বিজ্ঞাপন

হোয়াইট হাউসের নিচে কেন নতুন ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার বানাচ্ছেন ট্রাম্প?

হোয়াইট হাউসের নিচে কেন নতুন ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার বানাচ্ছেন ট্রাম্প?

হোয়াইট হাউস বলরুম কমপ্লেক্সের নিচে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন নতুন একটি ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার তৈরির পরিকল্পনা করছে—এমন খবর প্রকাশিত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়েছে। প্রায় ৪০ কোটি ডলার (প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা) ব্যয়ের এই প্রকল্পে একটি সুরক্ষিত ভূগর্ভস্থ নিরাপত্তা ব্যবস্থা, একটি সামরিক হাসপাতাল এবং একটি ড্রোন ঘাঁটিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

গত ১৬ এপ্রিল ডিসট্রিক্ট আদালতের বিচারক রিচার্ড লিওন প্রস্তাবিত ৯০ হাজার বর্গফুটের বলরুমের মাটির ওপরের নির্মাণকাজের কিছু অংশ স্থগিত করার পর এই প্রস্তাবটি সবার নজরে আসে।

হোয়াইট হাউসের ভেঙে ফেলা ইস্ট উইংয়ের জায়গায় এই বলরুমটি তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে। যেখানে ১ হাজার জন পর্যন্ত মানুষের বড় ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজনের ব্যবস্থা থাকবে; যা বর্তমান বিনোদন স্থানগুলোর ধারণক্ষমতার চেয়েও অনেক বেশি। প্রশাসন এই প্রকল্পের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে জাতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগের কথা জানিয়েছে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার অতিরিক্ত নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন এবং শীর্ষ নেতাদের জন্য হুমকির উদাহরণ হিসেবে গত এপ্রিলে হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের অনুষ্ঠানে তাকে হত্যার ব্যর্থ চেষ্টার কথা তুলে ধরেছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বলরুমটি ব্যাপক নিরাপত্তাবলয়ে ঘেরা থাকবে। এর মধ্যে সরাসরি আক্রমণ প্রতিহত করতে সক্ষম একটি শক্ত ছাদযুক্ত বাঙ্কারের মতো কাঠামো, টাইটানিয়ামের তৈরি এমন মজবুত বেষ্টনী; যা বুলডোজারও গুঁড়িয়ে দিতে পারবে না। এছাড়া একটি সামরিক হাসপাতাল ও গবেষণা সুবিধাসম্পন্ন একটি ছয় তলা ভূগর্ভস্থ কমপ্লেক্সও থাকবে। এই কমপ্লেক্সে একটি ছাদ-ভিত্তিক ড্রোন ঘাঁটিও থাকবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। সেখানে অসংখ্য ড্রোন পরিচালনার সক্ষমতাও যুক্ত করা হবে।

তবে এই গবেষণা স্থাপনাগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত কোনও তথ্য দেয়নি হোয়াইট হাউস।

• হোয়াইট হাউসের বর্তমান বাঙ্কার

হোয়াইট হাউসে ইতোমধ্যে একটি নিরাপদ ভূগর্ভস্থ ব্যবস্থা রয়েছে, যা ‘প্রেসিডেন্সিয়াল ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার’ (পিইওসি) নামে পরিচিত।

জার্মান বোমারু বিমানের আকস্মিক আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পিইওসি তৈরি করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৪৮ সালে শুরু হওয়া হোয়াইট হাউসের বড় ধরনের সংস্কার কাজের অংশ হিসেবে স্নায়ুযুদ্ধের শুরুর দিকে প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যানের আমলে এর উল্লেখযোগ্য সম্প্রসারণ ও পুনর্নির্মাণ করা হয়।

আক্রমণের সময় উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করার আগ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য এই ব্যবস্থার নকশা করা হয়েছিল।

হোয়াইট হাউস হিস্টোরিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, এই গোপন স্থানে ভারী কংক্রিটের প্রাচীর, ইস্পাত-আবৃত ছাদ এবং প্রেসিডেন্টের জন্য একটি ছোট শয়নকক্ষ ও স্নানাগার রয়েছে। এর পাশাপাশি ভেন্টিলেশন মাস্ক, খাদ্য মজুত এবং যোগাযোগ সরঞ্জামসমৃদ্ধ কক্ষও রয়েছে সেখানে।

যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন সময়ে সৃষ্ট প্রধান প্রধান সংকটকালীন এই বাঙ্কার ব্যবহার করা হয়েছে। ২০০১ সালের সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পর তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি-সহ কয়েকজন কর্মকর্তাকে ওই স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সে সময় ফ্লোরিডায় থাকা তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশকে পরবর্তীতে ওই দিন সন্ধ্যায় এই বাঙ্কারে নিয়ে আসা হয়।

২০২০ সালের মে মাসে জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর পর হোয়াইট হাউসের বাইরে বিক্ষোভ চলাকালীন ট্রাম্পও কিছু সময়ের জন্য এই বাঙ্কারে আশ্রয় নিয়েছিলেন।

• গণতান্ত্রিক দেশে বাঙ্কার

নিজেদের নেতাদের জন্য ভূগর্ভস্থ ব্যবস্থা তৈরি করা একমাত্র গণতান্ত্রিক দেশ যুক্তরাষ্ট্র নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল লন্ডনের ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের কাছে ট্রেজারি ভবনের নিচে অবস্থিত বিশাল ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার কমপ্লেক্স ‘চার্চিল ওয়ার রুমস’ থেকে সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা করেছিলেন।

স্নায়ুযুদ্ধের সময় কানাডার সরকার ‘ডিফেনবাঙ্কার’ নির্মাণ করেছিল। দেশটির তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জন ডিফেনবেকারের নাম অনুযায়ী অটোয়ার কাছে তৈরি চার তলা বিশিষ্ট, ১ লাখ বর্গফুটের এই ভূগর্ভস্থ ব্যবস্থা পারমাণবিক হামলার সময় প্রধানমন্ত্রী এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য নকশা করা হয়েছিল।

• স্বৈরাচারী নেতাদের বাঙ্কার

কয়েকজন স্বৈরাচারী শাসকও ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা তৈরি করেছিলেন। অ্যাডলফ হিটলার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পূর্ব প্রুশিয়ার ‘উলফস লেয়ার’সহ কয়েকটি ভূগর্ভস্থ ব্যবস্থা থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করেছিলেন। তিনি বার্লিনের ‘ফুহরেরবাঙ্কারের’ সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সংশ্লিষ্ট ছিলেন। যেখানে তিনি জীবনের শেষ ১০৫ দিন কাটিয়েছিলেন এবং ১৯৪৫ সালে আত্মহত্যা করেন।

লিবিয়ার সাবেক নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি পুরো লিবিয়াজুড়ে গোপন বাঙ্কার এবং টানেলের এক বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিলেন। এই ভূগর্ভস্থ ব্যবস্থাগুলো অত্যন্ত সুরক্ষিত এবং পারমাণবিক ও রাসায়নিক হামলাসহ সামরিক আক্রমণ থেকে বেঁচে থাকার জন্য নকশা করা হয়েছিল।

ইরাকের নেতা সাদ্দাম হোসেন পুরো ইরাকজুড়ে একাধিক বাঙ্কার এবং ভূগর্ভস্থ নিরাপদ আশ্রয়স্থল তৈরি করেছিলেন; যার মধ্যে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের নিচের অত্যন্ত সুরক্ষিত কাঠামো থেকে শুরু করে সেই ছোট ভূগর্ভস্থ আস্তানাটিও ছিল, যেখানে তিনি শেষ পর্যন্ত ধরা পড়েছিলেন।

উত্তর কোরিয়ার শাসক কিম পরিবারও বিস্তৃত ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার, টানেল এবং কমান্ড সেন্টারের নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে বলে ধারণা করা হয়। সামরিক সংঘাত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা পারমাণবিক যুদ্ধের সময় দেশের নেতার বেঁচে থাকা নিশ্চিত করার জন্য এসব স্থাপনার নকশা করা হয়।

হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের প্রস্তাবিত এই প্রকল্প যুদ্ধ, সংকট এবং নিরাপত্তা হুমকির সময় দেশের নেতাদের রক্ষায় ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারগুলো যে ভূমিকা পালন করে এসেছে, তার প্রতি আবারও সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

সূত্র: এনডিটিভি।

এসএস