাইল হামলা চালিয়ে যাচ্ছে এবং গাজার বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। অন্যদিকে ইসরাইল বলছে, হামাস সম্পূর্ণ নিরস্ত্র না হলে তারা সেনা প্রত্যাহারে রাজি নয়।
সূত্রগুলো বলছে, এই অবস্থানের কারণে দ্রুত কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে হামাস সরাসরি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেনি; বরং তাদের শর্ত পূরণ হলে আলোচনায় অগ্রগতি হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
আবু উবাইদা জোর দিয়ে বলেন, ‘এই পরিকল্পনার প্রথম ধাপ ইসরায়েল পুরোপুরি বাস্তবায়ন না করা পর্যন্ত অস্ত্রের বিষয়ে কোনো আলোচনা হবে না। বিষয়টি হামাস মধ্যস্থতাকারীদের আগেই জানিয়ে দিয়েছে।’ আবু উবাইদা সতর্ক করে বলেন, ‘অস্ত্রের বিষয়টি অমার্জিতভাবে উত্থাপন করা গ্রহণযোগ্য হবে না।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফার গাজা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে হামাসের অস্ত্র ত্যাগের দাবিটি একটি বড় বাধা। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী হামাসকে অস্ত্র সমর্পণ করতে হবে। আবু উবাইদার রোববারের মন্তব্য এই পরিকল্পনার আনুষ্ঠানিক প্রত্যাখ্যান কি না, তা এখনও পরিষ্কার নয়।
গত অক্টোবর থেকে তথাকথিত ‘যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর থাকার পরও ইসরায়েলি হামলায় গাজায় ৭০৫ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে চলা ইসরায়েলের হামলায় এ পর্যন্ত ৭২,০০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং অন্তত ১৭২,০০০ জন আহত হয়েছে।
বিজ্ঞাপন

আবু উবাইদা মধ্যস্থতাকারীদের আহ্বান জানিয়েছেন, যেন দ্বিতীয় ধাপের আলোচনার আগে ইসরায়েলকে প্রথম ধাপের প্রতিশ্রুতি পূরণে চাপ দেওয়া হয়। তিনি অভিযোগ করেন, ইসরায়েলই চুক্তিটি লঙ্ঘন করছে।
লেবাননে ইসরায়েলের নতুন হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন আবু উবাইদা। গত ২ মার্চ হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে রকেট ছোড়ার পর এই হামলা শুরু হয়। লেবানন কর্তৃপক্ষের মতে, ইসরায়েলি হামলায় ১,৪০০-এর বেশি মানুষ নিহত এবং ১২ লাখের বেশি মানুষ ঘরছাড়া হয়েছেন।
উবাইদা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্য ইরান, হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুথিদের প্রশংসা করেন।
পাশাপাশি, ইসরায়েলি পার্লামেন্টে ফিলিস্তিনিদের জন্য পাস হওয়া নতুন মৃত্যুদণ্ড আইনেরও নিন্দা জানান তিনি। পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যেন তারা ইসরায়েলি কারাগারে বন্দীদের মুক্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যান।
রোববারের হামলায় এক ফিলিস্তিনি নিহত, পাঁচজন আহত
গাজা উপত্যকায় রোববার ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর গুলিতে এক ফিলিস্তিনি নিহত এবং আরও পাঁচজন আহত হয়েছেন। ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে কার্যকর থাকা যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, আহতদের মধ্যে শিশুরাও রয়েছে। অবরুদ্ধ ছিটমহলটির একাধিক এলাকায় হামলা চালিয়ে এই হতাহতের ঘটনা ঘটানো হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ইসরায়েলি বাহিনী গাজা সিটির পূর্বাঞ্চলীয় শেজাইয়া পাড়া এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর খান ইউনিসসহ পুরো উপত্যকা জুড়ে কয়েকটি এলাকায় গুলি চালিয়েছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৭১৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১,৯৬৮ জন আহত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ‘বোর্ড অব পিস’ পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল গাজায় দুই বছর ধরে চলা ইসরায়েলি অভিযান বন্ধ করা। ওই অভিযানে ৭২,০০০-এর বেশি মানুষ মারা গেছে এবং ১৭২,০০০ জন আহত হয়েছে। এছাড়া বেসামরিক অবকাঠামোর ৯০% ধ্বংস হয়ে গেছে।
জাতিসংঘ মনে করছে, গাজা পুনর্গঠনের জন্য প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার খরচ হবে।
সূত্র : আল-জাজিরা।
এমএআর/
